পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার পর্যটন বন্দর শিল্প বিদ্যুৎ, মৎস্য ও সামুদ্রিক অর্থনীতির যে নতুন বলয় গড়ে উঠছে, সেখানে দ্রুত ও সহজ আকাশ যোগাযোগের ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে। এ বাস্তবতায় উপজেলার গঙ্গামতি-ধুলাসার-কাউয়ার চর এলাকায় সরকারি খাস জমিতে আধুনিক বিমানবন্দর নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রস্তাব উঠেছে।
প্রস্তাবিত এলাকাটি কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের জিরো পয়েন্ট থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় পাঁচ হাজার একরেরও বেশি সরকারি খাস জমি রয়েছে বলে প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে। কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে স্থানটি উপযোগী প্রমাণিত হলে ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় ও জটিলতা তুলনামূলক কম হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই ধরনের তথ্য সাম্প্রতিক প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে।
বর্তমান মাস্টারপ্ল্যানে কলাপাড়ার চাকামইয়া ইউনিয়নের গামুরিবুনিয়া এলাকায় সম্ভাব্য বিমানবন্দরের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই স্থান কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে। নতুন প্রস্তাবে গঙ্গামতি-ধুলাসার-কাউয়ার চর এলাকার কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সক্ষমতা যাচাই করে এটিকে বিকল্প স্থান হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা থেকে বরিশাল পর্যন্ত যোগাযোগ অনেক সহজ হয়েছে। তবে বরিশাল থেকে কলাপাড়া-কুয়াকাটা অঞ্চলে যেতে এখনো প্রায় ১২০ কিলোমিটার সড়কপথ পাড়ি দিতে হয়। এতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লাগে। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটক-দর্শনার্থী ছাড়াও বিদেশি পর্যটক, বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী এবং পায়রা বন্দর ও শিল্পাঞ্চল সংশ্লিষ্টদের দ্রুত যোগাযোগে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
অন্যদিকে কলাপাড়া-পায়রা-কুয়াকাটা এখন আর শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়। পায়রা সমুদ্রবন্দর, সাবমেরিন ল্যান্ডিং স্টেশন, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বানৌজা শের-ই-বাংলা ঘাঁটি, রাডার স্টেশন, মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা স্থাপনা গড়ে উঠেছে। ফলে এ অঞ্চলটি বন্দর, শিল্প, বিদ্যুৎ, পর্যটন ও সামুদ্রিক অর্থনীতিনির্ভর একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হওয়ার পথে।
পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে নাব্যতা উন্নয়ন, ড্রেজিং ও যোগাযোগ অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ এবং পটুয়াখালীতে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ইপিজেডকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডও এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়াচ্ছে।
কুয়াকাটার বিশেষত্ব শুধুমাত্র দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতই নয়। একই স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ, চর বিজয়, লাল কাঁকড়ার আবাসস্থল, অতিথি পাখি, উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য এবং রাখাইন জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। রাখাইন বৌদ্ধবিহার ও মঠসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাও রয়েছে এ অঞ্চলে। তাই এখানে বিমান বন্দর স্থাপনের সম্ভাবতা তৈরি হয়েছে।
সমুদ্রপথে সুন্দরবন ও দুবলার চরসহ অন্যান্য পর্যটন এলাকার সঙ্গে সংযোগ, শুঁটকি পল্লী, সি অ্যাকুরিয়াম, অ্যামিউজমেন্ট পার্কসহ পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে উঠলে কুয়াকাটাকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত পর্যটন বলয় তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিমান যোগাযোগ চালু হলে পর্যটকদের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি পর্যটননির্ভর ব্যবসা ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কলাপাড়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক জানান, গঙ্গামতিতে ব্যাপক খাস জমি ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে। প্রস্তাবিত বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য গঙ্গামতি-ধুলাসার-কাউয়ার চর এলাকায় পাঁচ হাজার একরেরও বেশি সরকারি খাস জমি রয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এরমধ্যে কাউয়ার চর মৌজায় বেড়িবাঁধের অভ্যন্তরে প্রায় এক হাজার একর জমি রয়েছে। উল্লেখযোগ্য স্থাপনা না থাকায় প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া গেলে অধিগ্রহণ ব্যয় তুলনামূলক কম হতে পারে।
