লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার কেরামত আলী নামের এক বয়োবৃদ্ধ ভূমিহীন ব্যক্তি নিজের নামে বরাদ্দ পাওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের সরকারি ঘরটি অবশেষে দখলমুক্ত করেছেন। তিনি উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের তালুক দুলালী-বাগড়দী বাজার এলাকার সরকারি আবাসনের একজন বাসিন্দা।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় ও আবাসনের লোকজনের উপস্থিতিতে দখলকৃত ঘরের তালা ভেঙে সেটি উদ্ধার করে কেরামত আলীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুই বছর আগে উপজেলা ইউএনও কার্যালয় থেকে ওই এলাকার সরকারি আবাসনে কেরামত আলীর নামে একটি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। তিনি ওই ঘরে বসবাস করতেন। তবে সংসারের অভাবের তাড়নায় নিজ ঘরটি তালাবদ্ধ রেখে কাজের জন্য ঢাকায় চলে যান। এ সুযোগে তার একমাত্র বসতঘরটি জোরপূর্বক দখলে নেন প্রতিবেশী বুলবুলী নামের এক বিধবা নারী।
স্থানীয় কয়েকজন মাতব্বরের সহযোগিতায় তালাবদ্ধ ঘরে কেউ না থাকার সুযোগে তালা ভেঙে প্রবেশ করে বুলবুলী সেখানে বসবাস শুরু করেন বলে অভিযোগ। পরে ঢাকা থেকে বাড়িতে ফিরে কেরামত আলী দেখতে পান, তার নামে বরাদ্দ ঘরটি বুলবুলী ও তার মেয়ে রোজিনা বেগম দখল করে বসবাস করছেন।
নিঃসঙ্গ ও শারীরিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় কেরামত আলী এতদিন কোনো আইনি পদক্ষেপ বা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি। কোথাও আশ্রয় না পেয়ে বাধ্য হয়ে ওই আবাসনের বিভিন্নজনের বারান্দায় মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন তিনি। পরে নিরুপায় হয়ে নিজের নামে বরাদ্দ ঘরটি উদ্ধারের জন্য সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেন।
অভিযোগ দেওয়ার পর এলাকার কয়েকজন দেওয়ানী মাতব্বর তাকে বিভিন্ন সময় হুমকি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন কেরামত আলী। পরে সোমবার স্থানীয় ও আবাসনের লোকজনের উপস্থিতিতে দখলকৃত ঘরের তালা ভেঙে সেটি কেরামত আলীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
কেরামত আলী বলেন, ‘আমার নামে সরকারি বরাদ্দকৃত ঘরটিতে প্রায় দুই বছর ধরে পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছি। পেটের দায়ে ঢাকায় কাজ করতে ঘরটি তালাবদ্ধ করে রেখে যাই। হঠাৎ গত দুই মাস আগে বুলবুলী ও তার লোকজন আমার ঘরের তালা ভেঙে নিজেদের দখলে নিয়ে বসবাস করতে থাকে। আমি তাদের বলি, এটি আমার ঘর। তোমরা ঘরটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাও। কিন্তু তারা আমার কথায় কোনো কর্ণপাত না করে রোজিনা এলাকার কিছু দেওয়ানী মাতব্বরকে অর্থের বিনিময়ে নিজেদের পক্ষে নিয়ে জোরপূর্বক দখল করে নিজেদের ঘর দাবি করে বসবাস করতে থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরে ঘরটি উদ্ধারের জন্য সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিই। কিন্তু অভিযোগ দেওয়ার পর দীর্ঘ প্রায় দুই মাস প্রশাসনের বারান্দায় ঘুরেছি। অবশেষে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় নিজের নামে বরাদ্দ ঘরটি ফিরে পাওয়ায় আবেগাপ্লুত। জীবনের শেষ বয়সে এসে যে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু উদ্ধার করতে সহযোগিতা করেছে, তাদের প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ।’
অন্যদিকে, বুলবুলী তার বিরুদ্ধে মেয়েসহ হামলার যে অভিযোগ করেছেন, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলেও দাবি করেন কেরামত আলী।
এলাকার মকবুল হোসেন বলেন, ‘আবাসনের জমিগুলো একসময় কেরামতদের ছিল। সেই জমিগুলোতে বাড়িঘর ছিল এবং চাষাবাদ করা হতো। পরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় হঠাৎ তাদের জমিগুলো সরকারি খাস খাতায় চলে যাওয়ায় সে সর্বনাশগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সরকারি প্রশাসন যখন ওই জমিতে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণ করতে আসে, তখন তাকে একটি ঘর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় এবং তার নামে একটি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘রোজিনা এলাকার কিছু কুচক্রী মহলের প্রবঞ্চনায় জোরপূর্বক ওই ঘরে বসবাস করে। তাকে ঘর ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিলে উল্টো নিজের নামে ঘরের দাবি করেন। প্রকৃত ঘরের মালিক একমাত্র কেরামত আলী।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গুঞ্জন বিশ্বাস অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, অন্যায়ভাবে রোজিনা বেদখল করে থাকার পর তাকে বারবার ঘরটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। তিনি বলেন, পূর্বের ইউএনও থাকাকালে অভিযোগটি করা হয়েছিল। তবে স্থানীয়দের সহযোগিতায় কেরামতের ঘরটি দখলমুক্ত করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি জানেন না।
তিনি আরও বলেন, অন্যায়ভাবে কেউ সরকারি ঘর জোর করে দখল করার সুযোগ সমাজে দেওয়া হবে না।
কেকে/ এমএস