সাগর-রুনি হত্যা মামলায় বড়লেখার এনামুলকে পিবিআই তদন্তে সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিক দম্পতি হত্যার অপবাদ বয়ে বেড়াচ্ছেন মৌলভীবাজারের বড়লেখার এনামুল আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবীর। কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়াই সন্দেহের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারের পর জীবনের সাড়ে ১৩ বছর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন তিনি। বহুল আলোচিত সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া নিরাপত্তাপ্রহরী এনামুলের হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পায়নি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
দীর্ঘ সাড়ে ১৩ বছরেও তদন্তকারী সংস্থা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আদালতে এনামুলের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকায় তার পরিবার দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এদিকে পিবিআইয়ের তদন্তে এনামুলের হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তার জন্মস্থান বড়লেখা উপজেলার পূর্ব-দক্ষিণভাগ গ্রামে স্বস্তি ও ক্ষোভের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ছেলের বিষয়ে এ খবর পেয়ে মুক্তির আকুতি জানিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার মা ফাতেমা বেগম। পরিবারের দাবি, দীর্ঘ বিচারহীনতা ও বন্দিজীবনের মানসিক আঘাতে এনামুল এখন স্মৃতিশক্তি হারিয়ে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছেন।
পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর বিভাগের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ সব তথ্য উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আদালতের আদেশে গত ২২ এপ্রিল কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে এনামুলকে ফের জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। দীর্ঘদিনের বন্দিজীবনে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলায় তিনি কোনো প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। কেবল এলোমেলো কথা বলছিলেন।
কারা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলায় বর্তমানে এনামুলকে সাধারণ বন্দিদের থেকে আলাদা রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তার জরুরি ও উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এনামুলের পরিবারের অভিযোগ, শুধু এনামুল নন, মামলার অপবাদের কারণে পুরো পরিবারই ধ্বংস হয়ে গেছে। ২০১২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর এনামুলের বাবা মকবুল আলী ওরফে কালা মিয়াকে বাড়ি থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তুলে নিয়ে যায় বলে পরিবারের দাবি। ২১ দিন পর রাস্তার পাশে ফেলে রাখা কালা মিয়ার ওপর ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তারা।
পরিবারের দাবি, চিকিৎসার জন্য ভিটেমাটি বিক্রি করে ৬-৭ লাখ টাকা খরচ করেও তাকে সুস্থ করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা ভোগের পর চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান। এর আগে প্রিয় নাতির পরিণতি এবং ছেলের ওপর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এনামুলের বৃদ্ধা দাদিও মারা যান বলে পরিবার জানিয়েছে।
গ্রেপ্তার ও গুম-খুনের ভয়ে এতদিন আইনি লড়াই চালানো কিংবা আইনজীবীর দ্বারে দ্বারে যাওয়া তো দূরের কথা, পরিবারটিকে আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
চোখের পানি মুছতে মুছতে এনামুলের মা ফাতেমা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে দোষী হতে পারে—সন্দেহে আমরাও বিচার চেয়েছিলাম। কিন্তু সাড়ে ১৩ বছরেও তার কোনো অপরাধের প্রমাণ মিলল না। একটি মিথ্যা সন্দেহে আমার পুরো সংসারটা ধ্বংস হয়ে গেল। স্বামী হারিয়েছি, ছেলেও মৃত্যুর মুখে। আমার ছেলেকে সাগর-রুনি হত্যার অপবাদ থেকে অবিলম্বে মুক্তি এবং উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক।’
এনামুলের বড় ভাই শাহীন আহমেদ তার ভাইয়ের অবিলম্বে মুক্তি ও চিকিৎসার পাশাপাশি নিরপরাধ বাবা ও ভাইয়ের ওপর চালানো নির্যাতনের দায়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসা থেকে সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি তখন সারাদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ওই ভবনে নিরাপত্তাপ্রহরী হিসেবে কর্মরত এনামুলকে সন্দেহভাজন হিসেবে র্যাব গ্রেপ্তার করে। পরবর্তী ডিবি থেকে মামলাটি হাইকোর্টের নির্দেশে টাস্কফোর্সের অধীনে পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। এ পর্যন্ত আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা রেকর্ড ১২৯ বার পিছিয়েছে।
কেকে/এআই