তবে শুধু জমির প্রাপ্যতা বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য যথেষ্ট নয়। রানওয়ের প্রয়োজনীয় দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ, ভূমির উচ্চতা, মাটির গঠন, জোয়ার-ভাটা, পানি নিষ্কাশন, বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, আকাশসীমা, বিমান চলাচলের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সুযোগ সবকিছুই সমন্বিতভাবে পরীক্ষা করতে হবে।
বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি থাকায় বিমানবন্দরের রানওয়ে ও অন্যান্য অবকাঠামোর উচ্চতা এবং দুর্যোগ সহনশীল নকশা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে উপকূলীয় প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য, জলপ্রবাহ ও পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও নিরূপণ করতে হবে।
এ ছাড়া প্রস্তাবে শুধু বিমানবন্দর নির্মাণ নয়, এর সঙ্গে সম্ভাব্য রেলওয়ে স্টেশন, আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম এবং কুয়াকাটা মাস্টারপ্ল্যানে নির্ধারিত স্পোর্টস জোনকে সমন্বিত করে একটি ‘ইন্টিগ্রেটেড ট্যুরিজম অ্যান্ড স্পোর্টস সিটি’ গড়ে তোলার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কথাও বলা হয়েছে।
এধরনের সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট, পর্যটন পরিবহন, কনভেনশন ও বিনোদনকেন্দ্রসহ বিভিন্ন সেবা খাত গড়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বিমানবন্দরের সঙ্গে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ অবকাঠামো স্থাপনের সম্ভাবনাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কারিগরি ও কৌশলগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরীক্ষা করার প্রস্তাব রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কক্সবাজার বিমানবন্দর ও মালদ্বীপের ভেলানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সাংবাদিক ও পরিবেশ কর্মী মেজবাহ্ উদ্দিন মাননু বলেন, ‘বিমানবন্দরটি শুধু পর্যটনের জন্য বিবেচনা না করে পায়রা বন্দর, ইপিজেড, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, শিল্প, মৎস্য ও সামুদ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে এর অর্থনৈতিক ব্যবহার বাড়তে পারে। এতে যাত্রী ও সম্ভাব্য কার্গো পরিবহনের জন্যও বহুমাত্রিক চাহিদা তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে।’
চরগঙ্গামতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আশীষ কীর্তনীয়া বলেন, ‘গঙ্গামতি এখন একটি পরিচ্ছন্ন সৈকত। নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ করতে প্রতিদিন শত শত পর্যটক-দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। সৈকতের পরিধিও দিন দিন বাড়ছে। এখান থেকে রাবনাবাদ চ্যানেলের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।’
তার মতে, এখানে বিমানবন্দর হলে কুয়াকাটায় আগত পর্যটকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ইমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল ফরাজি বলেন, ‘কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্রে উন্নীত করতে গঙ্গামতি-কাউয়ার চর এলাকায় বিমানবন্দর নির্মাণ এখন খুবই জরুরী। সেখানে পর্যাপ্ত সরকারি খাস জমি থাকাও সরকারের জন্য ইতিবাচক দিক।’
কুয়াকাটা ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার (টোয়াক) সভাপতি ও কুয়াকাটা উন্নয়ন ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, ‘কুয়াকাটায় বিমানবন্দর স্থাপনের জন্য গঙ্গামতি সৈকত লাগোয়া স্থানটি খুবই বাস্তবসম্মত। এ দাবি আমরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘কুয়াকাটার পর্যটন বিকাশের পাশাপাশি পায়রাকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে বিমানবন্দর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হতে পারে। তবে এর স্থান নির্বাচন হতে হবে তথ্য-উপাত্ত, পরিবেশগত ভারসাম্য, বিমান চলাচলের নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রয়োজন বিবেচনায়। এ জন্য গঙ্গামতি, ধুলাসার ও কাউয়ার চর এলাকার ওপর দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ ফিজিবিলিটি স্টাডি ও সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হলে প্রস্তাবিত স্থানটির বাস্তব সম্ভাবনা যাচাই করা সম্ভব হবে।’
কেকে/এআই