একবিংশ শতাব্দীতে কোনো দেশের ভূখণ্ড সামরিক শক্তি দিয়ে দখল করার চেয়ে সেই দেশের জনগণের মনস্তত্ত্ব ও চিন্তাজগৎ নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া অনেক বেশি কার্যকর কৌশল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে ‘সফট পাওয়ার’ (Soft Power)। একে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘সফট পাওয়ার’ বা নরম শক্তির আধিপত্য।
সাম্প্রতিক বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো যখন কোনো অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের শিল্প-সংস্কৃতি বিকাশের নামে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সুপরিকল্পিতভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে, তখন তা আপাতদৃষ্টিতে মৈত্রী বা জনকল্যাণমুখী মনে হলেও এর অন্তরালে থাকে স্থানীয় সাংস্কৃতিক বুনিয়াদকে ভেঙে দেওয়ার এক নীরব নীলনকশা।
যেভাবে ধ্বংসের বীজ বোনে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিনিয়োগ
অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্থানীয় সরকার বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব শিল্প-সংস্কৃতির সুরক্ষায় পর্যাপ্ত মূলধন জোগান দিতে পারে না। এই জাতীয় অর্থসংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যস্থানকে পুঁজি করেই বিদেশি রাষ্ট্র বা তাদের দাতা সংস্থাগুলো ‘সাংস্কৃতিক বিনিময়’ ও ‘উন্নয়ন সহযোগিতা’র মোড়কে প্রবেশ করে। তাদের এই সূক্ষ্ম বিনাশী প্রক্রিয়াটি মূলত তিনটি প্রধান ধাপে সম্পন্ন হয়:
ক. মনস্তাত্ত্বিক হীনমন্যতা তৈরি:
বড় বড় অনুদানপ্রাপ্ত মেগা প্রজেক্ট, জমকালো উৎসব ও দ্বিপক্ষীয় সেমিনারের আড়ালে এমন একটি বয়ান (Narrative) বা ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়, যা পরোক্ষভাবে স্থানীয় জনসাধারণকে বোঝায় যে তাদের নিজস্ব লোকজ সংস্কৃতি, গ্রামীণ ঐতিহ্য বা সামাজিক রীতিনীতিগুলো আসলে অনগ্রসর ও সেকেলে। ফলে অবচেতনভাবেই দেশের তরুণ সমাজের মনে নিজেদের শিকড় নিয়ে এক ধরনের হীনমন্যতা তৈরি হয় এবং তারা বিদেশি সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ মনে করতে শুরু করে।
খ. স্থানীয় স্বাধীন নির্মাতাদের কণ্ঠরোধ:
বিদেশি ফান্ডিং বা বিনিয়োগের মূল শর্তই থাকে তাদের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক আদর্শ ও স্বার্থের অনুকূলে কনটেন্ট তৈরি করা। এর ফলে যেসব স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা, নাট্যকার, সমাজকর্মী বা লেখক বিপুল অঙ্কের ফান্ড গ্রহণ করেন, তারা নিজেদের সৃষ্টিশীলতার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেন। অপরপক্ষে, যারা এই ফান্ডের বাইরে থেকে খাঁটি দেশীয় ধারার মৌলিক কাজ করতে চান, তারা বাজারে পুঁজির অভাবে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেন না এবং ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান।
গ. ভাষা ও ইতিহাসের বিকৃতি সাধন:
উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিনিয়োগের অন্যতম বড় লক্ষ্য থাকে ইতিহাস পুনর্লিখন। যৌথ প্রযোজনার আড়ালে এমন সব সাহিত্য বা চলচ্চিত্রকে প্রমোট করা হয়, যেখানে স্থানীয় ঐতিহাসিক সংগ্রাম বা বীরত্বকে খাটো করে বিদেশি শক্তির ভূমিকাকে একচ্ছত্র ত্রাতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। পাশাপাশি, গণমাধ্যম ও বিনোদনে বিদেশি ভাষার অনাকাঙ্ক্ষিত মিশ্রণে এক ধরনের কৃত্রিম ভাষারীতি চালু করা হয়, যা নিজস্ব মৌলিক ভাষার মিষ্টতা ও শুদ্ধতা নষ্ট করে দেয়।
সংস্কৃতি যখন বাজার অর্থনীতির পণ্যে রূপান্তরিত হয় এবং তার অদৃশ্য সুতা থাকে বিদেশি পুঁজিপতির হাতে, তখন একটি জাতির নিজস্ব আত্মপরিচয় নিলামে উঠে যায়।
সংকটের গভীরতা: ‘হাইব্রিড অপসংস্কৃতি’র জন্ম
