এক হাতে স্টিয়ারিং, অন্য হাতে মোবাইল ফোন। সামনে ছুটছে যাত্রীবোঝাই বাস। মহাসড়কে পাশাপাশি চলছে ট্রাক, পিকআপ, প্রাইভেটকার, অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। এর মধ্যেই কখনো দ্রুতগতিতে ওভারটেক, কখনো কাছাকাছি থাকা গাড়িকে পাশ কাটিয়ে ছুটে চলা। আর এ সব দৃশ্যই মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ধারণ করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ফেসবুক, টিকটক কিংবা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভিডিওতে বাড়ছে লাইক, ভিউ ও শেয়ার।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডের বিনোদনমূলক কনটেন্ট তৈরির এ প্রবণতা কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, তারই উদাহরণ মিলছে কিশোরগঞ্জের মহাসড়কে। যাত্রীবোঝাই বাস চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, ভিডিও ধারণ, বেপরোয়া গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংয়ের অভিযোগ সামনে আসায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সাধারণ যাত্রী ও সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে।
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া বাইপাস ও ঢাকা-কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে চলাচলকারী অন্যন্যা ক্লাসিক পরিবহনের কয়েকটি বাসকে ঘিরে এমন অভিযোগ সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিও নিয়ে আলোচনার মধ্যে ‘টিকটকার’ হিসেবে উল্লেখ করা তিনজনসহ সাত চালককে অনির্দিষ্টকালের জন্য শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিকালে বহিষ্কার করেছে পরিবহন কর্তৃপক্ষ।
বহিষ্কৃত সাত চালক হলেন—মো. সুজন, রুবেল, পাশা, মো. মনজিল, মো. মিজান, মো. আরিফ ও মো. আকাশ।
অন্যন্যা ক্লাসিক পরিবহন (প্রা.) লিমিটেডের জরুরি নোটিশে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের কিছু চালক ও সেবক কোম্পানির সুনাম নষ্ট করার চেষ্টা করছেন। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নোটিশ অনুযায়ী, আজ রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) থেকে সাত চালকের বহিষ্কার কার্যকর হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, ব্যস্ত মহাসড়কে একটি বাস দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আশপাশে রয়েছে বিভিন্ন যানবাহন। এর মধ্যেই বাসটি একের পর এক গাড়িকে অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। কোথাও কাছাকাছি থাকা যানবাহনকে পাশ কাটানো, কোথাও হঠাৎ লেন পরিবর্তন—সব মিলিয়ে ভিডিওটির দৃশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সড়ক ব্যবহারকারীদের প্রশ্ন, একজন চালক যখন যাত্রী নিয়ে ব্যস্ত মহাসড়কে বাস চালাচ্ছেন, তখন তার মনোযোগ যদি গাড়ি চালানোর পরিবর্তে মোবাইল ফোন, ভিডিও ধারণ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট তৈরিতে চলে যায়, তাহলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কতটা বাড়তে পারে?
বিশেষ করে বাসের মতো ভারী ও যাত্রীবোঝাই যানবাহনের ক্ষেত্রে চালকের সামান্য অসতর্কতাও বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। একটি মুহূর্তের ভুল সিদ্ধান্তে প্রাণ যেতে পারে চালক, যাত্রী কিংবা বিপরীত দিক থেকে আসা অন্য যানবাহনের আরোহীদের।
এ অভিযোগের মধ্যেই পাকুন্দিয়ার সুখিয়াবাজার এলাকায় ঢাকা-কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে অন্যন্যা ক্লাসিক পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে গরুবোঝাই পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় পিকআপে থাকা নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার কুন্দারপাড়া গ্রামের বিল্লাল হোসেন (৩৫), আবু সাইদ (৩৯) ও আবদুস ছোবহান (৩৯) নিহত হন। আহত হন আরও তিনজন। দুর্ঘটনায় পিকআপে থাকা সাতটি গরুও মারা যায়।
দুর্ঘটনার পর বাসটির চালক সুজনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। স্থানীয় সূত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার নামে থাকা ফেসবুক অ্যাকাউন্টে চলন্ত অবস্থায় বাস চালানোর সময় ধারণ করা একাধিক ভিডিও প্রকাশ করা হয়।
এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, যাত্রীবাহী বাস চালানোর সময় এমনভাবে ভিডিও ধারণ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য কনটেন্ট তৈরি করা হলে চালকের মনোযোগ কতটা সড়কে থাকে এবং এতে যাত্রী ও অন্য সড়ক ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব।
চলন্ত বাসে মোবাইল ফোন ব্যবহার ও ভিডিও ধারণ নিয়ে পরিবহন কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা নতুন নয়। অন্যন্যা ক্লাসিক পরিবহনের চালক ও সেবকদের জন্য জারি করা আগের একটি জরুরি নোটিশেও চালকদের গতিসীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল।
নোটিশ অনুযায়ী, টোক থানা ঘাট থেকে কিশোরগঞ্জ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৩০-৪০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালানোর নির্দেশনা ছিল। একই সঙ্গে চলন্ত অবস্থায় চালকের মোবাইল ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। চালক ও সেবকের ভিডিও ধারণের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
নির্দেশনা অমান্য করলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রয়োজনে চাকরিচ্যুতির কথাও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছিল। এরপরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ ড্রাইভিংয়ের অভিযোগ ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি সামনে আসায় সাত চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
