‘কবে বিয়ে করছেন?’—প্রশ্নটা শুনতে শুনতে হয়তো কারও কান ঝালাপালা। আত্মীয়ের বাড়িতে গেলে, বন্ধুর আড্ডায় কিংবা কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে—কোনো না কোনোভাবে বিয়ের প্রসঙ্গটি উঠেই আসে। ‘বয়স তো কম হলো না’, ‘এবার বিয়েটা করে ফেলুন’—সঙ্গে যুক্ত হয় আরও কিছু চেনা পরামর্শ। কেউ হেসে এড়িয়ে যান, কেউ প্রসঙ্গ বদলে দেন, আবার কেউ মনে মনে ভাবেন, ‘আমার জীবন, সিদ্ধান্তটাও তো আমারই।’
বিয়ে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়—তবে সবার জীবনে সেই অধ্যায়টি একই সময়ে আসবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। কেউ সংসারী হয়ে জীবনের আনন্দ খুঁজে পান, কেউবা নিজের স্বপ্ন, ক্যারিয়ার, ভ্রমণ কিংবা ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে সঙ্গী করে এগিয়ে চলেন। আর সেই জীবনও যে কম পরিপূর্ণ নয়, সেটিই মনে করিয়ে দেয় অবিবাহিত দিবস।
নিজের মতো করে জীবন কাটানো, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া এবং সঙ্গী না থাকার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখার উপলক্ষ হিসেবেই দিনটি উদ্যাপন করা হয়।
অবিবাহিতদের জীবন উদ্যাপনের ধারণাটি অবশ্য নতুন নয়। কয়েক দশক আগে যুক্তরাষ্ট্রে এর আনুষ্ঠানিক প্রচলন শুরু হয়। ১৯৮৪ সালে দেশটির ওহাইও অঙ্গরাজ্যে ‘বাকআই সিঙ্গেলস কাউন্সিল’ জাতীয় অবিবাহিত সপ্তাহ চালুর উদ্যোগ নেয়। পরে ২০১৪ সালের ১১ জানুয়ারি জাতীয় অবিবাহিত দিবস পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে সেপ্টেম্বরের তৃতীয় পূর্ণ সপ্তাহকে অবিবাহিত সপ্তাহ এবং ওই সপ্তাহের শেষ শনিবারকে জাতীয় অবিবাহিত দিবস হিসেবে উদ্যাপনের প্রচলন তৈরি হয়।
একসময় সমাজে বিয়ে না করাকে অনেকটাই অসম্পূর্ণ জীবন হিসেবে দেখা হতো। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে বিয়ের চাপ ছিল আরও বেশি। বয়স বাড়লেই বিয়ে নিয়ে প্রশ্ন, আত্মীয়দের পরামর্শ কিংবা সামাজিক নানা মন্তব্য—এসব ছিল অনেকের নিত্যসঙ্গী।
সময়ের সঙ্গে সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে। এখন অনেক নারী-পুরুষ নিজের ক্যারিয়ার, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, ভ্রমণ, সৃজনশীলতা কিংবা নিজস্ব পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে অবিবাহিত জীবন বেছে নিচ্ছেন।
কারও কাছে হয়তো এখনো সম্পর্ক বা বিয়ের জন্য উপযুক্ত সময় আসেনি। কেউ নিজের স্বপ্ন পূরণে ব্যস্ত। আবার কেউ একাই নিজের জীবন উপভোগ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাই অবিবাহিত মানেই যে একা বা অসুখী—এ ধারণা এখন অনেকটাই পুরোনো।
অবিবাহিত জীবনের অন্যতম বড় সুবিধা হলো নিজের সময় নিজের মতো করে ব্যবহারের স্বাধীনতা। কোথায় যাবেন, কী করবেন, কখন ঘুমাবেন কিংবা ছুটির দিনটি কীভাবে কাটাবেন—এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অন্য কারও সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজন হয় না।
নিজের যত্ন নেওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চা করা, পরিবার ও বন্ধুদের সময় দেওয়া কিংবা নতুন কোনো শখ গড়ে তোলার সুযোগও থাকে। চাইলে বই পড়া, সিনেমা দেখা, ভ্রমণে বেরিয়ে পড়া কিংবা দীর্ঘ সময় নিজের পছন্দের কাজে কাটানো যায়।
আর একা ঘুমানোর একটি মজার সুবিধাও আছে—সঙ্গীর নাক ডাকার শব্দে মাঝরাতে ঘুম ভাঙার ঝুঁকি নেই!
বিয়ে করবেন কি করবেন না—এটি একান্তই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কারও জীবনে বিয়ে আনন্দ ও পরিপূর্ণতা নিয়ে আসে, আবার কেউ বিয়ে ছাড়াও নিজের জীবনকে অর্থবহ ও আনন্দময় করে তুলতে পারেন। তাই শুধু বয়স হয়েছে বলেই কাউকে বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া বা অবিবাহিত কাউকে অসম্পূর্ণ ভাবার কোনো কারণ নেই।
অবিবাহিত দিবস হয়তো সেই কথাটিই মনে করিয়ে দেয়—জীবনের সুখের সংজ্ঞা সবার কাছে এক নয়। নিজের পছন্দ, স্বাধীনতা ও মানসিক স্বস্তিকে গুরুত্ব দেওয়াও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একা থাকা মানেই একা হয়ে যাওয়া নয়। নিজের মতো করে ভালো থাকা, নিজের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়া এবং নিজের জীবনকে উপভোগ করাও হতে পারে জীবনের বড় আনন্দ।
কেকে/ এমএস