শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬,
২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● করপোরেটের কবজায় নিত্যপণ্যের বাজার      ● ফ্রি ট্রেড জোন ও রেলভিত্তিক আইসিডিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর      ● আবরার হত্যা মামলার রায় দ্রুত কার্যকরে সহযোগিতার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর      ● রূপপুরের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত অনুমোদন      ● ডেঙ্গুতে একদিনে আরও ৫ জনের প্রাণহানি      ● নতুন করে ৪ মৃত্যু, হাম ও উপসর্গে মোট প্রাণহানি ১১৪৪      ● ১৫ বছরের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ড      
খোলাকাগজ স্পেশাল
অটোরিকশায় থমকে যাচ্ছে জীবন
সফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:০২ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

একসময় নিজের ব্যবসা ছিল, ছিল সচ্ছল সংসার। বয়সের ভারে কারও ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বরং স্বজনদের পাশে থাকার কথা ছিল ৭৬ বছর বয়সি আবদুর রহমানের। এখন সেই মানুষটিকেই চলতে হয় অন্যের সাহায্য নিয়ে। একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়ে কেটে ফেলতে হয়েছে তার ডান পা। চিকিৎসার পেছনে শেষ হয়েছে সঞ্চয়ের বড় একটি অংশ।

আবদুর রহমানের জীবনের এই পরিবর্তন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের। রাস্তায় বেপরোয়া গতিতে ছুটে আসা একটি অটোরিকশা কেড়ে নিয়েছে তার স্বাভাবিকভাবে চলার ক্ষমতা। এখন সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, শরীরে স্থায়ী অক্ষমতা আর চিকিৎসার খরচের চাপ। আবদুর রহমান বলেন, ‘আমি একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলাম। আমার টাকা-পয়সা সব শেষ হয়ে গেছে। এখন আমি পথের ভিখারি। অটোরিকশা যদি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, তাহলে মানুষ বাঁচবে।’

আবদুর রহমান একা নন। প্রতিদিনই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় আহত হচ্ছেন শিশু থেকে বৃদ্ধ, কর্মজীবী থেকে পথচারী। কারও হাত-পা ভাঙছে, কেউ হারাচ্ছেন শরীরের কোনো অঙ্গ, আবার কোনো দুর্ঘটনায় থেমে যাচ্ছে জীবন। একটি দুর্ঘটনার ধাক্কা শুধু আহত ব্যক্তির শরীরেই লাগে না; থমকে যায় পুরো পরিবারের আয়-রোজগার, চিকিৎসার খরচ বাড়ে, অনিশ্চিত হয়ে পড়ে সংসারের ভবিষ্যৎ।

পাঁচ বছরের রাফিও এমনই এক দুর্ঘটনার শিকার। রাস্তা পার হওয়ার সময় একটি অটোরিকশার ধাক্কায় গুরুতর আহত হয় সে। পরিবারের এক সদস্য জানান, খাবার কেনার জন্য রাস্তার পাশের দোকানে যাওয়ার সময় শিশুটিকে ধাক্কা দেয় অটোরিকশাটি। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে শিশুটি ছিল স্বাভাবিক জীবনে, দুর্ঘটনার পর তাকে নিয়ে ছুটতে হয় হাসপাতালে।

নতুন চাকরির সন্ধানে সাভারের পথে বেরিয়েছিলেন সোহেল। সামনে ছিল নতুন জীবনের স্বপ্ন। কিন্তু একটি অটোরিকশা দুর্ঘটনায় সেই স্বপ্ন আটকে যায় হাসপাতালের বিছানায়। একটি গাড়িকে পাশ কাটাতে গিয়ে অটোরিকশার চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে তিনি খাম্বা ও দেয়ালের মাঝখানে চাপা পড়েন। গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ইতোমধ্যে ৫০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে তার।

ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। নগরীর অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক, এমনকি সড়ক-মহাসড়কেও অবাধে চলছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। দিনমজুর, ভ্যানচালক, ছোট ব্যবসায়ী কিংবা বেকার মানুষ— জীবিকার তাগিদে নানা পেশার লোক এখন বেছে নিচ্ছেন এই পেশা। ফলে একদিকে বাড়ছে এ বাহনের সংখ্যা, অন্যদিকে প্রশিক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের ঘাটতিতে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

অটোরিকশা দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে সামনে আসছে চালকদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি। অনেক ক্ষেত্রেই চালক হওয়ার আগে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে গ্রাম থেকে শহরে এসে অটোরিকশা হাতে তুলে নিয়েই রাস্তায় নেমে পড়ছেন অনেকে।

পঞ্চাশোর্ধ্ব হাবিবুর রহমান একসময় ঢাকায় ভ্যানে করে মাছ বিক্রি করতেন। ব্যবসায় মন্দা যাওয়ায় এখন অটোরিকশা চালান। নেই কোনো প্রশিক্ষণ, আগে অটোরিকশা চালানোর অভিজ্ঞতাও ছিল না। তার ভাষায়, ‘অটো চালাতে আবার অভিজ্ঞতা লাগে নাকি? দুই-তিন দিন চালালেই শেখা যায়। প্রশিক্ষণ ছাড়াই আমি শিখেছি। এটা আমার পেশা ছিল না, ঠেকায় পড়ে অটো চালাচ্ছি।’

