বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত পেরিয়ে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নের গহিন পাহাড়ি জঙ্গল ও চোরাইপথ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এর মধ্যে ইয়াবা, আইস, বিদেশি মদ, বিদেশি সিগারেটসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, কুরুকপাতা ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ও সীমান্তসংলগ্ন বিভিন্ন চোরাইপথগুলো মাদক পাচারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এবং যোগাযোগব্যবস্থা কঠিন হওয়ায় এসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে মাদক পরিবহনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবির পৃথক অভিযানে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য উদ্ধার হয়েছে। এসব অভিযানের ফলে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকটি চক্রের তৎপরতার বিষয়ও সামনে এসেছে।
আলীকদম থানা সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের দিকে উপজেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সময়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে ২৭ হাজার ৮৯২ পিস ইয়াবা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। মাদক কারবারি ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে ৮টি মামলা হয়। মাদক বিক্রি, পরিবহন ও চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ১১ জনকে আটক করা হয়।
এদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাসে চলমান অভিযানের তথ্য সূত্রে আরও জানা যায়, উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশের পৃথক পৃথক অভিযানে বিভিন্ন সময়ে ১ হাজার ৩৫ পিস ইয়াবা, আফিম ফল ৯টি, ৬০০ গ্রাম আফিম ফলের বীজ, ১ কেজি আফিমের শুকনা খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ২.৩৯০ গ্রাম গাঁজাসহ ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে।
আলীকদম উপজেলার মাদক পরিবহন কাজে নিরাপদ সড়ক হিসেবে দুর্গম ৪ নম্বর কুরুকপাতা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী ৫৬, ৫৭ ও ৫৮ পিলার হয়ে সীমান্ত এলাকার পাহাড়ি ঝিরি ও বন জঙ্গল পাড়ি দিয়ে আলীকদমে নিয়ে আসছে এসব মাদকদ্রব্য। এ মাদকদ্রব্যগুলো সীমান্তবর্তী পাড়ার মেনচং ম্রো কারবারীপাড়া, বড় বেতি, ছোট বেতি, বড় আগলা, ছোট আগলা, কাম্পুক পাড়া, ধরি ম্রো কারবারীপাড়া, ইয়াংরিং কারবারি পাড়া, সিন্ধু-ইন্দু হয়ে বিভিন্ন বন জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ে নতুন নতুন রাস্তা তৈরির পাশাপাশি ব্যবহার করা হচ্ছে এসব দুর্গম ঝিরির রাস্তাগুলো ব্যবহার করছে মাদক পাচারের সাথে জড়িতরা।
তারা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে কুরুকপাতা হয়ে তৈনখাল দোছড়ি থেকে আলীকদম আমতলী পাহাড়ি রাস্তা ব্যবহার করেন। আবার কুরুকপাতা-পৌয়ামুহুরী সীমান্ত সড়ক হয়ে কালাইয়্যা ছড়া ও নয়াপাড়া ইউনিয়নের বুচির মুখ, মংচা পাড়া হয়ে কলার ঝিরি ভিতরে রাস্তা হয়ে চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের আবাসিক রাস্তা দিয়ে লামা- ফাঁসিয়াখালী-আলীকদমের প্রধান সড়ক ব্যবহারে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এসব মাদকগুলো পাচার করা হচ্ছে।
কাম্পুক ম্রো, মেনদন ম্রো, লেংক্লাং মেম্বারসহ স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, “মাদক কারবারিরা দুর্গম পাহাড়ি এলাকার দরিদ্র ও বেকার তরুণদের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে বাহক হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশেষ করে কুরুকপাতা ইউনিয়নের ম্রো ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর কিছু তরুণকে ইয়াবা, গাঁজা ও আফিম পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে অনেক সময় বাহকরা আটক হলেও মাদক কারবারের নেপথ্যে থাকা মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। ফলে একদিকে যেমন নতুন নতুন তরুণ এই অপরাধচক্রে যুক্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে মাদক পাচারের নেটওয়ার্কও বিস্তৃত হচ্ছে।”
সীমান্তবর্তী এলাকার সচেতন বাসিন্দারা বলছেন, শুধু অভিযান পরিচালনা করে মাদক পাচার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। সীমান্তের দুর্গম এলাকায় স্থায়ী নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি চোরাইপথগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে মাদক পরিবহনে জড়িয়ে পড়া তরুণদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
তাদের মতে, সীমান্তে কঠোর নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি এবং মাদক কারবারের মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা গেলে আলীকদমে মাদকের বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
৪ নম্বর কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো বলেন, “দুর্গম সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচারের বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তরুণ সমাজকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।”
আলীকদম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আলমগীর হোসেন শাহ বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাদক নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে পুলিশ। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “কিশোরদের মাদক থেকে দূরে রাখতে পুলিশের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক সেমিনার ও সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।” স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি মাদক-চোরাচালান কারবারিদের গতিবিধির ওপরও নজর রাখা হচ্ছে বলে জানান।
কেকে/সাশ