পুরান ঢাকার সকাল। টেবিলে ধোঁয়া ওঠা চা, পাশে প্লেটে সাজানো বাখরখানি আর রসালো সাদা মিষ্টি—নিত্যদিনের চেনা দৃশ্য। পুরান ঢাকার অলিগলি কিংবা নাজিরাবাজারের ব্যস্ততা পেরিয়ে কোথাও না কোথাও সকাল শুরু হয় এই ঐতিহ্যবাহী খাবার দিয়েই।
একসময় বাকরখানি বলতে বোঝাত নোনতা স্বাদের এক ধরনের রুটি। সময়ের সঙ্গে বদলেছে মানুষের রুচি, বদলেছে খাবারের ধরনও। সেই পরিবর্তনের ধারায় বাকরখানিরও এসেছে নানা রূপ। এখন বাজারে পাওয়া যায় মিষ্টি বাকরখানি, পনিরের বাকরখানি, তিলের বাকরখানিসহ নানা স্বাদের পদ। আকারেও এসেছে বৈচিত্র্য—কখনো ছোট, কখনো বড়; কখনো গোল, আবার কখনো ভিন্ন নকশায়।
তবে এত পরিবর্তনের পরও কি কমেছে বাকরখানির জনপ্রিয়তা?
প্রজন্ম বদলেছে, বদলেছে খাদ্যাভ্যাস। কিন্তু পুরান ঢাকার মানুষের কাছে বাকরখানি যেন এখনো সেই চেনা স্বাদেরই নাম। নতুন প্রজন্মের কাছে এর পরিবেশন ও স্বাদে যুক্ত হয়েছে নতুনত্ব, আর পুরোনো প্রজন্মের কাছে এটি এখনো নস্টালজিয়ার এক টুকরো। সময়ের সঙ্গে বদলেছে বাকরখানির রূপ, কিন্তু হারায়নি তার আবেদন।
যে প্রেমকাহিনি জড়িয়ে বাকরখানির নামে
বাকরখানি ময়দা দিয়ে তৈরি এক ধরনের রুটি। বাংলাদেশে এর প্রচলন ও নামকরণ নিয়ে রয়েছে নানা মত। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি জনশ্রুতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রেম, বিরহ ও করুণ পরিণতির এক গল্প।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, মুঘল আমলের জমিদার আগা বাকের—যিনি আগা বাকের খান নামেও পরিচিত—ছিলেন বাকরখানির নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই চরিত্র। আর তার প্রেমিকা ছিলেন নর্তকী খনি বেগম।
কথিত আছে, নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর দত্তকপুত্র আগা বাকের ছিলেন মেধাবী ও যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী। রাজধানী মুর্শিদাবাদের নর্তকী খনি বেগমের সঙ্গে তার গভীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু তাদের এই সম্পর্কে বাধা হয়ে দাঁড়ান নগর কোতোয়াল ও উজিরপুত্র জয়নাল খান। খনি বেগমের প্রতি আকৃষ্ট জয়নাল তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
প্রত্যাখ্যাত হয়ে জয়নাল খনি বেগমের ক্ষতি করার চেষ্টা করেন। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান আগা বাকের। কথিত আছে, তলোয়ারযুদ্ধে তিনি জয়নালকে পরাজিত করেন। এরপর জয়নালের দুই বন্ধু উজিরের কাছে মিথ্যা খবর দেন—বাকের জয়নালকে হত্যা করে তাঁর লাশ গুম করেছেন।
ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে ক্ষুব্ধ হন উজির। তিনি নবাবের কাছে বাকেরের শাস্তি দাবি করেন। পরিস্থিতির একপর্যায়ে নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ বাকেরকে বাঘের খাঁচায় নিক্ষেপের নির্দেশ দেন। কিন্তু কথিত আছে, বাকের সেই বাঘকে পরাস্ত করে প্রাণে বেঁচে যান।
এরই মধ্যে প্রকাশ পায় জয়নালের মৃত্যুর খবরটি ছিল মিথ্যা। জয়নাল তখনো জীবিত এবং খনি বেগমকে জোর করে দক্ষিণ বাংলায় নিয়ে গেছেন। প্রিয়তমাকে উদ্ধারের জন্য বাকেরও সেখানে ছুটে যান। পিছু নেন উজির জাহান্দার খান।
কাহিনির সবচেয়ে করুণ পরিণতি ঘটে সেখানে। কথিত আছে, জয়নাল বাকেরকে হত্যার চেষ্টা করলে উজির নিজের ছেলেকেই তলোয়ারের আঘাতে হত্যা করেন। এরপর জয়নাল মৃত্যুর আগে খনি বেগমকেও তলোয়ারের আঘাতে হত্যা করেন।
প্রিয়তমাকে হারিয়ে বাকের সবকিছু ত্যাগ করে থেকে যান তার সমাধির কাছে। কথিত আছে, খনি বেগমকে বাকেরগঞ্জ এলাকায় সমাধিস্থ করা হয়। আর আগা বাকেরের নাম থেকেই পরবর্তীতে বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ অঞ্চলের নাম ‘বাকেরগঞ্জ’ হয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
এই প্রেম, বিচ্ছেদ আর করুণ পরিণতির গল্পের সঙ্গেই বাখরখানির নাম জড়িয়ে আছে বলে প্রচলিত আছে। ‘বাকের’ ও ‘খনি’—দুটি নাম মিলিয়ে ‘বাকের-খনি রুটি’, সেখান থেকেই কালক্রমে ‘বাখরখানি’ নামের উৎপত্তি—এমন একটি মতও প্রচলিত।
নামকরণ নিয়ে আছে ভিন্ন মতও
তবে বাকরখানির নামকরণ নিয়ে এটিই একমাত্র মত নয়। আরেকটি জনশ্রুতি অনুযায়ী, মির্জা আগা বাকের ঢাকায় এই রুটি প্রচলন করেন। তিনি বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের জায়গিরদার ছিলেন। আরামবাগের নর্তকী খনি বেগমের সঙ্গে তার গভীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে কথিত আছে।
পরবর্তী সময়ে আগা বাকের মুর্শিদ কুলি খাঁর কন্যাকে বিয়ে করলেও খনি বেগমের স্মৃতি ভুলতে পারেননি। তার আবিষ্কৃত ও প্রিয় খাবার বিশেষ ধরনের এই রুটির নাম প্রেমের সেই গল্পের সূত্র ধরেই ‘বাকের-খনি রুটি’ রাখা হয়েছিল—এমন জনশ্রুতি রয়েছে। সময়ের সঙ্গে নামটি অপভ্রংশ হয়ে ‘বাখরখানি’ হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
জনশ্রুতিকে ভিত্তি হিসেবে ধরলে বাকরখানির প্রচলন আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ের বলে মনে করা হয়। আবার অন্য একটি মত অনুযায়ী, সিলেট অঞ্চলে প্রথম বাখরখানি তৈরি হয়েছিল।
ইতিহাসের পাতায় এর সুনির্দিষ্ট জন্মকথা নিয়ে মতভেদ থাকলেও বাকরখানি আজ শুধু একটি খাবারের নাম নয়। এটি পুরান ঢাকার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও স্মৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এক স্বাদ। আর এর নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রেমের আখ্যান বাখরখানিকে দিয়েছে আরও এক ভিন্ন মাত্রা—একটি খাবার, যার স্বাদে মিশে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর এক করুণ প্রেমের গল্প।
কেকে/সাশ