বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৯ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে ভারত      নানামুখী সংকটে বাড়ছে অসন্তোষ      আসিফ মাহমুদসহ চারজনের দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে দুদক      প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় বাংলাদেশই ঠিক করবে : চিফ হুইপ      নেপালের দুর্যোগে মানবিক সহায়তার ঘোষণা বাংলাদেশের      ভোটার এলাকা পরিবর্তনের সুযোগ ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত      আসিফ মাহমুদসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু      
খোলাকাগজ স্পেশাল
দেশে অবাধে ঢুকছে বিদেশি চোরাই পণ্য
শিপার মাহমুদ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সীমান্ত পথে বিদেশি চোরাই পণ্যের প্রবেশ থামছেই না। কখনো যাত্রীর ব্যাগেজে লুকিয়ে, কখনো গ্রিন চ্যানেল ব্যবহার করে, আবার কখনো সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে বিদেশি সিগারেট, মদ, মোবাইল ফোন, মোবাইলের ডিসপ্লে ও যন্ত্রাংশ, প্রসাধনী, ওষুধ, পোশাক, গবাদিপশু, খাদ্যপণ্য এমনকি মাদকও। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে এসব পণ্য জব্দ হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চোরাচালানের মূলহোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানের তথ্যনুযায়ী— দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সীমান্ত এ দুই পথেই সক্রিয় রয়েছে চোরাকারবারি চক্র। গত দুই দিনে ঢাকা ও চট্টগ্রাম দুই বিমানবন্দরে প্রায় ৯৭ লাখ ১৩ হাজার টাকার চোরাই ও অবৈধ পণ্য জব্দ করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। এরও দুদিন আগে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৃথক অভিযানে আরও প্রায় ২৮ লাখ টাকার পণ্য জব্দ করা হয়। অন্যদিকে সিলেট সীমান্তে মাত্র তিন দিনে ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকার ভারতীয় চোরাই পণ্য জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। তবে এসব অভিযানে চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত কাউকে আটক করতে পারেনি সীমান্তরক্ষী বাহিনী। 

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) দেওয়া তথ্যমতে গত কয়েক মাসে এসব চোরাচালানের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বিজিবির হিসাবে, চলতি বছরের জুলাই মাসে দেশের সীমান্ত এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ২০২ কোটি ৬৩ লাখ ৪৯ হাজার টাকা মূল্যের চোরাচালান পণ্য জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া ১ জানুয়ারি থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত সরাইল রিজিয়নের আওতাধীন সীমান্ত এলাকাতেই জব্দ হয়েছে ৩৩০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা মূল্যের অবৈধ পণ্য।

দুদিনে দুই বিমানবন্দরে কোটি টাকার পণ্য জব্দ : 

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে টানা অভিযান চালিয়ে প্রায় ১ কোটি টাকা মূল্যের বিদেশি পণ্য জব্দ করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।

গত মঙ্গলবার ৩১ আগস্ট ও বুধবার ১ সেপ্টেম্বর পরিচালিত এসব অভিযানে বিদেশি সিগারেট, মোবাইল ফোন, মোবাইলের এলসিডি, মাদারবোর্ড, বিদেশি মদ, স্বর্ণালংকার ও ওষুধ জব্দ করা হয়। জব্দ করা পণ্যের মোট আনুমানিক মূল্য ৯৭ লাখ ১৩ হাজার ১০০ টাকা।

৩১ আগস্ট গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সৌদি আরব থেকে আসা সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইনসের এসভি৮০৪ উড়োজাহাজে অভিযান চালায় কাস্টমস গোয়েন্দাদের এ-শিফট। ওই উড়োজাহাজে আসা দুই যাত্রী মো. মনসুর আলম ও মোহাম্মদ নওয়াজ শরীফের ব্যাগেজ তল্লাশি করে মোট ৪৮১ কার্টন বিদেশি সিগারেট জব্দ করা হয়। এর মধ্যে মনসুর আলমের কাছ থেকে ২৩১ কার্টন এবং নওয়াজ শরিফের কাছ থেকে ২৫০ কার্টন সিগারেট পাওয়া যায়। এসব সিগারেটের আনুমানিক বাজারমূল্য ১৯ লাখ ২৪ হাজার টাকা।

