মেঘনার বুকজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে অসম্পূর্ণ কয়েকটি পিলার। কোথাও পড়ে আছে নির্মাণসামগ্রী, কোথাও পড়ে রয়েছে যন্ত্রপাতি। কিন্তু নেই শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্য, নেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন। পাঁচমাস ধরে বন্ধ পড়ে আছে নির্মাণকাজ। অথচ এ সেতুকে ঘিরেই কয়েক বছর ধরে স্বপ্ন দেখছিলেন কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের মানুষ।
প্রায় ১৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের বাঙালপাড়া থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের চাতলপাড় পর্যন্ত মেঘনা নদীর ওপর নির্মাণাধীন এক কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটির কাজ হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবরের মধ্যে। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। প্রকল্পের প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর সেটিও থেমে গেছে।
এরই মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশন প্রায় ৩৫ কোটি টাকা বিল উত্তোলন করেছে বলে জানিয়েছে এলজিইডি। কাজ বন্ধ হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির লোকজন নির্মাণস্থল ছেড়ে চলে গেছেন। এমনকি প্রকল্পের নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের ইঞ্জিনিয়ারও চাকরি ছেড়েছেন। ফলে মেঘনার বুকে অসম্পূর্ণ পিলার, তীরে পড়ে থাকা নির্মাণসামগ্রী আর যন্ত্রপাতি এখন সাক্ষ্য দিচ্ছে থমকে যাওয়া একটি বড় প্রকল্পের। এ ভাবে দীর্ঘদিন পড়ে থাকলে নির্মাণসামগ্রী ও যন্ত্রপাতি নষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে প্রকল্পের কাজ পুনরায় শুরু হতে যত দেরি হবে, ততই বাড়বে মানুষের দুর্ভোগ ও অনিশ্চয়তা।
তিন বছরেও শেষ হয়নি সেতুর কাজ
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার বাঙালপাড়া ইউনিয়নের নোয়াগাঁও থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার চাতলপাড় ইউনিয়নের দুর্গাপুর পর্যন্ত মেঘনা নদীর ওপর নির্মাণ হওয়ার কথা এক হাজার মিটার দীর্ঘ সেতুটির।
২০২৩ সালের ১৪ মে অষ্টগ্রামের বাঙালপাড়া ইউনিয়নের নোয়াগাঁও এলাকায় সেতুটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য বদরুদ্দোজা মো. ফরহাদ হোসেন সংগ্রাম যৌথভাবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এরপর শুরু হয় নির্মাণকাজ। মেঘনার বুকের ওপর একের পর এক পিলার উঠতে থাকে। নদীর তীর হয়ে ওঠে নির্মাণকাজের ব্যস্ত এলাকা।
চুক্তি অনুযায়ী ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি। বরং সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও সেতুর বড় একটি অংশ নির্মাণাধীন রয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রকল্পের প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
শুরুতে স্বপ্ন, এখন হতাশা
সেতুর কাজ শুরুর পর অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনের মানুষের মধ্যে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে নৌপথ নির্ভর জীবনযাত্রার অবসান ঘটিয়ে সড়কপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে—এমন প্রত্যাশা ছিল তাদের।
অনেকেই বলেছিলেন, এ সেতু শুধু দুই প্রান্তকে যুক্ত করবে না, পুরো হাওরাঞ্চলের অর্থনীতির চিত্র বদলে দেবে। কাজ শুরুর পর যখন মেঘনার পানির মধ্যে পিলার দৃশ্যমান হতে থাকে, তখন সেই প্রত্যাশা আরও বেড়ে যায়। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই নির্মাণকাজের গতি কমে আসে। একপর্যায়ে শ্রমিক ও নির্মাণসামগ্রীর আনাগোনা কমতে থাকে। পরে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় কাজ।
নির্মাণস্থল এখন অনেকটা পরিত্যক্ত
নির্মাণকাজ বন্ধ হওয়ার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনও চলে গেছেন। ফলে নির্মাণস্থল এখন অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। মেঘনার তীরে ও আশপাশে পড়ে রয়েছে বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী। নদীর মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্পূর্ণ পিলারগুলোও জানান দিচ্ছে, কাজটি এখনো অনেক দূর বাকি।
‘ব্রিজের সঙ্গে আমাদের অনেক স্বপ্ন জড়িত’
স্থানীয় বাসিন্দা আনিসুর রহমান বলেন, ‘এ ব্রিজের সঙ্গে আমাদের অনেক স্বপ্ন জড়িত। কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই অপেক্ষায় আছি, কখন এটি চালু হবে। ব্রিজটি হলে সারাবছর শহরের সঙ্গে সড়কপথে যোগাযোগ থাকবে।’
তিনি বলেন, ‘হাওরের ধান শহরে নিয়ে গিয়ে ভালো দামে বিক্রি করা যাবে। মুমূর্ষু রোগীদের উন্নত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে, শিক্ষার সুযোগও বাড়বে। কিন্তু পাঁচমাস ধরে কাজ বন্ধ থাকায় আমাদের সেই স্বপ্নও স্থবির হয়ে পড়েছে।’
‘পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ব্রিজটি চাই’
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা উসমান মিয়া বলেন, ‘তিন বছর আগে ব্রিজের কাজ শুরু হয়েছে। এখানে আমার অনেক জায়গা গেছে। ব্রিজটি আমাদের অনেক দিনের স্বপ্ন।’
