দেশে সারের ঘাটতি বা সংকট নেই। কিন্তু কিছু অসাধু ডিলার ও সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির পাঁয়তারা চালাচ্ছে। তারা বেশি মুনাফার লোভে ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে গুদামে সার জমিয়ে রেখে কৃত্রিম সংকট দেখাচ্ছেন। কৃষকরা অভিযোগ করছেন, ডিলারদের বেশির ভাগই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সময় লাইসেন্সপ্রাপ্ত। গ্যাস ও বিদ্যুতের চলমান সংকটকে পুঁজি করে তারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পাঁয়তারা করছে।
এদিকে, চাহিদামতো সার না পেয়ে কৃষকদের ঘুরতে হচ্ছে। কোথাও সার পাওয়া গেলে বেশি দাম চাওয়া হচ্ছে। আবার পরিচিত ক্রেতা বা আওয়ামী লীগের লোক দেখে বিক্রি করা হচ্ছে। সময়মতো জমিতে সার প্রয়োগ করতে না পারায় ফসলের ফলন নিয়ে উদ্বিগ্ন কৃষকেরা। সরকার বলছে, সার নিয়ে কোনো সংকট সৃষ্টির করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদও বিষয়টি নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই। সার নিয়ে সংকটের যে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। নির্ধারিত ন্যায্যমূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করে কেউ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংকট সৃষ্টির নেপথ্যে আওয়ামী লীগ আমলের ডিলার :
সার নিয়ে সংকট সৃষ্টির আওয়ামী লীগ আমলের ডিলাদের কারসাজি বেরিয়ে এসেছে। গুদামে থাকার পরও কৃষকদের মাঝে বিতরণ না করায় ঝিনাইদহের শৈলকুপায় মেসার্স শুভ এন্টারপ্রাইজ নামে বিসিআইসি সার ডিলারের লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন সই করা এক প্রতিবেদনে সম্প্রতি বিষয়টি উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার পরেও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নণ করতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করছেন ওই ডিলার। গত ৫ সেপ্টেম্বর শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শৈলকুপা উপজেলার গাড়াগঞ্জ বাজারে বিসিআইসি সার ডিলার মেসার্স শুভ এন্টারপ্রাইজের বিক্রয় কেন্দ্রে স্থানীয় কৃষকরা সার না পেয়ে সড়ক অবরোধ করেন।
খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা কৃষি অফিসারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক। পরে শৈলকুপার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং উপসহকারী কৃষি অফিসার ঘটনাস্থলে পৌঁছে ওই ডিলার প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় কেন্দ্র থেকে কৃষকদের মাঝে সার বিক্রয়ের ব্যবস্থা করেন। এ সময় কৃষকরা সড়ক অবরোধ প্রত্যাহার করেন।
জেলা প্রশাসকের প্রতিবেদনে ফ্যাসিস্ট ডিলারের কারসাজি :
ঝিনাইদহের শৈলকুপার ওই ডিলারের গোডাউনে ৩১০ বস্তা ইউরিয়া, ৪১০ বস্তা ডিএপি, ২৮২ বস্তা টিএসপি ও ১৫০ বস্তা এমওপি মজুত ছিল। পর্যাপ্ত সার মজুত থাকা সত্ত্বেও কৃষকের মাঝে সার বিতরণ না করে কৃষকদের বিক্ষুব্ধ করে তোলেন ডিলার। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে মর্মে জেলা প্রশাসকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন সাপেক্ষে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণসংক্রাক্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০২৬’ এর ১৬.১ ধারা মোতাবেক সার ডিলার ‘মেসার্স শুভ এন্টারপ্রাইজ’ এর ডিলারশিপ বাতিলের জন্য সার ডিলারসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি বরাবর সুপারিশ করা হবে। গত ২৫ এপ্রিল ও ৪ আগস্ট মেসার্স শুভ এন্টারপ্রাইজ নামের ওই বিসিআইসি সার ডিলারকে অবৈধভাবে সার মুজত করার অপরাধে দুই দফায় জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
স্থানীয় কৃষকরা অভিযোগ করে জানান, শুভ এন্টারপ্রাইজ নামক ডিলারের স্বত্বাধিকারী মো. নায়েব আলী জোয়াদ্দার। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও ঝিনাইদহ-১ আসনের আওয়ামী লীগ মনোনীত সাবেক সংসদ সদস্য।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় তিনি কারাগারে। ডিলার আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি। তার ভাতিজা এখন ডিলারশিপ চালাচ্ছে। তারা কাউকে আমলে নেয় না। আওয়ামী লীগের লোকজন তাদের কাছে সার পাচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ গেলেই তারা হয়রানি করে। এখনো সারের ডিলারশিপ আওয়ামী লীগের লোকজনের হাতে রয়েছে। তারা সার গুদামে মজুত রেখে কৃষককে হয়রানি করছে। সাধারণ কৃষকদের তো কোনো কিছু করার নেই।
এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন বাবর ফিরোজ বলেন, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য ষড়যন্ত্রমূলক কিছু কিছু ডিলার সার মজুত রেখেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। কৃষকদের হয়রানি করছে। আমরা প্রশাসনকে এই চক্রের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছি। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে সাধারণ মানুষকে যারা জিম্মি করার অপচেষ্টা করছে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন সাপেক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া ওই ডিলারের লাইসেন্স বাতিলের ব্যাপারেও যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর আমরা প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। সার মজুত রেখে কৃষককে হয়রানি করা বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করলে সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
গোয়ালন্দে পাচারকালে সরকারি সার আটক :
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় মেসার্স মন্ডল ট্রেডার্স এর বিরুদ্ধে বিসিআইসি সার পাচারকালে জনগণের হাতে ১৫ বস্তা সারসহ চালক ও ক্রেতাকে আটক করা হয়। এ-সময় সন্ত্রাসী কায়দায় তাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বৃহস্পতিবার সকাল ৭ টার দিকে উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের আনন্দ বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, সারের জন্য গেলে সার নেই—এমন তথ্য জানানো হয়। টাকা বেশি দিয়েও সার পাওয়া যায় না। কিন্তু প্রায়ই শামসু মন্ডলের বাজারে অবস্থিত মন্ডল ট্রেডার্স থেকে জেলার বাইরে বিভিন্ন জায়গায় সার বিক্রি করা হয়। ভিন্ন রাস্তা দিয়ে সার অন্য জেলায় পাঠানো হয়। এটা দেখে কৃষকরা সার গাড়িসহ আটক করে।
কৃষকদের দাবি :
সার নিয়ে ক্ষোভ এখন শুধু বাড়তি দাম বা বাজারে না পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কৃষকরা মনে করছেন, তাদের উৎপাদনব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছেন।
তাদের দাবি, পর্যাপ্ত সার দ্রুত বাজারে সরবরাহ করতে হবে। নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে ডিলার থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থা কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
কেকে/ এমএস