সরকারি নোটিশের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানোর পর মাগুরার মহম্মদপুরে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) মতবিনিময় সভা থেকে সাংবাদিকদের হলরুম ছেড়ে বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভরা মজলিসে জেলা প্রশাসকের এমন অসংবেদনশীল আচরণে স্থানীয় সাংবাদিকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ, অসন্তোষ ও চরম অসম্মানের সৃষ্টি হয়েছে। পেশাগত মর্যাদা রক্ষায় স্থানীয় সাংবাদিক মহল এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছেন।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে মহম্মদপুর উপজেলা পরিষদ মিনি কনফারেন্স রুমে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এ নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, মাগুরা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অনাদি মতাকাব্বীর আহমেদের আগমন উপলক্ষে উপজেলার সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষক ও সাংবাদিকদের উপস্থিত থাকার আহ্বান জানিয়ে নোটিশ জারি করে উপজেলা প্রশাসন।
মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বেদবতী মিস্ত্রী স্বাক্ষরিত স্মারক নং-০৫.৪৪.৫৫৬৬.০০০.০৫.০২৮.২৬-৬৬৬ এবং ২৪ সেপ্টেম্বর তারিখের ঐ নোটিশে স্পষ্টভাবে ‘সাংবাদিকদের’ নাম উল্লেখ করে সভায় উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানানো হয়।
প্রশাসনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মহম্মদপুরের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকেরা নির্ধারিত সময়ে কনফারেন্স রুমে উপস্থিত হন। কিন্তু সভার শুরুতে পরিচয় পর্ব চলাকালে সাংবাদিকেরা যখন নিজেদের পরিচয় দিচ্ছিলেন, ঠিক ওই মুহূর্তে জেলা প্রশাসক অনাদি মতাকাব্বীর আহমেদ নিজে মাইক হাতে নিয়ে সবার সামনে সাংবাদিকদের হলরুম ছেড়ে বের হয়ে যেতে বলেন। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন, শুধু প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক উপস্থিত থাকতে পারবেন, বাকি সাংবাদিকদের বের হয়ে যেতে হবে।
সাংবাদিকরা জানান, দীর্ঘদিন পর জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হওয়ায় মহম্মদপুরের সাংবাদিকরা এলাকার গুরুত্বপূর্ণ জনদুর্ভোগের বিষয়—যেমন নদীভাঙন, সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা, স্বাস্থ্যসেবার সংকট, শিক্ষাব্যবস্থা, মাদক ও কিশোর গ্যাং সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এলাকার সার্বিক উন্নয়নে জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু জেলা প্রশাসকের এমন আচরণের কারণে সেই সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হন।
সাংবাদিকদের ভাষ্য, সংবাদ শুধুমাত্র প্রশাসনের দেওয়া কোনো নির্দিষ্ট ‘প্রেস রিলিজ’ নয়; মাঠপর্যায়ের অবহেলিত মানুষের কথা, যৌক্তিক প্রশ্ন ও এলাকার বাস্তবতার সঠিক প্রতিফলনই সাংবাদিকতার মূল শক্তি। সাংবাদিকদের ডেকে এনে মতামত দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে পরবর্তীতে ‘সংবাদ প্রেস রিলিজের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে’—এ ধরনের বক্তব্য সাংবাদিকতার স্বাধীন ভূমিকা, পেশাগত অধিকার ও প্রকৃত মতবিনিময়ের মূল উদ্দেশ্য নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এ দিকে ২০২৬ সালের জুন মাসে মাগুরা জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদানের পর থেকে এখন পর্যন্ত অনাদি মতাকাব্বীর আহমেদ মহম্মদপুরের সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনা বা মতবিনিময় করেন নাই। অথচ বিগত দিনের জেলা প্রশাসকগণ দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সাংবাদিকদের সঙ্গে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বসতেন, এলাকার উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ ও সমস্যা সমাধানে সাংবাদিকদের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ করতেন। কিন্তু বর্তমান জেলা প্রশাসক সেই প্রশাসনিক সৌজন্য না দেখিয়ে বরং ডেকে এনে অপমান করে বের করে দেওয়ায় সাংবাদিকদের মাঝে ক্ষোভের দাবানল জ্বলছে।
ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় প্রেস ক্লাব মহম্মদপুরের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা বলেন, ‘সকল সাংবাদিকদের নোটিশ দিয়ে দাওয়াত জানিয়ে ডিসি মহোদয়ের মতবিনিময়ে ডাকা হয়েছিল। পেশাগত দায়িত্ববোধ থেকে আমরা সেখানে যাই। কিন্তু ডিসি মহোদয় মাইক হাতে নিয়ে প্রকাশ্যে মাইকে অ্যানাউন্স করে সকলের সামনে সাংবাদিকদের বের হয়ে যেতে বললেন। এ ধরনের আচরণ অত্যন্ত আপত্তিজনক, দুঃখজনক ও মানহানিকর। আমি এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
দৈনিক খোলা কাগজের প্রতিনিধি ও প্রেস ক্লাবের সদস্য এসএম ফারহান বলেন, ‘বিগত দিনে মাগুরায় দায়িত্ব পালনকারী জেলা প্রশাসকগণ মহম্মদপুরে এলে সাংবাদিকদের সঙ্গে সমসাময়িক প্রেক্ষাপট, জনদুর্ভোগ ও স্থানীয় সমস্যা কাটিয়ে ওঠার উপায় নিয়ে উন্মুক্ত মতবিনিময় করতেন। কিন্তু বর্তমান জেলা প্রশাসক যোগদানের পর থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে এ ধরনের কোনো মতবিনিময় তো করেননি, বরং আজকের ঘটনায় সাংবাদিকদের পেশাগত অবস্থানকে চরমভাবে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে।’
দৈনিক মানবজমিন প্রতিনিধি ও প্রেস ক্লাবের সহ-সভাপতি মাহামুদুন নবী বলেন, ‘অতীতের জেলা প্রশাসক মহোদয়দের সঙ্গে সুধীসমাজ ও সাংবাদিকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। জেলা ও উপজেলার অনেক উন্নয়নমূলক বিষয় নিয়ে কথা বলার সুযোগ ছিল। কিন্তু এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অপমানজনক চিত্র দেখতে হলো।’
ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাসেল পারভেজ, দপ্তর সম্পাদক ও এনটিভির অনলাইন করেসপন্ডেন্ট জালাল উদ্দিন হাককানী, প্রচার সম্পাদক ও প্রতিদিনের বাংলাদেশ প্রতিনিধি তুষার আহমেদসহ উপজেলার সর্বস্তরের সংবাদকর্মীরা।
প্রেস ক্লাবের সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ জেলা প্রশাসকের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে জোর দাবি তুলেছেন, ভবিষ্যতে প্রশাসন আয়োজিত যেকোনো মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের যথাযথভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ, স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করার অধিকার এবং এলাকার জনস্বার্থের বিষয় তুলে ধরার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
কেকে/এআই