মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৭ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা      বিএনপিতে উপেক্ষিত ত্যাগীরা      বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো নিয়েও আলোচনা হয়েছে : মন্ত্রিপরিষদ সচিব      ডেঙ্গুতে একদিনে সর্বোচ্চ আক্রান্ত, মৃত্যু আরও চারজনের      নবম পে-স্কেলের অনুমোদন দিল মন্ত্রিসভা      সেপ্টেম্বরে অপরিবর্তিত থাকবে জ্বালানি তেলের মূল্য      হামের উপসর্গে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১২৫৬      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রত্যাশা
শফিকুল হক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০৫ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমান একটি পরিচিত ও আলোচিত নাম। তার রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি ঐতিহাসিক পরিবার, একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত, মামলা-মোকদ্দমা, প্রবাসজীবন এবং দেশে প্রত্যাবর্তনের দীর্ঘ প্রতীক্ষা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তার রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়নের মানদণ্ডও বদলে গেছে। এখন তিনি শুধু বিএনপির নেতা নন; তিনি রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান। ফলে প্রশ্নও আর শুধু তার রাজনৈতিক অতীত নিয়ে নয়। মূল প্রশ্ন হলো—তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন কীভাবে, তাঁর সরকার কতটা কার্যকর এবং তিনি বাংলাদেশকে কোন পথে এগিয়ে নিতে চান।

রাজনৈতিক উত্তরাধিকার একজন নেতাকে পরিচিতি দিতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে তার কর্ম, সিদ্ধান্ত ও ফলাফল। তারেক রহমান এমন একটি পরিবারের উত্তরসূরি, যার সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে। তার বাবা জিয়াউর রহমান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং তার মা খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন দলটির নেতৃত্ব দিয়েছেন ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। এমন পরিবারের সন্তান হিসেবে রাজনীতিতে তার প্রবেশ যেমন স্বাভাবিক, তেমনি তার ওপর প্রত্যাশা অন্য অনেক নেতার তুলনায় বেশি। তার প্রতিটি রাজনৈতিক পদক্ষেপকে শুধু একজন ব্যক্তির সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয়নি; তা দেখার চেষ্টা হয়েছে পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের আলোতেও। কিন্তু উত্তরাধিকার কোনো নেতার চূড়ান্ত পরিচয় নয়। উত্তরাধিকার অতীতের সম্পদ; রাষ্ট্র পরিচালনা ভবিষ্যতের দায়িত্ব। তারেক রহমানের সামনে এখন সেই দায়িত্বই সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দীর্ঘ সময় বিএনপির নেতৃত্বে থেকে সরকারবিরোধী রাজনীতির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তারেক রহমান। বিরোধী দলের নেতা হিসেবে সরকারের সমালোচনা করা, বিকল্প নীতি তুলে ধরা এবং জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতি দেওয়া এক ধরনের রাজনৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু সরকার পরিচালনা সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় যে প্রশ্ন সরকারকে করা যায়, ক্ষমতায় এসে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় নিজের সরকারকেই। প্রতিটি সিদ্ধান্তের রয়েছে অর্থনৈতিক মূল্য, প্রশাসনিক প্রভাব এবং মানুষের জীবনে সরাসরি প্রতিফলন। এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—এখন তাঁকে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে হবে না; সেই বক্তব্যকে নীতিতে, নীতিকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে এবং সিদ্ধান্তকে বাস্তব ফলাফলে পরিণত করতে হবে।

তারেক রহমানের সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশে নতুন রাজনৈতিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরিবর্তনের পর মানুষ এখন স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক স্বস্তি, নিরাপদ পরিবেশ এবং কার্যকর প্রশাসন চায়।

সরকার পাঁচ বছরের পরিকল্পনা এবং স্বল্পমেয়াদি কর্মসূচির কথা বলেছে। কল্যাণরাষ্ট্র, সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুশাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথাও সামনে এসেছে। লক্ষ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সরকারের সাফল্য শেষ পর্যন্ত ঘোষণায় নয়, বাস্তবায়নে মাপা হবে।

একজন সাধারণ নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের সাফল্যের মাপকাঠি খুব সহজ। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কেমন, চাকরি পাওয়া যাচ্ছে কি না, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ কতটা নির্ভরযোগ্য, হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়া যায় কি না এবং সরকারি অফিসে হয়রানি বা ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া যায় কি না—এসবই তার কাছে রাষ্ট্রের বাস্তব চেহারা। এ জায়গাগুলোতেই তারেক রহমান সরকারের প্রকৃত পরীক্ষা।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব আহরণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ—সব মিলিয়ে সরকারের সামনে কাজের পরিধি বড়। সরকার অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দেশীয় শিল্পকে উৎসাহিত করার কথা বলছে। কিন্তু মানুষের কাছে অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো জীবনযাত্রার ব্যয়।

