মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলঅয় একের পর এক আজগর, বিষধর ও বিরল প্রজাতির সাপ উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। গত ২ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন আবাসিক এলাকা, বাসাবাড়ি, চা-বাগান ও হাওরাঞ্চল থেকে অজগরসহ বিভিন্ন প্রজাতির ২৩টি সাপ উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন শ্রীমঙ্গল।
সংগঠনটির সূত্র জানায়, উদ্ধারকৃত সাপের মধ্যে রয়েছে ১২টি অজগর, ২টি শঙ্খিনী, ২টি বেত-আঁচড়া, ১টি খৈয়া গোখরা,১টি সাইবোল্ড ওয়াটার স্নেক, ১টি দাঁড়াশ, ১টি সবুজ ফণিমনা, ১টি বিরল প্রজাতির সাপ এবং কমলগঞ্জ থেকে উদ্ধার হওয়া ৫টি বিষধর মনোক্লেড কোবরা সাপের বাচ্চা।
লোকালয়ের কাছাকাছি একের পর এক অজগর উদ্ধারের পাশাপাশি আজ শুক্রবার শ্রীঙ্গলের চা বাগান থেকে প্রাণঘাতী বিষধর খৈয়া গোখরা এবং গতকাল বৃহস্পতিবার কমলগঞ্জের বসতঘরের সিঁড়ির নিচ থেকে বিষধর পাঁচটি মনোক্লেড কোবরা সাপের বাচ্চা উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুরভুরিয়া চা-বাগান থেকে একটি বিশাল আকৃতির বিষধর খৈয়া গোখরা উদ্ধার করা হয়। বাগানের শ্রমিকেরা চা পাতা সংগ্রহের সময় ঝোপের মধ্যে সাপটি দেখতে পান। বিশাল আকৃতির সাপ েেদখে আতঙ্কিত শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে নিরাপদ দূরত্বে সরে যান। পরে বাগান কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনকে খবর দিলে সংগঠনের পরিচালক স্বপন দেব সজল, পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ ও রিদন গৌড় ঘটনাস্থলে গিয়ে সাপটি উদ্ধার করেন।
উদ্ধারকারীরা জানান, সাপটি প্রাণঘাতী বিষধর খৈয়া গোখরা। সতর্কতার সঙ্গে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধারের পর সেটিকে শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বন বিভাগ জানিয়েছে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী সাপটিকে উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করা হবে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) কমলগঞ্জ উপজেলার একটি বসতঘরের সিঁড়ির নিচ থেকে পাঁচটি মনোক্লেড কোবরা সাপের বাচ্চা উদ্ধার করা হয়। বিকেল ৪টার দিকে কমলগঞ্জ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে জাপানী বাড়ি মুজাহিদ মঞ্জিলে এ ঘটনা ঘটে। পরিবারের সদস্যরা সিঁড়ির নিচে একাধিক সাপ দেখতে পেয়ে রাজকান্দি রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনকে খবর দেন। পরে রেঞ্জ কর্মকর্তা তানভীর আহমদ, ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল ও পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ ঘটনাস্থলে গিয়ে সাপগুলো উদ্ধার করেন। পরে সাপগুলো বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বাংলাদেশ বন্যপ্রণী সেবা ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করা সাপের মধ্যে অজগরের সংখ্যাই বেশি। হাইল হাওর, আরামবাগ, উত্তর ভাড়াউড়া, মৌলভীবাজার রোড, ভাড়াউড়া বাগান, সাতগাঁও খিলগাঁও, ইছবপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে একাধিক অজগর উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া নোয়াগাঁও থেকে দাঁড়াশ, বারিধারা আবাসিক এলাকা থেকে বিরল প্রজাতির একটি সাপ, মাঝেরগাঁও ও পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে দুটি শঙ্খিনী, সিন্দুরখান কুঞ্জবন থেকে একটি সাইবোল্ড ওয়াটার স্নেক এবং নতুন বাজার এলাকা থেকে একটি সবুজ ফণিমনা উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া সাপগুলোর একটি বড় অংশ লোকালয়ের খুব কাছাকাছি। বসতবাড়ি, আবাসিক এলাকা, বাজার ও চা-বাগান থেকে উদ্ধার হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আহমদ রিগেন বলেন, ‘শ্রীমঙ্গলে বসতবাড়ির কোনাকাঞ্চি, চা-বাগান, রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে জনবহুল এলাকাতেও প্রায় প্রতিদিন সাপ উদ্ধার হচ্ছে। বিভিন্ন প্রজাতির সাপ একের পর এক লোকালয়ে আসায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাপের উপদ্রব কেন বাড়ছে-এর কারণ খুঁজে বের করা দরকার। উদ্ধার করা সাপগুলোর শেষ ঠিকানা কোথায় হচ্ছে, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।’
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল বলেন, ‘ক্রমাগত বন উজাড়, প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস এবং বনাঞ্চলে মানুষের অনাকাঙ্খিত অনুপ্রবেশের কারণে বন্যপ্রাণীরা খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটে পড়ছে। এ কারণে বিভিন্ন প্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে।’
‘লোকালয়ে আসার পর অনেক প্রাণী মানুষের আঘাত কিংবা সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যাচ্ছে। তাই বন্যপ্রাণী দেখলেই আতঙ্কিত না হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধারকারী দল অথবা বন বিভাগকে খবর দেওয়ার জন্য তিনি নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান।’
তিনি আরও বলেন, ‘উদ্ধার করা প্রাণীগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও পরিচর্যা দিয়ে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।’
পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ বলেন, ‘বন্যপ্রাণী দেখলেই আতঙ্কিত হয়ে অনেক সময় মানুষ সেগুলো হত্যা করেন। অথচ সাপসহ সব বন্যপ্রণী প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাড়ি বা লোকালয়ে সাপ দেখা গেলে আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। প্রাণীটিকে হত্যা না করে নিরাপদে উদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে।’
বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক বলেন, ‘উদ্ধার করা বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে পরিস্থিতি অনুযায়ী নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
মাত্র ১৬ দিনে এত বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে গরম ও বর্ষার সময় হওয়ায় প্রাণীগুলো লোকালয়ে চলে আসতে পারে।’
তার ভাষ্য, বনাঞ্চলে খাবার বা অন্য কোনো সংকট নেই। তবে বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে সড়ক ও রেলপথ চলে যাওয়ায় বন্যপ্রণীর স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে অনেক প্রাণী আহত বা মারা যাচ্ছে।
সড়কপথের বিন্যাস ও ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা গেলে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলেও জানান কাজী নাজমুল হক।
স্থানীয় পরিবেশবিদরা বলছেন, একের পর এক বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসার বিষয়টি উদ্বেগজনক। প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা, বন সংরক্ষণ এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় মানুষ ও বন্যপ্রাণী- উভয়ের জন্যই সংঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কেকে/এমএ