ক্ষতস্থানে সেলাই করে বাড়ি পাঠানো হয়েছিল রোগী অঞ্জনা দত্তকে। পরে সেই ক্ষতস্থানে পচন ধরলে অসহ্য যন্ত্রণায় আবার হাসপাতালে ছুটতে হয় তাকে। বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের সময় ক্ষতস্থান থেকে বেরিয়ে আসে বাঁশের দুটি টুকরো। মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন ৪০ বছর বয়সী এই নারী।
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়—মৌলভীবাজারের সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থার প্রধান এ হাসপাতালটি দীর্ঘদিন ধরেই নানা সংকটে জর্জরিত। চিকিৎসক ও জনবল সংকট, অচল গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি, এক যুগ ধরে আইসিইউ-সিসিইউ চালু না হওয়া, সীমিত রোগনির্ণয় সুবিধা এবং অতিরিক্ত রোগীর চাপে হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা কার্যত ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। জেলার প্রায় ২১ লাখ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান সরকারি ভরসাস্থল এখন নিজেই সংকটাপন্ন।
সেলাইয়ের পর ক্ষতস্থানে বাঁশের টুকরো
ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মাতারকাপন এলাকার অঞ্জনা দত্ত গত ১১ সেপ্টেম্বর রক্তাক্ত কাটা জখম নিয়ে সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। তার রেজিস্ট্রেশন নম্বর ১১৬৪৬৪। সেখানে জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতস্থানে সেলাই দেওয়ার পর ১৪ সেপ্টেম্বর তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
বাড়ি ফেরার পর ক্ষতস্থানে তীব্র ব্যথা শুরু হয় এবং একপর্যায়ে পচন দেখা দেয়। পরে গত ২৪ সেপ্টেম্বর তাঁকে শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে সার্জারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এস এম গোলাম রহমানের নেতৃত্বে অস্ত্রোপচার করা হলে ক্ষতস্থান থেকে বাঁশের দুটি টুকরো বের করা হয়।
রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ক্ষত পরিষ্কার না করেই সেলাই করে দেওয়ার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন।
এ বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (উপপরিচালক) ডা. প্রণয় কান্তি দাশ বলেন, ‘বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি এবং তদন্ত চলছে। কীভাবে ঘটনাটি ঘটল, তা খতিয়ে দেখে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অর্ধেকের বেশি পদ শূন্য
হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা সংকটে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জনবল ঘাটতি। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ১০৩টি পদই শূন্য। ৮৪টি চিকিৎসক পদের মধ্যে কর্মরত আছেন ৪২ জন। সিনিয়র কনসালট্যান্টসহ চিকিৎসকের ৪২টি পদও শূন্য রয়েছে।
এ ছাড়া ১৪টি টেকনোলজিস্ট পদের বিপরীতে নয়টি পদ শূন্য। বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র পাঁচজন।
১২ বছরেও চালু হয়নি আইসিইউ-সিসিইউ
২০১২ সালে হাসপাতালটি ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। নতুন ভবনে আইসিইউ ও সিসিইউর জন্য ২০টি শয্যাও নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এক যুগ পেরিয়ে গেলেও সেগুলো চালু হয়নি।
ফলে সংকটাপন্ন রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেটে রেফার করতে হচ্ছে। এতে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তি বাড়ছে।
অচল এমআরআই, সীমিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা
হাসপাতালের রোগনির্ণয় ব্যবস্থার চিত্রও উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে পড়ে আছে কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত এমআরআই যন্ত্র। কনসালট্যান্ট ও টেকনোলজিস্টের সংকটের কারণে সপ্তাহে মাত্র তিন দিন এক্স-রে, দুই দিন সিটি স্ক্যান এবং চার দিন আল্ট্রাসনোগ্রাফি সেবা দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে ডায়ালাইসিসের কেমিক্যালের সংকট থাকায় প্রায় ২০০ কিডনি রোগী দীর্ঘ অপেক্ষায় রয়েছেন বলে জানা গেছে। সময়মতো ডায়ালাইসিস না পেয়ে রোগীদের মৃত্যুর অভিযোগও রয়েছে।
ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ রোগীর চাপ
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিদিন বহির্বিভাগ ও আন্তঃবিভাগ মিলিয়ে সহস্রাধিক রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। ভর্তি রোগীর সংখ্যা গড়ে পাঁচ শতাধিক। নির্ধারিত শয্যা না থাকায় অনেক রোগী মেঝে ও বারান্দায় গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
অতিরিক্ত রোগীর চাপ ও স্থান সংকটের কারণে হাসপাতালের টয়লেটসহ বিভিন্ন স্থানে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরি হয়েছে। রোগনির্ণয়ের অভ্যন্তরীণ সুবিধা সীমিত থাকায় বাইরে পরীক্ষা করাতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা। এ সুযোগে হাসপাতালে দালালচক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগও রয়েছে।
শুধু চিকিৎসাসেবাই নয়, অবকাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে। ভবনের ছাদ ও দেয়াল চুইয়ে পানি প্রবেশের কারণে রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
রোগীদের ক্ষোভ
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা পারভীন বেগম বলেন, ‘রিএজেন্টের (রাসায়নিক কেমিক্যাল) অভাবে আমার ব্লাড টেস্ট করা যায়নি। প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া এখানে আর কিছুই মেলে না। সামান্য কিছু হলেই সিলেটে পাঠায়।’
কিডনি রোগী আলতা মিয়া বলেন, ‘ডায়ালাইসিসের জন্য যোগাযোগ করেও শিডিউল পাইনি। জেলার একমাত্র হাসপাতালটি যেন জোড়াতালি দিয়ে চলছে।’
সংকটের কথা স্বীকার কর্তৃপক্ষের
হাসপাতালের সার্বিক সংকট প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক ডা. প্রণয় কান্তি দাশ বলেন, ‘অর্ধেকেরও কম জনবল নিয়ে ৫০০ ভর্তি রোগীর চাপ সামলানো অত্যন্ত কঠিন। সংকট নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।’
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, ‘হাসপাতালের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তবে হাসপাতাল পরিচালনার নিজস্ব বোর্ড থাকায় আমাদের সরাসরি কিছু করার পরিধি সীমিত।’
কেকে/সাশ