সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৩ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু      ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন রাষ্ট্রপতি      ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে দায়িত্বশীল গণমাধ্যম অপরিহার্য: রাষ্ট্রপতি      গণতন্ত্রের জন্য সমঝোতার রাজনীতি করতে হবে : রাষ্ট্রপতি      দেশের মানুষের মাথাপিছু ঋণ এক লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা      ডেঙ্গুতে আরও দুইজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৯৮৮      ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশজুড়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
প্রকৌশলীর জ্ঞান, পেশাদারিত্ব ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষে গড়ে উঠুক আগামী দিনের আইইবি
সাজ্জাদ হোসেন মিলন
প্রকাশ: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:৪৫ পিএম আপডেট: ০৭.০৯.২০২৬ ৫:০২ পিএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

একটি দেশের উন্নয়নের গল্প শুধু রাজনীতি, অর্থনীতি কিংবা অবকাঠামোর গল্প নয়। এর নেপথ্যে থাকে অসংখ্য প্রকৌশলীর মেধা, শ্রম, সিদ্ধান্ত ও দায়িত্ববোধ। একটি সেতু যখন নদীর দুই পাড়কে যুক্ত করে, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র যখন আলো জ্বালায়, একটি শিল্পকারখানা যখন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে কিংবা একটি নগর যখন পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যায়—প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রকৌশলীর জ্ঞান ও দক্ষতার প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকে। তাই প্রকৌশল কেবল একটি পেশা নয়; এটি মানুষের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি এক গভীর দায়িত্ব।

এই দায়িত্ববোধ থেকেই ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দ্য ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি)। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আইইবি দেশের প্রকৌশল পেশার বিকাশ, প্রকৌশলীদের পেশাগত মর্যাদা এবং জাতীয় উন্নয়ন ভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন দেশের বহু খ্যাতিমান প্রকৌশলী ও জাতীয় উন্নয়নের অগ্রপথিক। তাঁদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব ও অবদান আইইবি-’র ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

কিন্তু ঐতিহ্য শুধু স্মরণ করার বিষয় নয়; ঐতিহ্যকে সময়ের সঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও বর্তমান প্রজন্মের। আর সেই জায়গাতেই আজকের আইইবি নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। আগামী ১২ নভেম্বর ২০২৬ অনুষ্ঠেয় নির্বাচন শুধু নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি প্রকৌশলী সমাজ আগামী দিনে নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে কোন পথে দেখতে চায়, তারও একটি সিদ্ধান্ত।

আজকের পৃথিবী গতকালের পৃথিবী নয়। আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্ট, অ্যাটোমোশন, রিনিউভ্যুয়েল এনার্জি, স্মার্ট অবকাঠামো, ডিজিটাল ডিজাইন, উন্নত উৎপাদন এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল ইঞ্জিনিয়ারিং সফটওয়্যার প্রকৌশল পেশার ধরন বদলে দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জনের পর শেখার পথ শেষ হয়ে যায় না; বরং আধুনিক প্রকৌশলীর জন্য শেখার যাত্রা আজীবনের। নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে অজ্ঞতা একজন প্রকৌশলীকে খুব দ্রুতই সময়ের পিছনে ফেলে দিতে পারে।

তাই আইইবিকে শুধু সদস্যদের একটি পেশাগত সংগঠন হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে হতে হবে প্রকৌশলীদের জ্ঞান মিলনমেলা—যেখানে প্রবীণ প্রকৌশলীর দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তরুণ প্রকৌশলীর নতুন প্রযুক্তির জ্ঞান, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সঙ্গে শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদা এবং দেশীয় অভিজ্ঞতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক উৎকর্ষের সংযোগ ঘটবে।

এই জ্ঞানভিত্তিক আইইবি গড়ে তুলতে প্রয়োজন নিয়মিত প্রযুক্তিগত কর্মশালা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, গবেষণা, সেমিনার, পেশাগত উন্নয়ন কর্মসূচি এবং অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের ম্যানটরিং ব্যবস্থা। বিশেষ করে তরুণ প্রকৌশলীদের জন্য আইইবি হতে পারে তাদের পেশাগত জীবনের আতুর ঘর—যেখান থেকে একজন তরুণ প্রকৌশলী প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা, নেতৃত্ব এবং পেশাগত আত্মবিশ্বাস নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করবেন।

তবে জ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি আরও একটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে—পেশাগত নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব।

প্রকৌশলীর একটি ভুল সিদ্ধান্ত কখনো কখনো শুধু একটি প্রকল্পের ক্ষতি করে না; এর সঙ্গে মানুষের জীবন, রাষ্ট্রীয় অর্থ, পরিবেশ এবং জাতীয় সম্পদ জড়িয়ে থাকতে পারে। নিম্নমানের নির্মাণ, দুর্বল নকশা, স্বার্থের সংঘাত, তথ্য গোপন করা, দায়িত্বে অবহেলা কিংবা পেশাগত স্বাধীনতার সঙ্গে আপস—এসব কোনোভাবেই একজন প্রকৌশলীর পরিচয় হতে পারে না।

একজন প্রকৌশলীর সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পদবি নয়, তার সততা। তার সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু অভিজ্ঞতা নয়, তার পেশাগত বিবেক। একটি প্রকৌশলীর স্বাক্ষর শুধু একটি নকশা বা প্রতিবেদনে থাকে না; সেই স্বাক্ষরের সঙ্গে যুক্ত থাকে মানুষের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের আস্থা।

