শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬,
২৫ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● ফ্যাসিবাদ ফিরলে দায় জামায়াতকেই নিতে হবে : শামা ওবায়েদ      ● মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরকারের জনকল্যাণমুখী স্বাস্থ্যনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক : প্রধানমন্ত্রী      ● আবুধাবি টেস্টের প্রথম দিনে ব্যাকফুটে বাংলাদেশ      ● ডেঙ্গুতে আরও একজনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৩০০      ● হামের উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু      ● খতিবের ‘অপসারণ দাবি’ ঘিরে উত্তপ্ত বায়তুল মোকাররম      ● নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন নাভি পিলাই      
খোলাকাগজ স্পেশাল
উপেক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য, চলছে নীরব মহামারি
মোহাম্মদ উল্লাহ
প্রকাশ: শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:৫৭ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

শারীরিক সুস্থতার মতো মানসিক সুস্থতাও মানবজীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি অবহেলিত ও উপেক্ষিত রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত নগরায়ণ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ, প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে দেশে মানসিক সমস্যা এক নীরব মহামারি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। 

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশের প্রায় ১৬.৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১২.৬ শতাংশ শিশু ও কিশোর-কিশোরী কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছেন। সংখ্যার হিসাবে যা প্রায় ৩ কোটির কাছাকাছি। সবচেয়ে সাধারণ সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে বিষণ্নতা এবং উদ্বেগ। গ্রামীণ নারীদের ক্ষেত্রে এ হার আরও বেশি।

সরকারের ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ সার্ভে ২০১৯ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ শতাংশ ও শিশুদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ রোগী চিকিৎসার বাইরে। 

মানসিক রোগকে এখনো বাংলাদেশে একটি সামাজিক কলঙ্ক বা ‘পাগলামি’ হিসেবে দেখা হয়। লোকলজ্জার ভয়ে অনেকেই সমস্যা লুকিয়ে রাখেন। এছাড়া গ্রামীণ বা প্রান্তিক পর্যায়ে এখনো ঝাড়ফুঁক ও কবিরাজি চিকিৎসার মতো অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ওপর ভরসা করার প্রবণতা প্রবল। এ কারণে দেশে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি অবহেলিত ও উপেক্ষিত রয়ে গেছে।

এছাড়া মানসিক হাসপাতালে ভর্তির পর অনেক অভিভাবক রোগীকে বাড়ি নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন, তখন রোগীকে হস্তান্তর করা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। এ কারণে সরকারকে ভূমিকা নিতে হবে। এছাড়া হাসপাতালের স্টাফদের ট্রেনিং দিতে হবে, তা না হলে রোগী সামলানো কষ্টকর কাজ হয়ে যাবে। 

বেসরকারি সংস্থা মাইন্ডস্পেস জানিয়েছে, ১৭ কোটির বেশি মানুষের এই দেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য মাত্র ০.২১ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ০.৪২ জন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট রয়েছেন, যার একটি বড় অংশই আবার ঢাকাকেন্দ্রিক। 

সরকারি তথ্য অনুসারে, দেশের মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ০.৪৪ শতাংশ থেকে ০.৫ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করা হয়, যা এই বিশাল সংকটের তুলনায় অত্যন্ত সামান্য।

এ বিষয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার বলেন, ‘মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি খাতে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জনবলসংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। মানসিক হাসপাতালে ভর্তির পর অনেক অভিভাবক রোগীকে বাড়ি নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন, তখন রোগীকে হস্তান্তর করা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। মানসিক রোগীর ভর্তিপ্রক্রিয়া শারীরিক রোগের রোগীদের চেয়ে ভিন্নতর। যেহেতু মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি অনেক সময় নিজের ভালো-মন্দ বুঝতে পারেন না, অনেক রোগী আত্মহত্যাপ্রবণ হন, অনেক রোগী আগ্রাসী আচরণ করে থাকেন, তাই তাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে ভর্তিরোগীর সঙ্গে একজন কেয়ারগিভার দরকার হয়, যা অনেক ক্ষেত্রেই থাকে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে দীর্ঘমেয়াদে রোগী রাখার সুযোগ নেই। এখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ রোগী বহির্বিভাগে আসেন, বেড অকুপেন্সি রেট প্রায় ১২০ শতাংশ। সাম্প্রতিক সময়ে মাদকাসক্তি ও আচরণগত সমস্যার এবং ডিমেনশিয়া রোগীর হার অনেক বেড়েছে। উন্নত দেশগুলোর মতো অভিভাবকহীন, গৃহহারা মানসিক রোগীদের জন্য সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর বা অন্য কোনো সরকারি বিভাগ অভিভাবকত্বের দায়িত্ব নিলে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সহজ হবে। মানসিক রোগীদের পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সম্প্রসারণ প্রয়োজন। এ জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।’

এ বিষয়ে পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ বলেন, ‘মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে ডায়াবেটিস চিকিৎসার মতো সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে জেলা ও উপজেলা পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা সদর হাসপাতালে মানসিক রোগের চিকিৎসক থাকা প্রয়োজন। মাসে একবার বা দুই মাসে একবার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং নিয়মিত ওষুধ সেবাই অনেক রোগীর জন্য যথেষ্ট। এতে পরিবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
 
তিনি আরও বলেন, ‘চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। রোগী চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরার পর অভিভাবক ও প্রতিবেশীদের কথাবার্তা ও আচরণগত চাপ অনেক সময় তাকে সুস্থ হতে বাধাগ্রস্ত করে। একে ‘হাই এক্সপ্রেসড ইমোশন’ বলা হয়। ওষুধ ঠিকমতো খাওয়ার পরও এই চাপ রোগীর সুস্থতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই এ বিষয়ে সামাজিকভাবে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা বা সাইকোথেরাপি। কিন্তু মানসিক হাসপাতাল, পাবনায় সাইকোলজিস্টের পদ নেই। বিভিন্ন হাসপাতালেও সাইকোলজিস্টের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।’

দেশের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত বড় একটি জনগোষ্ঠী চিকিৎসার বাইরে। এ ঘাটতি কমাতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় গুরুত্ব দিতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়াতে প্রশিক্ষিত কর্মী তৈরি করে প্রাথমিক সহায়তা ও প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। একজন ক্লিনিক্যাল বা কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট কিংবা মনোরোগবিশেষজ্ঞ তৈরি হতে সাত-আট বছর লাগে। তাই দ্রুত কয়েক হাজার বিশেষজ্ঞ তৈরি সম্ভব নয়; বরং কমিউনিটি পর্যায়ে সেবার জন্য প্রশিক্ষিত কর্মী তৈরি করা যেতে পারে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘রোগীর পাশাপাশি পরিবারের যত্ন ও সরকারি স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। দেশের মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসায় সংকট নিরসনে মূল ভূমিকা নিতে হবে সরকারকে। পরিবার ও স্কুলকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় যুক্ত করে শিশুদের মানসিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং শিক্ষকদের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্তে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অপচিকিৎসা রোধে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়িয়ে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।’


কেকে/সাশ 






আরও সংবাদ   বিষয়:  মানসিক স্বাস্থ্য   নীরব মহামারি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close