একটি পরিবারের আয় যদি একই থাকে, অথচ খাদ্য, বাসা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও পরিবহনের খরচ বাড়তে থাকে, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের কাছে খুব বেশি অর্থ বহন করে না। তাই সরকারের অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বৃদ্ধি। বিশেষ করে তরুণদের কর্মসংস্থানকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকারি চাকরির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প, প্রযুক্তি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে জোর দেওয়া প্রয়োজন।

শিল্প ও অর্থনীতির জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস অপরিহার্য। জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকারকে তাই স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার পরিকল্পনা করতে হবে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা—সবকিছুকে সমন্বিত নীতির আওতায় আনতে হবে।

মানুষ সংকটের ব্যাখ্যা শুনতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সমাধান দেখতে চায়। রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব পরীক্ষা সেখানেই। কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা বর্তমান বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কল্যাণরাষ্ট্র শুধু ভাতা বা সামাজিক সহায়তা বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি প্রকৃত কল্যাণরাষ্ট্র নিশ্চিত করে যে দরিদ্র মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা পাবে, শিশু মানসম্মত শিক্ষা পাবে, অসুস্থ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাবে, তরুণ কাজের সুযোগ পাবে এবং বয়স্ক মানুষ সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারবে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন স্বচ্ছতা। কারা সুবিধা পাচ্ছে, কেন পাচ্ছে এবং প্রকৃত দরিদ্ররা বাদ পড়ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত করতে হবে তথ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থার মাধ্যমে। রাজনৈতিক পরিচয় যেন সামাজিক নিরাপত্তার যোগ্যতার মাপকাঠি না হয়। রাষ্ট্রের সহায়তা পেতে নাগরিকের দলীয় পরিচয় নয়, তার প্রয়োজন ও অধিকারই বিবেচ্য হওয়া উচিত।

একটি সরকারের সাফল্যের বড় অংশ নির্ভর করে প্রশাসনের ওপর। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হতে পারে প্রশাসনকে দক্ষ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করা। সরকারি কর্মকর্তা যেন দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে আইন, যোগ্যতা ও দায়িত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে পারেন—এমন পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি নিয়োগ, ক্রয়, টেন্ডার এবং উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া সহজ; কিন্তু নিজের দলের প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। অথচ রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয় সেখানেই। দলের মানুষ অন্যায় করলে তাঁরও বিচার হবে—এই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তারেক রহমানের সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দিতে পারবে।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে মামলা ও আইনি লড়াইয়ের দীর্ঘ ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ফলে তার সরকারের সময়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের সমান প্রয়োগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ, রাজনৈতিক দল এবং বিচার বিভাগের দায়িত্ব আলাদা—এ মৌলিক নীতি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান হওয়া উচিত পরিষ্কার—বিচার করবে আদালত, সরকার নয়। কেউ সরকারি দলের হোক কিংবা বিরোধী দলের—আইনের চোখে সবাই সমান। এই নীতি বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে তা শুধু বর্তমান সরকারের নয়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও দীর্ঘমেয়াদি শক্তি হবে।

সংখ্যাগরিষ্ঠতা একটি সরকারের রাজনৈতিক শক্তি। কিন্তু গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে দায়িত্বও থাকে। বিরোধী দলের বক্তব্যকে রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে দেখার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সংসদীয় কমিটিকে কার্যকর করা, গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নে বিরোধী দলের মতামত গ্রহণ এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক সংলাপ চালু রাখা—এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও পরিণত করতে পারে।

একজন শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী মানেই সব সিদ্ধান্ত একা নেওয়া নয়। বরং সঠিক মানুষকে সঠিক দায়িত্ব দিয়ে ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করাই নেতৃত্বের পরিণত রূপ।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো সরকার পরিচালনায় একটি নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা। সরকারের প্রতিটি বড় প্রতিশ্রুতির সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও বাস্তবায়নের মাপকাঠি থাকা প্রয়োজন। জনগণকে শুধু বলা নয় যে কী করা হবে; নির্দিষ্ট সময় পর জানানোও জরুরি—কী করা হয়েছে, কী হয়নি এবং কেন হয়নি।