সুতরাং আইইবি-’র ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে এমন একটি পেশাগত সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে যেখানে দক্ষতার সঙ্গে সততা, জ্ঞানের সঙ্গে দায়িত্ববোধ এবং পেশাগত স্বাধীনতার সঙ্গে জনস্বার্থের সমন্বয় থাকবে। আইইবি-’র ইথিকস অ্যান্ড প্রফেশনালিজমকে কোনো আনুষ্ঠানিক স্লোগান নয়, বরং প্রকৌশলী সমাজের দৈনন্দিন পেশাগত আচরণের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালেও আমরা একই ধরনের প্রবণতা দেখতে পাই। যুক্তরাজ্যের ইন্সটিটিউশন অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং অবকাঠামো, পরিবহন, জ্বালানি ও পানি ব্যবস্থাপনার মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব ইঞ্জিনিয়ারিং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে স্বাধীন ও তথ্যভিত্তিক প্রযুক্তিগত পরামর্শ দেয়। অস্ট্রেলিয়ার ‘ইঞ্জিনিয়ারস অস্ট্রেলিয়া’ প্রকৌশলীদের দক্ষতা, পেশাগত মান, নৈতিকতা এবং ধারাবাহিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়।

বাংলাদেশেও আইইবি কেন একইভাবে রাষ্ট্রের একটি নির্ভরযোগ্য প্রকৌশল জ্ঞানভাণ্ডার ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে না?

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, পানি ও পয়োনিষ্কাশন, যোগাযোগ, নগরায়ণ, শিল্পায়ন, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কিংবা অবকাঠামোগত নিরাপত্তা—জাতীয় সংকট দেখা দেওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানানোর পরিবর্তে আইইবি আগে থেকেই গবেষণা ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে সরকারকে সহায়তা করতে পারে।

প্রয়োজনে বিভিন্ন প্রকৌশল শাখার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠন করা যেতে পারে স্বাধীন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইসরি টিম। এসব দল তথ্য সংগ্রহ, ঝুঁকি বিশ্লেষণ, প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন এবং বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ তৈরি করতে পারে। এতে আইইবি কোনোভাবেই সরকারের বিকল্প হবে না; বরং সরকারের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য, পেশাদার ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ প্রকৌশল জ্ঞানভিত্তিক সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে।

দেশের বড় কোনো প্রকল্প নেওয়ার আগে কিংবা বড় কোনো দুর্ঘটনা, বন্যা, অগ্নিকাণ্ড, বিদ্যুৎ বা জ্বালানি সংকট দেখা দিলে আইইবি-’র বিশেষজ্ঞ মতামত রাষ্ট্রের কাজে লাগতে পারে। আবার সংকট শেষ হওয়ার পর শুধু দায়ী ব্যক্তি খোঁজার পরিবর্তে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট যাতে আর না ঘটে, তার জন্য প্রযুক্তিগত সমাধানও দিতে পারে আইইবি।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। আইইবি-কে প্রজন্মের মধ্যে জ্ঞান স্থানান্তরের সেতু হতে হবে। আজকের প্রবীণ প্রকৌশলীদের কাছে রয়েছে কয়েক দশকের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা। অন্যদিকে তরুণ প্রকৌশলীদের হাতে রয়েছে নতুন প্রযুক্তি, নতুন চিন্তা ও নতুন উদ্ভাবনের সম্ভাবনা। এই দুই শক্তিকে এক জায়গায় আনতে পারলে আইইবি-’র সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে।

আমরা এমন একটি আইইবি চাই, যেখানে একজন তরুণ প্রকৌশলী শুধু সদস্য হওয়ার গর্ব অনুভব করবেন না; বরং তাঁর পেশাগত ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য আইইবি’-কে প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করবেন। একজন অভিজ্ঞ প্রকৌশলী যেখানে তাঁর জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে আগ্রহী হবেন। একজন গবেষক যেখানে শিল্পখাতের বাস্তব সমস্যার সমাধানের সুযোগ পাবেন। আর রাষ্ট্র যেখানে প্রয়োজনের মুহূর্তে প্রকৌশলীদের সম্মিলিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার দিকে তাকাবে।

শেষ পর্যন্ত আইইবি-এর প্রকৃত শক্তি কোনো ভবন, পদ-পদবি কিংবা আয়োজনের সংখ্যায় নয়। এর শক্তি হলো দেশের প্রকৌশলীদের সম্মিলিত জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সততা ও পেশাগত সক্ষমতা।

তাই আগামী দিনের নেতৃত্ব নির্বাচনের সময় ব্যক্তিগত পরিচয় বা সাময়িক জনপ্রিয়তার বাইরে আমাদের ভাবতে হবে—কোন নেতৃত্ব আইইবি-এর ঐতিহ্যকে ধারণ করে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে? কে প্রকৌশলী সমাজকে আরও জ্ঞানভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর, নৈতিক ও পেশাদার করে তুলতে পারবে? কে আইইবি-কে শুধু একটি সংগঠন নয়, জাতীয় উন্নয়নের একটি শক্তিশালী জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত করার স্বপ্ন দেখবে?

ঐতিহ্য আমাদের শিকড়। জ্ঞান আমাদের শক্তি। প্রযুক্তি আমাদের গতি। আর নৈতিকতা আমাদের পথচলার দিকনির্দেশনা।

এই চার শক্তির সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে আগামী দিনের আইইবি—যে আইইবি প্রকৌশলীদের জন্য হবে জ্ঞান ও পেশাগত উৎকর্ষের মিলনমেলা, তরুণদের জন্য হবে সম্ভাবনার আতুর ঘর এবং রাষ্ট্রের জন্য হবে নির্ভরযোগ্য প্রকৌশল জ্ঞান ও পরামর্শের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান।

প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন (মিলন)
আজীবন ফেলো, আইইবি ও সদস্য, এ্যাব

কেকে/এআই


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close