ক্ষমতাচ্যুত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ দেশের রাজনীতিতে ফিরতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে। ভারতে অবস্থানরত দলটির সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণাকে ঘিরেই দলটি নানান কৌশলে রাজপথে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ও প্রচারণামূলক নেটওয়ার্ক রাজধানীসহ সারা দেশে সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ। দলটির শীর্ষ নেতারা দেশের বাইরে পালিয়ে যান। অনেকেই গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন। পরবর্তীতে দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তবে সম্প্রতি রাজধানীতে তাদের নতুন কৌশলে সংগঠিত হওয়ার তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশে বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীরা এসে রাজধানীতে জড়ো হচ্ছেন। এখানে থেকে সংগঠিত হয়ে ঝটিকা মিছিল ও অনলাইন তৎপরতা চালাচ্ছেন।
সংগঠিত হওয়ার অংশ হিসেবে দলটি বিভিন্ন অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কমিটি গঠন করছে। যাতে নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হয়ে কার্যক্রমকে গতিশীল রাখতে পারে। তবে এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও রাজধানীজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে গ্রেপ্তার অব্যাহত রেখেছে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নগদ অর্থ, যাতায়াত খরচ ও লোভ দেখিয়ে ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। পলাতক ও শীর্ষ নেতাদের নির্দেশ এবং আর্থিক সহায়তায় এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে।
আ. লীগের আখড়া মিরপুর, মুহাম্মদপুর ও উত্তরা
মিরপুর, মোহাম্মদপুর এবং উত্তরা এলাকাগুলো ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের প্রধান শক্তিশালী ঘাঁটি বা ‘আখড়া’ হিসেবে পরিচিত। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে এই এলাকাগুলোর দলীয় তৎপরতায় বড় স্থবিরতা তৈরি হয়। এ তিনটি এলাকায় আওয়ামী লীগের পূর্বের অবস্থান ফিরিয়ে আনতে সংগঠিত হচ্ছে নেতাকর্মীরা।
মিরপুরের ঢাকা-১৪, ঢাকা-১৫ ও ঢাকা-১৬ আসনের এ বিস্তৃত এলাকাটি আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের জন্য অন্যতম বড় সাংগঠনিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুরের বিভিন্ন গলিতে দলটির ঝটিকা মিছিল বা গোপন তৎপরতার খবর পাওয়া যায়।
এ ছাড়া মোহাম্মদপুরের ঢাকা-১৩ আসনের এ এলাকাটিতে জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং সাদেক খানের মতো প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের শক্ত নিয়ন্ত্রণ ছিল। এলাকাটিকে আওয়ামী লীগের অন্যতম সুরক্ষিত দুর্গ বিবেচনা করা হতো। পতনের পর পুরো সাংগঠনিক চেইন ভেঙে পড়ে। তবে বর্তমানে পুরোনো শক্তি ফেরাতে চেষ্টা করছেন পলাতক নেতারা। এদিক ঢাকার ভিআইপি আবাসিক ও বাণিজ্যিক জোন উত্তরা (ঢাকা-১৮ আসন)। এটি আওয়ামী লীগের শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো ছিল। তবে বর্তমানে এলাকাটি হাতছাড়া হয়ে গেলেও এখানে পুনরায় সংগঠিত হচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেতারা।
দলীয় তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর আওয়ামী লীগের এ সাবেক ঘাঁটিগুলোতে সক্রিয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি দিচ্ছে দলটি। সম্প্রতি ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের তেজগাঁও থানা, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা ও হাতিরঝিল থানার কামিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া যুবলীগের অন্তর্গত ঢাকা-১৮ আসন উত্তরা পশ্চিম থানার এবং তুরাগ থানার ৫১, ৫৩, ৫৪ নং ওয়ার্ড যুবলীগের আংশিক পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। তা ছাড়া মিরপুরের বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের ঘোষণা করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুবলীগের এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রত্যাবর্তনকে সামনে রেখে এই কমিটি ঘোষণার আন্দোলন আরও বেগবান হবে। নতুন এ নেতৃত্বের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের এ ঘাঁটিগুলোতে দলীয় দৃশ্যমান কর্মকাণ্ড চলবে।