এ জন্য প্রতি ছয় মাসে সরকারের একটি জনসম্মুখে অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে সরকারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হবে এবং জনগণও বুঝতে পারবে সরকার কোন জায়গায় সফল, কোন জায়গায় ব্যর্থ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি দক্ষ বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কাঠামো গঠন করা যেতে পারে, যা সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করবে। একই সঙ্গে মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের কাজের মূল্যায়নও ফলাফলের ভিত্তিতে করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান। এখানে কোনো দ্বৈত মানদণ্ড থাকা চলবে না। দলের মানুষ অন্যায় করলে ব্যবস্থা নিতে হবে, বিরোধী দলের মানুষ অন্যায় করলেও একইভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে।

আর জনগণের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি যোগাযোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। রাজনৈতিক সমাবেশের বাইরে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও নাগরিক সেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগ ও প্রত্যাশা শোনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।

তারেক রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা সম্ভবত এখানেই। বিএনপি তাকে নেতৃত্ব দিয়েছে। দলের কর্মী-সমর্থকদের আস্থা তাকে রাজনৈতিক শক্তি দিয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দায়িত্ব শুধু বিএনপির মানুষের প্রতি নয়। তার দায়িত্ব আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত, বামপন্থি, নির্দলীয়—সব রাজনৈতিক মতের মানুষসহ বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের প্রতি।

রাষ্ট্র কোনো দলের সম্পত্তি নয়। দল রাজনৈতিক; রাষ্ট্র সবার। এই পার্থক্যকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তারেক রহমানের নেতৃত্ব নতুন মাত্রা পেতে পারে।

একজন রাজনৈতিক নেতাকে তার সময়ে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা হয়। সমর্থকরা তার অর্জন দেখেন, বিরোধীরা তার ব্যর্থতা তুলে ধরেন। কিন্তু ইতিহাসের বিচার তুলনামূলকভাবে কঠিন এবং দীর্ঘস্থায়ী। ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে—তারেক রহমান ক্ষমতায় এসে কী পরিবর্তন করেছিলেন? তিনি কি দুর্নীতি কমাতে পেরেছিলেন? তিনি কি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিলেন? তিনি কি অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করে কর্মসংস্থান বাড়াতে পেরেছিলেন? তিনি কি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছিলেন? তিনি কি প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবের বাইরে আনতে পেরেছিলেন? তিনি কি বিরোধী মতের প্রতি সহনশীল একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করেছিলেন? এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তিনি কি নিজ দলের প্রধানমন্ত্রী না হয়ে সমগ্র বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে উঠতে পেরেছিলেন?

তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের প্রথম অধ্যায় উত্তরাধিকারের। দ্বিতীয় অধ্যায় সংগ্রামের। তৃতীয় অধ্যায় দীর্ঘ অপেক্ষা ও প্রত্যাবর্তনের।

কিন্তু এখন শুরু হয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—রাষ্ট্র পরিচালনার অধ্যায়। এখানে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, পারিবারিক পরিচয় কিংবা দলীয় শক্তি কোনো কিছুই যথেষ্ট নয়। এখানে প্রয়োজন দক্ষতা, সততা, সাহস, দূরদর্শিতা এবং প্রতিষ্ঠানকে সম্মান করার মানসিকতা।

তিনি চাইলে তার সরকারকে কেবল একটি নির্বাচিত সরকার হিসেবে ইতিহাসে রেখে যেতে পারেন। আবার চাইলে এমন একটি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করতে পারেন, যা তার সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী রাখবে। সেটিই হবে তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।

কারণ, শেষ পর্যন্ত ইতিহাস কোনো নেতাকে শুধু তার পিতা-মাতা, দল কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বিচার করে না। ইতিহাস দেখে—তিনি ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করেছিলেন এবং সেই ক্ষমতা মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন এনেছিল।

তারেক রহমানের সামনে এখন সেই পরীক্ষা। অতীত তাকে উত্তরাধিকার দিয়েছে। বর্তমান তাকে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ দিয়েছে। আর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে—তিনি সেই সুযোগকে কতটা সফলভাবে রাষ্ট্রনায়কত্বে রূপ দিতে পেরেছেন।

লেখক : সাবেক সলিসিটর, সিনিয়র কোর্টস অব ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস; সাবেক মেয়র, লন্ডন বরো অব টাওয়ার হ্যামলেটস, যুক্তরাজ্য

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close