জীবিকার তাগিদে অন্য পেশা ছেড়ে অটোরিকশায় আসা চালকদের এমন বক্তব্যই দেখাচ্ছে, এ পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে দক্ষতার চেয়ে প্রয়োজনই অনেক সময় বড় হয়ে উঠছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কেউ আগে দিনমজুরি করতেন, কেউ ভ্যান চালাতেন, কেউ ডেকোরেটরের কাজে যুক্ত ছিলেন। কম আয়, কাজের অনিশ্চয়তা কিংবা বেকারত্বের কারণে তারা অটোরিকশা চালানোকে তুলনামূলক সহজ আয়ের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

একজন চালক জানান, আগে একটি অফিসার্স ক্লাবে ডেকোরেটরের কাজে বাসনপত্র ধুতেন। প্রতিদিন আয় হতো ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। ওই আয়ে সংসার চালানো কঠিন হওয়ায় অটোরিকশা চালানো শুরু করেছেন। অন্য একজন জানান, তিনি আগে প্রাইভেটকার চালাতেন। কৃষিকাজের খরচ বেড়ে যাওয়ায় এখন অটোরিকশা চালাচ্ছেন।

অটোরিকশা সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, তুলনামূলক কম খরচে এসব যান তৈরি বা সংগ্রহ করা যায়। চালকদের কেউ কেউ দৈনিক দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত আয়ের কথা জানান। ফলে কম দক্ষতা ও কম বিনিয়োগে নগদ আয়ের সুযোগ অনেককে এ পেশায় টানছে।

কিন্তু প্রশিক্ষণ ছাড়া চালকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে ঝুঁকিও। কোথায় থামতে হবে, কখন গতি কমাতে হবে, কীভাবে মোড় নিতে হবে কিংবা অন্য যানবাহনকে কীভাবে নিরাপদে পাশ কাটাতে হবে—এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে যত্রতত্র থামানো, হঠাৎ লেন পরিবর্তন, বিপরীত দিক দিয়ে চলা, দ্রুতগতিতে ওভারটেক এবং সামনের যানবাহনের খুব কাছাকাছি গিয়ে চলার প্রবণতা।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল এখন শুধু অলিগলি বা আবাসিক এলাকার ছোট সড়কে সীমাবদ্ধ নেই। অনেক জায়গায় প্রধান সড়ক ও মহাসড়কেও এসব যান চলাচল করছে। একই সড়কে ধীরগতির অটোরিকশার সঙ্গে দ্রুতগতির বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল চলাচল করায় সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ছে। অটোরিকশা হঠাৎ লেন পরিবর্তন করলে কিংবা সামনে থাকা যানকে পাশ কাটাতে গিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটলে পেছনের গাড়ির চালকের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচলে শুধু মানুষই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যক্তিগত যানবাহনও। হঠাৎ সামনে চলে আসা, রাস্তার মাঝখানে থেমে যাওয়া কিংবা আকস্মিক দিক পরিবর্তনের কারণে প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটছে।

বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের ঝুঁকি বেশি। অটোরিকশার আকস্মিক গতিপথ পরিবর্তনে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। আবার সংঘর্ষে গাড়ির বডি, লাইট, দরজা কিংবা বাম্পার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মালিককে বহন করতে হচ্ছে বাড়তি মেরামত ব্যয়।

অটোরিকশা চালকদের একটি অংশ এসব যানকে নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় এনে বৈধতা দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। তাদের বক্তব্য, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের প্যাডেলচালিত রিকশার নিবন্ধন ও নবায়নের ব্যবস্থা থাকলেও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রেও স্পষ্ট কাঠামো থাকা প্রয়োজন। 

এক রিকশা ব্যবসায়ী বলেন, দেশে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা চলছে। এসব যান তৈরির ব্যাটারি ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশও বাজারে রয়েছে। সরকার যদি এ খাতকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনে, তাহলে চালক ও মালিকদের দায়িত্বও নির্দিষ্ট করা সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বল্প দূরত্বে কম খরচে যাতায়াতের কারণে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা জনপ্রিয়। একইসঙ্গে এটি বহু মানুষের জীবিকার মাধ্যম। তাই শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, নিরাপদ ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে এ বাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।

চালকদের প্রশিক্ষণ, পরিচয় ও যোগ্যতা যাচাই, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা এবং কোন সড়কে এসব যান চলতে পারবে তা নির্ধারণ করা জরুরি। পাশাপাশি বেপরোয়া গতি, ভুল পথে চলাচল, যত্রতত্র থামানো ও ট্রাফিক আইন অমান্যের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান এবং কার্যকর শাস্তির ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

কারণ একটি অটোরিকশার কয়েক সেকেন্ডের বেপরোয়া চলাচল চালকের কাছে হয়তো সামান্য ঘটনা। কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডই কোনো পরিবারের জন্য হয়ে উঠতে পারে আজীবনের দুর্ভোগ। আবদুর রহমানের মতো কেউ হারাচ্ছেন হাত-পা, কেউ হারাচ্ছেন কর্মক্ষমতা, আবার কেউ হারাচ্ছেন প্রিয়জন।

বেকারত্ব ও কম আয়ের চাপে যখন নতুন নতুন মানুষ অটোরিকশার চালকের আসনে বসছেন, তখন তাদের প্রশিক্ষণ ও সড়ক আইন সম্পর্কে ধারণা নিশ্চিত করা আরও জরুরি। জীবিকার এ বাহন যেন মানুষের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে না ওঠে—নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি এখন সেখানেই।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  অটোরিকশা   জীবন  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close