তিনি বলেন, ‘আমার বয়স হয়েছে, হয়তো বেশিদিন বাঁচব না। কিন্তু আমার পরবর্তী প্রজন্ম যেন সারাবছর সড়কপথে শহরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে, এমন আশা ছিল। ব্রিজটি হলে শুধু আমার নয়, হাওরের সব মানুষের উপকার হবে। কিন্তু এখন কাজ বন্ধ করে ঠিকাদারের লোকজন চলে গেছে।’
কৃষকের জন্য খুলবে নতুন বাজার
অষ্টগ্রামসহ হাওরাঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকার একটি অংশ কৃষিনির্ভর। বিশেষ করে ধান উৎপাদন এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমানে কৃষিপণ্য পরিবহনে নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে সময় ও পরিবহন ব্যয় দুটোই বাড়ে। সেতুটি চালু হলে সরাসরি সড়কপথে কৃষিপণ্য বিভিন্ন বাজারে নেওয়া সম্ভব হবে। এতে কৃষকরা দ্রুত পণ্য বাজারজাত করতে পারবেন বলে আশা করছেন তারা।
স্থানীয় কৃষক নূরু মিয়া বলেন, ‘ধান কাটার মৌসুমে আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা পণ্য পরিবহন। ব্রিজ হলে সড়ক দিয়ে দ্রুত ধান বাজারে নেওয়া যাবে। এতে সময় ও খরচ দুটোই কমবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ব্রিজের কাজ বন্ধ দেখে আমরা হতাশ। সরকার দ্রুত কাজ শেষ করলে কৃষকদের অনেক উপকার হবে।’
চিকিৎসায় কমবে দুর্ভোগ
হাওরাঞ্চলের মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে যোগাযোগব্যবস্থা বড় একটি বিষয়। বর্ষায় অনেক এলাকায় নৌপথ ছাড়া বিকল্প যোগাযোগ থাকে না। জরুরি রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে সড়ক যোগাযোগ না থাকায় অনেক সময় দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সেতুটি চালু হলে অষ্টগ্রাম থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে রোগী পরিবহন সহজ হবে।
পল্লী চিকিৎসক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে। সেতুটি হলে অ্যাম্বুলেন্সসহ অন্যান্য যানবাহনে রোগী নেওয়া সহজ হবে। এ কারণে আমরা দ্রুত ব্রিজটি শেষ করার দাবি জানাই।’
শিক্ষার্থীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ
সেতুটিকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও রয়েছে প্রত্যাশা। সারাবছর সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত হলে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত সহজ হবে। বিশেষ করে হাওরের প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
স্থানীয় অভিভাবক আলাল মিয়া বলেন, ‘যোগাযোগের সমস্যার কারণে অনেক সময় ছেলেমেয়েদের দূরের স্কুল-কলেজে পাঠাতে অভিভাবকদের চিন্তা করতে হয়। ব্রিজ হলে সড়ক যোগাযোগ সহজ হবে।’
ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার
সেতুটি নির্মাণ হলে অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনের সঙ্গে নাসিরনগর হয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ তৈরি হবে। এতে পণ্য আনা-নেওয়া সহজ হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারগুলোর সঙ্গে বড় বাজারের সংযোগ বাড়বে। পরিবহনব্যবস্থা সহজ হলে নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
ব্যবসায়ী দুলাল হোসেন বলেন, ‘এখন পণ্য পরিবহনে অনেক ঝামেলা। সেতুটি চালু হলে বাইরে থেকে পণ্য আনা এবং এখানকার পণ্য বাইরে পাঠানো সহজ হবে।’
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ইঞ্জিনিয়ারও নেই
সেতুটির নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ইঞ্জিনিয়ার জাহাঙ্গীর আলম বুলবুলও প্রায় দেড় মাস আগে চাকরি ছেড়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি প্রায় দেড় মাস আগে চাকরি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছি। বর্তমানে প্রকল্পের কাজ কেন বন্ধ রয়েছে, সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও আমার কোনো যোগাযোগ নেই।’
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশলীও প্রকল্প থেকে সরে যাওয়ায় নির্মাণকাজের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আরও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
১৭৭ কোটি টাকার প্রকল্পে ৩৫ কোটি টাকা বিল
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, সেতুটি নির্মাণে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ পর্যন্ত প্রায় ৩৫ কোটি টাকা বিল উত্তোলন করেছে। কাজ হয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পটি এখন নতুন জটিলতার মুখে।
‘চুক্তিভঙ্গ করে চলে গেছে ঠিকাদার’
এলজিইডির অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রকৌশলী মো. মোজাম্মেল হক বলেন, ‘১৭৭ কোটি টাকার প্রকল্পের মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এ পর্যন্ত ৩৫ কোটি টাকা বিল উত্তোলন করেছে।’
তিনি বলেন, ‘তমা কনস্ট্রাকশন চুক্তিভঙ্গ করে কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই চলে গেছে। সরকারের পতনের পর থেকেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক আত্মগোপনে থাকায় প্রকল্পের কাজ ধীরগতিতে চলছিল। তবে গত পাঁচ মাস ধরে কাজ পুরোপুরি বন্ধ।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন নির্মাণসামগ্রী ও যন্ত্রপাতি রেখেই চলে গেছেন।’
নতুন দরপত্রের প্রক্রিয়া শুরু
মোজাম্মেল হক বলেন, ‘অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পন্ন করে দ্রুত সেতুটির নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করা হবে।’
কেকে/এআই