মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তারে ব্যক্তিগত চিঠি লেখা ও আদান-প্রদায়ের প্রচলন অনেকটাই কমে গেছে। ফলে চিঠি পরিবহনের পরিবর্তে এখন পণ্য ও পার্সেল পরিবহনে গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। দ্রুত পার্সেল পরিবহনের সেবা ‘স্পিড পোস্ট’-এর মাধ্যমে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
স্পিড পোস্ট হলো ডাক বিভাগের দ্রুত পার্সেল পরিবহন সেবা। এ সেবার আওতায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পণ্য, নথি ও পার্সেল ডাকঘরে বুকিং নেওয়া হয়। পরে ডাক বিভাগের প্রচলিত পরিবহন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সেগুলো নির্দিষ্ট গন্তব্যে পাঠানো হয়। পার্সেলের অবস্থান জানতে রয়েছে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও ট্রেসিং সুবিধা।
বর্তমানে দেশের প্রচলিত ডাক পরিবহন রুট ব্যবহার করে এসব পার্সেল পরিবহন করা হচ্ছে। যেকোনো পোস্ট অফিস থেকে পণ্য পাঠানো যাচ্ছে গ্রাহকের কাছাকাছি পোস্ট অফিসে। সেখান থেকে গ্রাহক নিজে গিয়ে পণ্য সংগ্রহ করতে পারছেন। পর্যায়ক্রমে দেশের সব সাব-পোস্ট অফিস, বুকিং কাউন্টার ও ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিসে স্পিড পোস্ট পার্সেল বুকিং চালুর পরিকল্পনা রয়েছে ডাক বিভাগের।
ডাক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত নেটওয়ার্কের কারণে পার্সেল পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। বর্তমানে প্রধান ডাকঘর ও উপজেলা ডাকঘরের মাধ্যমে পার্সেল ডেলিভারি দেওয়া হচ্ছে।
চলতি বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাত মাসে স্পিড পোস্টের মাধ্যমে প্রায় ৮১১ টন পণ্য পরিবহন করেছে ডাক বিভাগ।
ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম বলেন, “স্পিড পোস্টে আমরা খুব ভালো সাড়া পেয়েছি। শুধু আমের মৌসুমে ৩০০ টনের বেশি মৌসুমি ফল পরিবহন করেছি। এখন আমাদের লক্ষ্য হোম ডেলিভারি চালু করা। পাশাপাশি ক্যাশ অন ডেলিভারি সেবাও চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য কিছু কার্যক্রম পাইলটিং পর্যায়ে রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, শুধু গ্রাহক পোস্ট অফিসে আসবেন, এমন নয়; ডাক বিভাগও গ্রাহকের কাছে পৌঁছাবে। বর্তমানে পার্সেল পাঠাতে গ্রাহককে পোস্ট অফিসে যেতে হয়। ভবিষ্যতে ঘরে বসে অনলাইনে বুকিং দেওয়ার ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য রয়েছে। এ পরিকল্পনার আওতায় ডাক বিভাগের কর্মীরা গ্রাহকের বাড়ি থেকে পার্সেল সংগ্রহ করবেন।
আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও জনবান্ধব ডাক ও লজিস্টিকস সেবা গড়ে তুলতে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।
তিনি জানান, এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে ই-কমার্স ও লজিস্টিকস সক্ষমতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও ট্রেসিং, পার্সেল পিকআপ ও ডেলিভারি এবং ফুলফিলমেন্ট সেন্টার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃষিপণ্য ও মৌসুমি ফল পরিবহন এবং উদ্যোক্তাভিত্তিক ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস চালুর মাধ্যমে ডাকসেবার পরিধি বাড়ানো হচ্ছে।
ডাক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, স্পিড পোস্টের মাধ্যমে পার্সেল পৌঁছে দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
জেলা শহর থেকে ঢাকায় সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা। এক জেলা শহর থেকে অন্য জেলা শহরে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা। প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে সর্বোচ্চ ৯৬ ঘণ্টা। তবে প্রতি শুক্রবার স্পিড পোস্টের বুকিং ও ইস্যু কার্যক্রম বন্ধ থাকে।
রাজধানীতে দ্রুত সেবা দিতে ঢাকা জিপিও, গুলশান, বনানী, মিরপুর, উত্তরা, খিলগাঁও, মতিঝিল, ধানমন্ডি ও ওয়ারীসহ ২১টি সাব-পোস্ট অফিসে সরাসরি পার্সেল জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
ডাক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে স্পিড পোস্টে সর্বোচ্চ ৩০ কেজি ওজনের পার্সেল গ্রহণ করা হচ্ছে। ১ অক্টোবর থেকে প্রতি কেজি পার্সেলের জন্য ৮ টাকা করে চার্জ নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া এসএমএস ও ফোন নোটিফিকেশনের জন্য অতিরিক্ত এক টাকা নেওয়া হয়।
তবে সেবার মান নিয়ে গ্রাহকের অভিযোগও রয়েছে। চট্টগ্রামের বাসিন্দা ডলি মারমা জানান, স্পিড পোস্টের বিষয়ে ফোন করা হলে বা ইনবক্সে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে উত্তর পাওয়া যায় না।
এক বছরে বিদেশগামী পার্সেল পরিবহন বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ
ডাক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিদেশগামী পার্সেল পরিবহনের পরিমাণ ছিল ২৪৩ টন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১৬ টনে।
অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে বিদেশগামী পার্সেল পরিবহন বেড়েছে ৭৩ টন, যা প্রায় ২৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
আজ ৯ অক্টোবর বিশ্ব ডাক দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছর দেশে বিশ্ব ডাক দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সমন্বিত ডাক নেটওয়ার্ক, সীমাহীন সম্ভাবনা’।
ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তারে চিঠির প্রচলন কমে এলেও পণ্য পরিবহন, ই-কমার্স ও লজিস্টিকস সেবার মাধ্যমে ডাক বিভাগ নতুন সম্ভাবনা তৈরির চেষ্টা করছে। স্পিড পোস্টের পাশাপাশি হোম ডেলিভারি, অনলাইন বুকিং ও ক্যাশ অন ডেলিভারি চালু হলে এ সেবার পরিধি আরও বাড়তে পারে।
কেকে/ এমএস