একই দিন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ব্যাংকক থেকে আসা টিজি৩৩৯ উড়োজাহাজের যাত্রী টিপু আল ইমরানের ব্যাগেজে তল্লাশি চালানো হয়। বিশেষ কৌশলে লুকানো অবস্থায় তার ব্যাগ থেকে ৩৬টি স্মার্টফোন উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ১৯টি রেডমি টার্বো ৪ প্রো এবং ১৭টি অনার ২০০। মোবাইলগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য ১৫ লাখ ৯৬ হাজার টাকা।

একই ব্যাগেজ থেকে আরও ৫৫০টি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোবাইলের এলসিডি এবং ৯৫০টি মাদারবোর্ডসহ পর্দা জব্দ করা হয়। এলসিডিগুলোর আনুমানিক মূল্য ২২ লাখ টাকা এবং মাদারবোর্ডগুলোর মূল্য ১৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া টহলকালে ব্যাগেজ বেল্টের পাশে পরিত্যক্ত একটি হাতব্যাগ থেকে মালিকবিহীন অবস্থায় ৩ লিটার বিদেশি মদ জব্দ করা হয়, যার আনুমানিক মূল্য ৬০ হাজার টাকা।

বুধবার ১ সেপ্টেম্বর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বাহরাইন থেকে আসা জিএফ২৪৮ উড়োজাহাজের যাত্রী মো. আল আমিনকে গ্রিন চ্যানেল অতিক্রমের সময় আটক করে কাস্টমস গোয়েন্দাদের এ-শিফট। জিজ্ঞাসাবাদ ও ব্যাগেজ তল্লাশি করে তার কাছ থেকে ১৮ লিটার রেড লেবেল বিদেশি মদ জব্দ করা হয়। এর আনুমানিক বাজারমূল্য ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

এদিকে ৩১ আগস্ট চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৃথক অভিযানে দুবাই থেকে বিজি১৪৮ উড়োজাহাজে আসা এক যাত্রীর কাছ থেকে ১২ কার্টন বিদেশি সিগারেট, রোয়াটিনেক্স ও সাবরিলসহ বিভিন্ন ওষুধ এবং ১০০ গ্রাম স্বর্ণালংকার জব্দ করা হয়। এসব পণ্যের আনুমানিক মূল্য ২১ লাখ ৪৮ হাজার ১০০ টাকা।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর জানিয়েছে, গোপন তথ্য, যাত্রী প্রোফাইলিং এবং বিমানবন্দরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নিবিড় নজরদারির মাধ্যমে এসব অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। চোরাচালান ও অবৈধভাবে পণ্য আনা প্রতিরোধে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

এর আগেও শাহজালাল বিমানবন্দরে এর মাত্র দুই দিন আগেও বড় ধরনের চোরাই পণ্যের চালান আটক করা হয়। গত রোববার রাতে পৃথক দুই অভিযানে ৬২৫ কার্টন বিদেশি সিগারেট, হোয়াইটেনিং সিরাম, জর্দা ও বিদেশি লিকার জব্দ করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।

দুবাই থেকে আসা এমিরেটসের একটি ফ্লাইটের দুই যাত্রীর কাছ থেকেই জব্দ করা হয় ৫৪০ কার্টন সিগারেট ও ১ দশমিক ২৪ কেজি হোয়াইটেনিং সিরাম। এসব পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য ২১ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

অন্যদিকে দিল্লি থেকে আসা এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটের দুই যাত্রীর ব্যাগেজ থেকে আরও ৮৫ কার্টন সিগারেট, ২৭৬ পিস হোয়াইটেনিং সিরাম ও ৫ কেজি জর্দা জব্দ করা হয়। কাতার থেকে আসা আরেক যাত্রীর ব্যাগ থেকে উদ্ধার করা হয় ৩ লিটার বিদেশি লিকার। এ দুই শিফটের অভিযানে জব্দ পণ্যের মোট আনুমানিক মূল্য প্রায় ২৮ লাখ টাকা। সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

সিলেট সীমান্তে তিন দিনে সোয়া তিন কোটি টাকার পণ্য জব্দ : 

