ঢাকাসহ সারা দেশে ডেঙ্গু ও হামের প্রকোপ কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে চারজন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দুই রোগে নতুন করে আক্রান্ত ও উপসর্গ দেখা দিয়েছে কয়েক হাজার মানুষের শরীরে। হাসপাতালে ভিড় করছেন অসংখ্য রোগী। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত কার্যকর চিকিৎসা এবং গোড়া থেকে রোগ নির্মূলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, একদিনে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে চারজন মারা গেছেন। এ নিয়ে চলতি বছরে মোট ১১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া নতুন করে এক হাজার ২৫২ রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৯৫৪ জন।
দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশু মারা গেছে। এ নিয়ে হামসংক্রান্ত রোগে এখন পর্যন্ত মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৮৬ জনে। গত বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার মধ্যে নিশ্চিত হামে কারও মৃত্যু না হলেও সন্দেহজনক হামে তিনজন মারা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ৯৯ এবং সন্দেহজনক হাম রোগে ৮৮৭ জনের প্রাণ গেছে। এছাড়া নতুন করে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ৮০ জনের। একইসঙ্গে নতুন সন্দেহজনক হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে ৯৬৪ জন। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগী পাওয়া গেছে এক লাখ ৬১ হাজার ১৪৮ জন। অন্যদিকে, একই সময়ে নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৬২৭ জন।
সরেজমিন রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি সরকারি হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, ডেঙ্গু ও হামে আক্রান্ত রোগীদের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। শয্যা সংকটের কারণে অনেক রোগীকে হাসপাতালের বারান্দায় তোশক পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে। হাসপাতালের ওয়ার্ডের পাশাপাশি বারান্দা ও অন্যান্য খোলা জায়গাতেও হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। অভিভাবকদের অনেকে জানান, সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এলেও শয্যা না থাকায় বাধ্য হয়ে তারা বারান্দায় অবস্থান করছেন।
ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদেরও শয্যা সংকটে পড়তে হচ্ছে। অনেকে জানান, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ মোটামুটি পাওয়া গেলেও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার জন্য কাঙ্ক্ষিত শয্যা মিলছে না। প্রতিদিনই নতুন রোগী আসায় পরিস্থিতি আরও চাপের মুখে পড়ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা বাড়লেও সে অনুপাতে চিকিৎসক ও নার্স না বাড়ায় বিদ্যমান জনবলের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসক-নার্সদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। শয্যা সংকট, বাড়তি রোগীর চাপ এবং জনবল ঘাটতি মিলিয়ে রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু ও হামের চিকিৎসা ব্যবস্থায় চাপ ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
মিরপুর থেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী কবির বলেন, ‘হাসপাতালের ডাক্তার-নার্সরা তাদের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করছেন। কিন্তু রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় সবাইকে প্রয়োজন অনুযায়ী যত্ন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
হাসপাতালের একজন নার্স নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘হাসপাতালে বরাদ্দ করা শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে চাইলেও অতিরিক্ত রোগীদের জন্য তেমন কিছু করার সুযোগ থাকছে না। শয্যা সংকটের কারণে অনেক রোগীকেই বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।’
মালিবাগ থেকে হাম আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে আসা এক মা বলেন, কয়েক দিন ধরে শিশুটির শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর তিনি হাসপাতালে নিয়ে আসেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বর্তমানে শিশুটির চিকিৎসা চলছে। তিনি জানান, কয়েক দিন ধরে হাসপাতালে অবস্থান করছেন এবং প্রতিদিনই নতুন করে অসংখ্য রোগী হাসপাতালে আসছেন। রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় চিকিৎসা নিতে আসা অনেককেই শয্যার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বর্ষায় বৃষ্টিকে ডেঙ্গুর জন্য শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখলে সংকট আরও গভীর হবে। কারণ, এখন শুধু বর্ষাকালেই নয়, শীতকালসহ অন্যান্য মৌসুমেও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।
তিনি বলেন, জুনের তুলনায় জুলাইয়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে আগস্টে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ডেঙ্গুর সংক্রমণ হঠাৎ বেড়ে যায় না; এর পেছনে একটি নির্দিষ্ট জৈবিক চক্র কাজ করে। তাই এ মুহূর্তে আতঙ্কিত না হয়ে আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা ও সুযোগ-সুবিধা সীমিত। ফলে অধিকাংশ রোগী উন্নত চিকিৎসার আশায় ঢাকামুখী হন। জেলা পর্যায়ে হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানো গেলে রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর এ অতিরিক্ত চাপ কমানো সম্ভব।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দেশের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর সক্রিয় হওয়া। অর্থাৎ সংকটের শেষ পর্যায়ে গিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা এখনো বেশি। বড় হাসপাতালের আইসিইউ, বিশেষায়িত চিকিৎসা ও সংকটাপন্ন রোগীদের জীবন রক্ষার ব্যবস্থা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর চেয়েও জরুরি হলো রোগী যাতে জটিল অবস্থায় না পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু তৃতীয় স্তরের বা টারশিয়ারি পর্যায়ের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব নয়।
ডা. মুশতাক হোসেন আরও বলেন, আমাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত তৃণমূল পর্যায়ে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা।
সরকারিভাবে ডেঙ্গু পরীক্ষার সুযোগ থাকলেও তা এখনো সবার কাছে সহজলভ্য নয়। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি, নিম্ন আয়ের এলাকা কিংবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের জন্য জ্বরের শুরুতেই পরীক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ জ্বর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যদি বিনামূল্যে পরীক্ষা করা যায় এবং রোগী শনাক্ত হয়, তাহলে তাকে যথাযথ পরামর্শ দেওয়া সম্ভব হবে। ডেঙ্গু মোকাবিলাকে কেবল স্বাস্থ্যসেবার বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না; এটি সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়ও। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সমাজকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে এগিয়ে এসে অসুস্থ দরিদ্র মানুষের খাদ্য ও ন্যূনতম সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
অপরদিকে হামের বিষয়ে ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় টিকা দেওয়ার কার্যক্রম থমকে গিয়েছিল। এ কারণে হামের প্রকোপ বেড়েছে। ওই সময়কার সরকারের অদূরদর্শী কর্মকাণ্ডের ফল বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে। যারা টিকা নেননি তারা এর পরিনাম ভোগ করছেন। বিশেষ করে যেসব শিশু মাতৃদুগ্ধ পান করেণি এবং হামের কোনো টিকাও নেয়নি, তারা হাম রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, হামের জন্য নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। রোগী ভেদে কার্যকর ওষুধ ও পথ্য দিতে হবে। রোগীকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। প্রচুর তরল ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে। যেহেতু সংক্রামক রোগ, তাই রোগীকে আলাদা রাখতে হবে। আক্রান্তদের সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে মুমূর্ষু রোগীদের জন্য আইসিউর ব্যববস্থা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে বিশেষ ওয়ার্ড করে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এসব করা গেলে রোগটি বেশি করে ছড়াতে পারবে না। এভাবে কার্কর ব্যববস্থা নিলে ধীরে ধীরে এ রোগের প্রকোপ কমবে।
কেকে/ এমএস