সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৩ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু      ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন রাষ্ট্রপতি      ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে দায়িত্বশীল গণমাধ্যম অপরিহার্য: রাষ্ট্রপতি      গণতন্ত্রের জন্য সমঝোতার রাজনীতি করতে হবে : রাষ্ট্রপতি      দেশের মানুষের মাথাপিছু ঋণ এক লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা      ডেঙ্গুতে আরও দুইজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৯৮৮      ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশজুড়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর      
দেশজুড়ে
সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে থাকা গ্রামীণ শিল্প বাঁশ, সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্য
সনৎ চক্রবর্ত্তী, ফরিদপুর
প্রকাশ: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:৪২ পিএম

একসময় ফরিদপুরের গ্রামবাংলার অতি পরিচিত দৃশ্য ছিল বাঁশঝাড়। বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড়, জমির আইল কিংবা রাস্তার পাশে সারি সারি বাঁশগাছ জানান দিত গ্রামীণ জনপদের সৌন্দর্য ও স্বনির্ভরতার কথা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বসতবাড়ি ও অবকাঠামো নির্মাণ, বাঁশের নির্বিচার কাটাই, জমির ব্যবহার পরিবর্তনসহ নানা মানবসৃষ্ট কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত কমে যাচ্ছে বাঁশবাগান। পাশাপাশি ঝড়, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, খরা ও রোগবালাইয়ের মতো প্রাকৃতিক কারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাঁশঝাড়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক দশক আগেও ফরিদপুরের গ্রামাঞ্চলে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কমবেশি বাঁশঝাড় ছিল। ঘরের বেড়া, চালের কাঠামো, মাচা, ডালা, কুলা, ঝুড়ি, খাঁচা, মাছ ধরার সরঞ্জাম, কৃষিকাজের বিভিন্ন উপকরণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বহু জিনিস তৈরিতে বাঁশের ব্যবহার ছিল ব্যাপক। বর্তমানে আধুনিক নির্মাণসামগ্রী ও প্লাস্টিকজাত পণ্যের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাঁশের ব্যবহার কিছুটা কমলেও গ্রামীণ অর্থনীতি ও কারুশিল্পে এর গুরুত্ব এখনো রয়েছে।

ফরিদপুর অঞ্চলে  প্রাকৃতিকভাবে বাঁশ  জন্মাতে দেখা যায়। স্থানীয়ভাবে পরিচিত বাঁশের মধ্যে মুলি বাঁশ, বাঁশ/বাঁশি বাঁশ এবং বোরাক বাঁশ উল্লেখযোগ্য। অঞ্চলভেদে আরও কয়েকটি প্রজাতিও পাওয়া যেতে পারে। বাঁশ দ্রুতবর্ধনশীল উদ্ভিদ হওয়ায় পরিকল্পিতভাবে রোপণ করা গেলে অল্প সময়ের মধ্যেই বাঁশের জোগান বাড়ানো সম্ভব।

ফরিদপুর জেলার  বিভিন্ন হাট-বাজারে এখনো বাঁশ কেনাবেচা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা গ্রামাঞ্চল থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন এলাকার কারিগর ও সাধারণ ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করেন।

বাঁশ শুধু একটি গাছ নয়, গ্রামীণ অর্থনীতি ও সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাঁশ দিয়ে কুলা, চালুন, ডালা, ঝুড়ি, খাঁচা, মাচা, মই, চাটাই, মোড়া, মাছ ধরার চাঁইসহ নানা সামগ্রী তৈরি হয়। ঘরের বেড়া, খুঁটি, পাটাতন ও বিভিন্ন নির্মাণকাজেও বাঁশের ব্যবহার রয়েছে।

বাঁশের ব্যবহার বহুমুখী। কৃষিকাজে বেড়া, মাচা ও বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরিতে; গৃহস্থালিতে কুলা, চালুন, ঝুড়ি, ডালা, খাঁচা ও চাটাই তৈরিতে; নির্মাণকাজে ঘরের খুঁটি, বেড়া ও পাটাতনে বাঁশ ব্যবহৃত হয়। এছাড়া আসবাবপত্র, শৌখিন সামগ্রী ও বিভিন্ন হস্তশিল্প তৈরিতেও বাঁশের ব্যবহার রয়েছে।