স্থলসীমান্তও বিদেশি চোরাই পণ্য প্রবেশের বড় রুট হয়ে উঠেছে। সিলেট সীমান্তে গত তিন দিনের অভিযানে ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা মূল্যের ভারতীয় চোরাই পণ্য জব্দ করেছে ৪৮ বিজিবি। ২৩ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এসব অভিযানে ভারতীয় কসমেটিকস, শাড়ি, জিরা, চা পাতা, মোবাইল ডিসপ্লে, মার্বেল, গরু, কম্বল, চকলেট, মাছ, চিনি, সুপারি, ফলসহ বিভিন্ন পণ্য জব্দ করা হয়। 

পাশাপাশি ইয়াবা এবং অবৈধভাবে বালু-পাথর বহনকারী নৌকাও আটক করা হয়েছে। ওই দিনের জব্দ পণ্যের সিজার মূল্য ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা। পরদিন আরও ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের ভারতীয় গরু, জিরা, কসমেটিকস, মহিষ ও অন্যান্য পণ্য জব্দ করা হয়।

সবশেষে কালাইরাগ, প্রতাপপুর, সংগ্রাম, দমদমিয়া ও সোনরহাট বিওপির অভিযানে ৭৩ লাখ ১৭ হাজার টাকা মূল্যের ভারতীয় ও অন্যান্য চোরাই পণ্য জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ছিল বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, গরু, শাড়ি, চকলেট, বিড়ি, সুপারি, সবজি ও বিয়ার। 

সীমান্তের স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, সিলেটের জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চোরাচালান চলছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুরোনো সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ বদলালেও চোরাচালান বন্ধ হয়নি; বরং নতুন লোকজনের মাধ্যমে তা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সীমান্তের দুর্গম এলাকা, নদীপথ ও পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত ভারতীয় পণ্য দেশে ঢোকানো হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝেমধ্যে বড় চালান আটক করলেও মূল কারবারিদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় চোরাচালানের নেটওয়ার্ক ভাঙা যাচ্ছে না।

এরমধ্যে বিজিবির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে চোরাচালানের আরও বড় চিত্র তুলে ধরে। জুলাই মাসেই দেশের সীমান্ত এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ২০২ কোটি ৬৩ লাখ ৪৯ হাজার টাকা মূল্যের চোরাচালান পণ্য জব্দ করেছে বিজিবি। একই সময় মাদক চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৯১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। 

জব্দ তালিকায় ছিল সোনা, হীরার নাকফুল, রুপা, শাড়ি, থ্রি-পিস, চাদর, কম্বল, তৈরি পোশাক, কাপড়, ইমিটেশন গয়না, কসমেটিকস, কাঠ, কয়লা, জিরা, রসুন, চিনি, চা পাতা, সার, মোবাইল ফোন, মোবাইল ডিসপ্লে, মোবাইল যন্ত্রাংশ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধসহ নানা ধরনের পণ্য। 

এর পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ মাদকও উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল ২১ লাখের বেশি ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ, হেরোইন, ফেনসিডিল, বিদেশি মদ, গাঁজা, নেশাজাতীয় ট্যাবলেট ও ইনজেকশন, বিড়ি-সিগারেট এবং নেশাজাতীয় সিরাপ।

তবে চোরাচালানের আরও বড় তথ্য রয়েছে সরাইল রিজিয়নে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত ওই রিজিয়নের আওতাধীন সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩৩০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা মূল্যের অবৈধ পণ্য জব্দ করা হয়।
এ সময়ে শুধু চোরাচালানবিরোধী অভিযানে জব্দ করা হয় ৩০৯ কোটি ২১ লাখ টাকা মূল্যের পণ্য এবং ৩৭ জনকে আটক করা হয়। মাদকবিরোধী অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ আটক করা হয় আরও ১০২ জনকে।

এ সময় ময়মনসিংহ সেক্টরেও ১৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা মূল্যের চোরাচালানি পণ্য জব্দ করা হয়। অভিযানে অবৈধভাবে উত্তোলিত ১ লাখ ৫০ হাজার ৮৪৪ ঘনফুট বালু, ১৫টি অবৈধ অস্ত্র ও ১০৯ রাউন্ড গুলিও উদ্ধার করা হয়েছে।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  দেশ   বিদেশি চোরাই পণ্য  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close