কিশোরগঞ্জের বিন্নাটি থেকে জেলার শেষ সীমানা থানার ঘাট পর্যন্ত সড়কপথে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত ৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। এ সব দুর্ঘটনায় আটটি গরুও মারা গেছে। শুধু আগস্টের প্রথম ২২ দিনেই ১০টি দুর্ঘটনায় নয়জন নিহত ও ২৬ জন আহত হয়েছেন। ফলে এ সড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকদের দায়িত্বশীলতা এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সড়ক ব্যবহারকারীরা বলছেন, একটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত করে কারণ খোঁজার পাশাপাশি দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ বন্ধ করা জরুরি। বিশেষ করে যাত্রীবাহী বাসের চালকদের ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন ব্যবহার, ভিডিও ধারণ, অতিরিক্ত গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
পথচারী জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘বাসগুলো অনেক সময় এত দ্রুতগতিতে চলে যে রাস্তা পার হওয়ার সময় ভয় লাগে। সামনে ছোট গাড়ি বা মানুষ থাকলেও অনেকে দ্রুত পাশ কাটিয়ে চলে যান। একটু ভুল হলেই বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’
শিক্ষার্থী ইভা আক্তার বলেন, ‘স্কুল-কলেজে যাওয়ার সময় দ্রুতগতির বাস পাশ দিয়ে গেলে অনেক সময় ভয় লাগে। চালকেরা যদি গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ব্যবহার করেন, তাহলে আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা হয়।’
অভিভাবক কামরুল ইসলাম রতন বলেন, ‘সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর পর তার নিরাপদে বাড়ি ফেরার চিন্তাই থাকে। চালকের এক মুহূর্তের অসতর্কতায় একটি পরিবার সারাজীবনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই চালকদের আরও দায়িত্বশীল হওয়া দরকার।’
স্থানীয় শিক্ষক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ চলাচল করেন। চালকদের অসতর্কতা কিংবা অতিরিক্ত গতির কারণে সাধারণ মানুষ ঝুঁকিতে পড়েন। চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোন ব্যবহার বা ভিডিও ধারণ কোনোভাবেই নিরাপদ নয়।’
এ বিষয়ে বহিষ্কৃত চালকের বক্তব্য জানতে তাদের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কয়েকজনের মুঠোফোনে কল করা হলেও তারা ফোন ধরেননি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও সম্পর্কে তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
কটিয়াদী হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ নুবিনুর রহমান বলেন, ‘ভৈরবপুর থেকে ছাদুল্লাচর পর্যন্ত প্রায় ৪৩ কিলোমিটার সড়কে আমরা দিনে-রাতে ২৪ ঘণ্টা টহলে থাকি। কোথাও দুর্ঘটনার খবর পেলেই দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করি। দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহন সরানো, আহতদের হাসপাতালে পাঠানো এবং মৃত্যুর ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়াসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণভাবে গাড়ি চালানো ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়গুলো আমরা আরও গুরুত্বের সঙ্গে নজরদারি করব। এ ধরনের কোনো তথ্য বা অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট গাড়ি আটক করা হবে এবং দায়ী চালকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
চালক নিয়োগের ক্ষেত্রেও পরিবহন মালিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘চালক অবশ্যই প্রশিক্ষিত হতে হবে এবং তার ড্রাইভিং লাইসেন্স বৈধ ও সঠিক কি না, তা শতভাগ নিশ্চিত হয়ে চালক নিয়োগ দিতে হবে। সঠিক লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা যাচাই না করে চালক নিয়োগ করলে পরবর্তীতে দুর্ঘটনা ও আইনগত জটিলতা তৈরি হতে পারে।’
পাকুন্দিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম আরিফুর রহমান বলেন, ‘অন্যন্যা ক্লাসিক পরিবহনের বহিষ্কৃত সাত চালকের বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। এ বিষয়ে আমাদের কেউ অবহিতও করেননি। আপনার কাছ থেকেই বিষয়টি প্রথম জানতে পারলাম। তবে কোনো চালকের বিরুদ্ধে কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে অবশ্যই বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো চালক ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।’
গাজীপুরের কাপাসিয়ার অন্যন্যা ক্লাসিক পরিবহন (প্রা.) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম (বাবুল খান) বলেন, ‘বহিষ্কৃত চালকদের মধ্যে কয়েকজন লোকাল রুটে গাড়ি চালান এবং তারা চলন্ত গাড়ির ভেতরে নিয়মিত টিকটকসহ বিভিন্ন ধরনের ভিডিও করতেন। বিষয়টি আমাদের নজরে আসার পর তাদের চিহ্নিত করা হয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে কোম্পানির সুনাম ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছিল। এ সব কারণেই তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়ে বহিষ্কার করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিবহনে ৩০-৪০ কিলোমিটার গতিসীমা মেনে চলা নিশ্চিত করতে নিয়মিত নজরদারি করা হচ্ছে। শুধু চালক বহিষ্কার করেই আমরা দায়িত্ব শেষ করছি না। বড়ফুল থেকে বিন্নাটি, বিন্নাটি থেকে পাকুন্দিয়া এবং পাকুন্দিয়া থেকে টোক—প্রতিটি রুটে আমাদের কর্মচারী নিয়োজিত রয়েছেন। তারা গাড়িগুলোর চলাচল ও চালকদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছেন।’
সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আমরা চালক ও স্টাফদের কঠোরভাবে বলে দিয়েছি। কোম্পানির নিয়মকানুন ভঙ্গ করলে কোনোভাবেই চাকরিতে থাকা যাবে না। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সে জন্য প্রতিটি গাড়িতে চালকের পেছনে অভিযোগ জানানোর জন্য বোর্ড লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো যাত্রী বা সাধারণ মানুষ চালকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ জানালে আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে চালকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
কেকে/এআই