বাঁশবাগান কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদই হারিয়ে যাচ্ছে না, সংকটে পড়ছে বাঁশনির্ভর বহু মানুষের জীবিকা এবং গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্পও। তাই পরিকল্পিতভাবে বাঁশ চাষ, বাঁশবাগান সংরক্ষণ, কারিগরদের প্রশিক্ষণ ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব বাঁশের পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে ক্রেতাদেরও উৎসাহিত করতে হবে।

বাঁশ বিক্রেতা মোহাম্মদ মোল্লা  বলেন, “আগের তুলনায় বাঁশবাগান অনেক কমে গেছে। বাঁশ সংগ্রহ করতে এখন দূরের এলাকায় যেতে হয়। বাঁশের দামও বেড়েছে। আগে যে দামে বাঁশ পাওয়া যেত, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি দাম দিতে হচ্ছে। ফলে বাঁশের তৈরি পণ্যের দামও বেড়ে যাচ্ছে। আবার ক্রেতারাও আগের মতো বাঁশের জিনিস কিনছেন না।”

আবুল হোসেন নামে একজন ক্রেতা বলেন, “বাঁশের তৈরি জিনিস দেখতে সুন্দর এবং পরিবেশবান্ধব। কিন্তু বাজারে প্লাস্টিকের অনেক সস্তা পণ্য পাওয়া যায়। তাই অনেকে বাধ্য হয়ে প্লাস্টিকের জিনিস কিনছেন। তবে প্রয়োজনীয় কিছু কাজে এখনো বাঁশের পণ্যই বেশি ভালো মনে হয়।”

কারিগরদের মতে, বাঁশের দাম বৃদ্ধি এবং প্লাস্টিকের সস্তা বিকল্পের কারণে বাঁশের তৈরি পণ্যের বাজার সংকুচিত হচ্ছে। ফলে অনেক কারিগর পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার ময়না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কালিপদ চক্রবর্ত্তী বলেন, “একসময় ফরিদপুর জেলার গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাড়ির সঙ্গে বাঁশঝাড়ের একটি নিবিড় সম্পর্ক ছিল। তখন ঘরের খুঁটি, বেড়া, চালা, রান্নাঘরসহ পরিবারের নানা কাজে বাঁশ ব্যবহার করা হতো। বাঁশ ছাড়া গ্রামের জীবনযাত্রা কল্পনা করাই কঠিন ছিল।”

তিনি আরও বলেন, “আগে বাড়ির আঙিনায় কিংবা জমির আইলে বড় বড় বাঁশঝাড় দেখা যেত। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। মানুষ প্রয়োজনের সময় বাঁশ কাটছে, কিন্তু নতুন করে বাঁশঝাড় তৈরি ও পরিচর্যার দিকে তেমন নজর দিচ্ছে না। ফলে একদিকে বাঁশের সংকট তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে বাঁশের ওপর নির্ভরশীল কারিগর ও কুটিরশিল্পীরাও সমস্যায় পড়ছেন।”

কালিপদ চক্রবর্ত্তীর বলেন, “বাঁশ শুধু একটি গাছ নয়, এটি আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতি ও অর্থনীতির অংশ। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি বাঁশ দিয়ে তৈরি নানা সামগ্রী আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত। তাই বাড়ির অনাবাদি জায়গা, পুকুরপাড় ও জমির আইলে পরিকল্পিতভাবে বাঁশ রোপণ করা দরকার। একই সঙ্গে বাঁশঝাড় সংরক্ষণ ও পরিচর্যায় মানুষকে সচেতন করতে হবে।”

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  ফরিদপুরের বাঁশঝাড়   বাঁশবাগান   গ্রামীণ কুটিরশিল্প   বাঁশের তৈরি পণ্য  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close