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের ঢাকায় জড়ো করা হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল এবং সংগঠনের উপস্থিতি জানান দেওয়ার তৎপরতার কথাও জানা যাচ্ছে। সম্ভাব্য নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিও বাড়ছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্পট নির্ধারণ করেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো। এরমধ্যে তারা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণ করেছে।
এরই অংশ হিসেবে গত শুক্রবার রাজধানীর গুলশানে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল হয়েছে। এছাড়া ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। মশাল মিছিল, লাঠি মিছিলসহ ঢাকা শহরে ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি ও আইনশৃঙ্খলা বিঘ্ন করতে রয়েছে নানা ছক। যদিও কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া দলটির নেতাকর্মীদের অনেককে গ্রেপ্তার করে হেফাজতে নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
আ.লীগের ঝটিকা মিছিল ঘিরে ছক
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ঝটিকা মিছিল ঘিরে ভয়ংকর ছকের তথ্য মিলেছে। গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে উঠে এসেছে, এসব কর্মসূচির নেপথ্যে রয়েছেন দলটির পলাতক ও আত্মগোপনে থাকা কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের নগদ অর্থ দিয়ে সংগঠিত করে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে।
সূত্র জানায়, অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য এ ধরনের কার্যক্রমের নেপথ্য অর্থায়ন ও ইন্ধনদাতা হিসাবে পতিত সরকারের এমন কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে যাদের কেউ আছেন জেলে, কেউ দেশে আত্মগোপনে, কেউ বিদেশে থেকে অর্থায়ন করছেন। এদিকে গুলশানে বড় ধরনের ঝটিকা মিছিলের ঘটনা ভাবিয়ে তুলেছে পুলিশ প্রশাসনকে। এ ঘটনায় পুলিশের ব্যর্থতা ও দায়দায়িত্ব নির্ধারণে ডিএমপির পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে এরইমধ্যে আওয়ামী লীগের ৭২ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গতকাল আওয়ামী লীগের ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। গত রোববার রাতে রাজধানীর উত্তরা থেকে জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সদস্য এস এম শাহীনুজ্জামান শাহীনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য।
গোয়েন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নগরীতে হঠাৎ ঝটিকা মিছিল বের করে জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর কৌশল হিসাবে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নগদ অর্থ দিয়ে সংগঠিত করা হচ্ছে। এসব অর্থের জোগান আসছে সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সংসদ-সদস্য, মেয়র ও স্থানীয় কাউন্সিলরদের তহবিল থেকে। মিছিলে অংশ নিতে আসা কর্মীদের দৈনিক নির্দিষ্ট পরিমাণ নগদ টাকা ও যাতায়াত খরচ দেওয়া হয়। নেপথ্যে থাকা পলাতক নেতাদের প্রতিনিধি ও সহযোগীরা ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার অর্থ লেনদেন তদারকি করছে। এ বিষয়ে হুন্ডি, বিকাশ ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেওয়া অর্থের লেনদেন রেকর্ড পর্যালোচনা করছে গোয়েন্দারা।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল বের করার সময় হাতেনাতে আটক হওয়া ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অর্থায়ন ও পরিকল্পনার বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য মিলেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে আমরা কিছু নাম পেয়েছি। তাদের উদ্দেশ্য অনেক বড়। প্রাপ্ত তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারের উপকমিশনার (ডিসি) আকতার হোসেন বলেন, ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, গত বছরের ৫ আগস্ট মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। কিন্তু জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ডিসেম্বরে দেশে ফেরাতে নির্দেশনা অনুযায়ী নেতাকর্মীরা রাজধানী দখল নেবে। সারা দেশ থেকে নেতাকর্মীরা এখন ঢাকায়।
কেকে/ এমএস