শরতের নীল আকাশ, সাদা মেঘের ভেলা আর জলাশয়ের শান্ত জলে সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি দেওয়া শালুক—প্রকৃতির এই চিরচেনা দৃশ্য গ্রামবাংলার সৌন্দর্যে যোগ করে অন্যরকম মাধুর্য। একসময় গ্রামের খাল-বিল, পুকুর আর ডোবার জলে অবাধে বেড়ে ওঠা শালুক ছিল গ্রামীণ জীবনের সহজলভ্য এক উপাদান। কালের পরিক্রমায় সেই শালুক এখন স্থান করে নিয়েছে বাজারের বিক্রির ঝুড়িতে। মৌসুমি এই জলজ ফল কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন ক্রেতারা। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি শালুক বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা দরে।
ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা, মধুখালী, সালথা ও নগরকান্দা উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকার গ্রামীণ জনপদে শালুকের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতি, লোকজ ঐতিহ্য আর শৈশবের মধুর স্মৃতি। বর্ষার পানিতে ডুবে থাকা জলাশয়ে জন্ম নেওয়া শালুক শরতের বাজারেও ক্রেতাদের আকর্ষণ করছে। গ্রামবাংলার অনেক মানুষের কাছে শালুকের স্বাদ মানেই ফেলে আসা দিনের গল্প, বন্ধুদের সঙ্গে জলাশয়ে ঘুরে বেড়ানো আর প্রকৃতির কাছ থেকে পাওয়া অনাবিল আনন্দ।
বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা, মধুখালী, সালথা ও নগরকান্দার বিভিন্ন হাটবাজারে মৌসুমি জলজ ফল শালুকের উপস্থিতি গ্রামীণ জীবনের এক পরিচিত চিত্র তুলে ধরে। এই বাজার ঘিরে মানুষের আগ্রহ কেবল কেনাবেচার চিত্র নয়; এটি গ্রামবাংলার পরিবর্তিত জীবনযাত্রারও প্রতিচ্ছবি। একসময় প্রকৃতির কাছ থেকে সহজেই পাওয়া যেত যে শালুক, আজ তা কিনতে হচ্ছে অর্থের বিনিময়ে। জলাশয়ের প্রাপ্যতা, সংগ্রহের শ্রম ও মৌসুমি সরবরাহের ওপর নির্ভর করে এর দামও কমবেশি হতে পারে।
শরতের বাজারে শালুকের উপস্থিতি তাই নিছক একটি পণ্যের আগমন নয়, বরং স্মৃতি ও ঐতিহ্যের ফিরে আসা। সবুজ পাতার আড়াল থেকে উঠে আসা এই জলজ ফল যেন নীরবে বলে যায়—সময় বদলায়, জীবন বদলায়, কিন্তু মাটির সঙ্গে মিশে থাকা শৈশবের স্বাদ কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।
বোয়ালমারী সোনালী ব্যাংকের সামনে শালুক বিক্রি করছিলেন রহমত সেখ। তার ঝুড়িতে সাজানো শালুক দেখে অনেকে থমকে দাঁড়াচ্ছেন। কেউ কিনছেন পুরোনো দিনের স্বাদ ফিরে পেতে, কেউবা পরিবারের সদস্যদের জন্য। বিক্রেতা রহমত জানান, মৌসুমে শালুকের প্রতি মানুষের আগ্রহ দেখা যায়। তবে জলাশয় থেকে শালুক সংগ্রহ করতে সময় ও শ্রম লাগে। বর্তমানে তিনি প্রতি কেজি ১৫০ টাকা দরে শালুক বিক্রি করছেন।
শালুক কিনতে আসা বাবুল শেখ বলেন, “শালুক দেখলেই ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়। আগে গ্রামে খাল-বিল থেকে শালুক সংগ্রহ করতে দেখেছি। এখন বাজার থেকে কিনে খেতে হয়। দাম কিছুটা বেশি হলেও পুরোনো দিনের স্বাদ ফিরে পেতে শালুক কিনতে ইচ্ছে করে।”
শালুকের ঐতিহ্য নিয়ে কথা হয় ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার ময়না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কালিপদ চক্রবর্ত্তীর সঙ্গে।
তিনি বলেন, “শালুক আমাদের গ্রামবাংলার প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। একসময় বর্ষার জল আর গ্রামের জলাশয় ঘিরেই ছিল আমাদের শৈশবের অনেক আনন্দ। শালুকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সেই দিনগুলোর স্মৃতি, মাটির গন্ধ আর গ্রামীণ জীবনের সরলতা। আজ বাজারে টাকা দিয়ে শালুক কিনতে হলেও এর স্বাদ আমাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। নতুন প্রজন্মের কাছে শালুকের মতো দেশজ উপাদানের পরিচয় তুলে ধরা জরুরি, কারণ এগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অনেক গল্প।”
কেকে/এমএ