বিদেশি পুঁজির অনিয়ন্ত্রিত আগ্রাসনে কোনো সমাজ রাতারাতি সম্পূর্ণ বদলে যায় না; বরং সেখানে এক ধরনের ‘হাইব্রিড অপসংস্কৃতি’র জন্ম হয়। তরুণ প্রজন্ম না পারে সম্পূর্ণ বিদেশি ঐতিহ্য ধারণ করতে, না পারে নিজেদের শেকড় আঁকড়ে ধরতে। এর ফলে সমাজে এক ধরনের নৈতিক, পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়, যা একটি দেশের জাতীয় ঐক্য ও যেকোনো বাহ্যিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শক্তিকে চিরতরে অবশ করে দেয়।
কোনো দেশের ভৌগোলিক সীমানা পাহারা দেওয়া সহজ, কিন্তু সংস্কৃতির চোরাবালি দিয়ে যে মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ঘটে, তা খালি চোখে ধরা অত্যন্ত কঠিন।
উত্তরণ ও আত্মরক্ষার পথ
এই সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদ এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিনিয়োগের মরণফাঁদ থেকে বাঁচতে হলে প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক—উভয় ধরনের জাতীয় কৌশল গ্রহণ করতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, উত্তরণের প্রধান পাঁচটি উপায় নিম্নরূপ:
সাংস্কৃতিক বাজেট বৃদ্ধি ও স্বনির্ভরতা:
বিদেশি ফান্ডের ওপর পরনির্ভরশীলতা কমাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে সাংস্কৃতিক খাতে বার্ষিক বাজেট অন্তত তিন গুণ বৃদ্ধি করতে হবে। দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের বাউল, জারি-সারি, লোকশিল্পী এবং স্বাধীন তরুণ সৃজনশীল উদ্যোক্তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সরাসরি দীর্ঘমেয়াদি অনুদান দিতে হবে, যেন তাদের বিদেশি ফান্ডের মুখাপেক্ষী হতে না হয়।
কঠোর জাতীয় স্ক্রিনিং নীতিমালা:
যেকোনো বিদেশি অ্যাম্বাসি বা আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে সাংস্কৃতিক অনুদান, উৎসব আয়োজন বা যৌথ প্রোডাকশনের ফান্ড নেওয়ার পূর্বে একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন জাতীয় বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কমিটির মাধ্যমে তার চিত্রনাট্য (Script), মূল উদ্দেশ্য এবং রাজনৈতিক এজেন্ডা কঠোরভাবে স্ক্রিনিং করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে।
শিক্ষাব্যবস্থায় ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্তি:
প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকে নিজস্ব লোকসংস্কৃতি, সঠিক জাতীয় ইতিহাস এবং নিজস্ব লোকশিল্পের ইতিহাস বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যেন বিদেশি সংস্কৃতির অসৎ চাকচিক্য শিশুদের মনকে সহজে বিভ্রান্ত করতে না পারে।
দেশীয় কনটেন্টের আধুনিকায়ন:
কেবল ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে তরুণ প্রজন্মকে ধরে রাখা যাবে না। দেশীয় ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত মানের সিনেমাটোগ্রাফি, ভিএফএক্স এবং অ্যানিমেশনের মাধ্যমে আকর্ষণীয় কনটেন্ট হিসেবে ওটিটি (OTT) এবং আন্তর্জাতিক সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিতে হবে। আগ্রাসন রুখতে হলে পাল্টা মানসম্মত কনটেন্ট সৃষ্টিই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
স্বাধীন সাংস্কৃতিক বলয় গঠন:
কর্পোরেট বা বিদেশি স্বার্থমুক্ত নাগরিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে, পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার, থিয়েটার এবং সাংস্কৃতিক ক্লাব গড়ে তুলতে হবে, যা প্রান্তিক পর্যায়ে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা ও সচেতনতা টিকিয়ে রাখবে।
সংস্কৃতির আদান-প্রদান বিশ্বায়নের যুগে অবধারিত, তবে তা হতে হবে সমমর্যাদা, সমতা ও সততার ভিত্তিতে। যখন কোনো বিনিয়োগের পেছনে আধিপত্য বিস্তারের সুপ্ত বাসনা ও নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য থাকে, তখন তাকে সহযোগিতা না বলে ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’ বলাই শ্রেয়।
একটি আত্মমর্যাদাশীল স্বাধীন জাতি হিসেবে নিজস্ব সংস্কৃতির সুরক্ষায় রাষ্ট্র ও জনগণকে এখনই সজাগ হতে হবে; অন্যথায় ভূখণ্ড স্বাধীন থাকলেও মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমরা একটি সাংস্কৃতিক পরজীবী জাতিতে পরিণত হব।
লেখক: ব্যাংকার ও সাংস্কৃতিক কর্মী
কেকে/এমএস