আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায় ১২০ কোটি তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছাবেন। অথচ বর্তমান প্রবণতা অনুযায়ী, একই সময়ে এসব দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে প্রায় ৪২ কোটি। ফলে বিপুলসংখ্যক তরুণের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা বিশ্ব অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কর্মসংস্থানকে উন্নয়নের কেন্দ্রে রাখা, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং প্রযুক্তিকে উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ১২ অক্টোবর শুরু হয়েছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা। ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এ সভায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী ও ব্যবসায়ী নেতারা অংশ নিচ্ছেন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, আর্থিক স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব এবারের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশ্বব্যাংকের কর্মসংস্থান কৌশলে বলা হয়েছে, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেই হবে না; সেই প্রবৃদ্ধিকে মানুষের জন্য মানসম্মত ও ভালো বেতনের চাকরিতে রূপান্তর করতে হবে। এ জন্য অবকাঠামো ও মানবসম্পদে বিনিয়োগ, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং বেসরকারি মূলধনকে উৎপাদনশীল খাতে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কর্মসংস্থানে বিশাল ব্যবধান
বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ১২০ কোটি তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছালেও বর্তমান প্রবণতা অনুযায়ী নতুন চাকরি তৈরি হতে পারে প্রায় ৪২ কোটি। অর্থাৎ, সম্ভাব্য কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর তুলনায় কর্মসংস্থানের বড় ঘাটতি থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি খাতকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রধান অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, বন্দর, নগর অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের জন্য স্থিতিশীল নীতিমালা ও কার্যকর ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: সম্ভাবনা ও ঝুঁকি
বার্ষিক সভার আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের প্রভাব বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ১২ অক্টোবর ‘Small AI, More and Better Jobs’ শীর্ষক আলোচনায় বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এবং সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট থারমান শানমুগারত্নম উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ব্যবহারিক ও সাশ্রয়ী এআই প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
এআই কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ব্যবসা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। তবে প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে প্রচলিত কাজের ধরন বদলে যাওয়া, নতুনদের চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ কমে যাওয়া এবং দক্ষ কর্মীদের সঙ্গে অদক্ষ কর্মীদের ব্যবধান বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
আইএমএফের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ চাকরি এআইয়ের কারণে প্রভাবিত হতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে সব চাকরি বিলুপ্ত হবে। অনেক পেশায় কাজের ধরন পরিবর্তিত হবে, কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয় হবে এবং নতুন ধরনের কর্মসংস্থানও তৈরি হতে পারে। তাই প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে কর্মীদের নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করা এবং পরিবর্তিত শ্রমবাজারের জন্য প্রস্তুত করা জরুরি।
বিনিয়োগ বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ
কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়ানো এবারের সভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। ১৪ অক্টোবরের কর্মসূচিতে ‘Mobilizing Private Capital for Jobs’ শীর্ষক আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে উদীয়মান অর্থনীতিতে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো, স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন, আর্থিক নিশ্চয়তা এবং নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—মৌলিক অবকাঠামো ও মানবসম্পদে বিনিয়োগ, ব্যবসার জন্য পূর্বানুমানযোগ্য ও সহায়ক পরিবেশ তৈরি এবং বৃহৎ পরিসরে বেসরকারি মূলধন সংগ্রহ। এ তিনটি ক্ষেত্র সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে পারলে শিল্প, কৃষিভিত্তিক ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন ও মূল্য সংযোজনকারী উৎপাদন খাতে নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য ব্যাংককের এ আলোচনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে যুক্ত করা, রপ্তানিমুখী শিল্পের বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিকাশ এখন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার।
এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারিগরি শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো, ব্যবসা পরিচালনার বাধা কমানো, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নত করা এবং নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক সভায় আলোচনা বা অর্থায়নের ঘোষণা নিজে থেকেই নতুন চাকরি নিশ্চিত করে না। বাস্তব সুফল পেতে হলে কার্যকর নীতিমালা, জবাবদিহি, বিনিয়োগের সঠিক ব্যবহার এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
সব মিলিয়ে, ব্যাংককে আইএমএফ–বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার মূল বার্তা হলো—উন্নয়নের সাফল্য শুধু প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে নয়, মানুষের জন্য কতটা মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা গেল, তা দিয়েও মূল্যায়ন করতে হবে। আগামী দিনের অর্থনীতিতে তরুণদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারাই হবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অন্যতম বড় পরীক্ষা।
কেকে/ এমএস