লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার সরল খা উচ্চ বিদ্যালয়ে বহিরাগতদের হামলায় প্রধান শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ ৯ জন আহত হয়েছেন। আহতদের উদ্ধার করে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) এ হামলার ঘটনা ঘটে।
আহতরা হলেন শিক্ষার্থী হুমায়ুন কবির মেরাজ (১৪) নুরনবী (১৫), আব্দুল্লাহ আল নোমান (১৪), রুবেল মিয়া (১৫), মশিয়ার রহমান, সিয়াম, অভিভাবক সদেকুল ও মজমুল।
জানা গেছে, ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর স্থানীয় জনতার সমন্বয়ে প্রধান শিক্ষককে জোরপূর্বক বিদ্যালয় থেকে বের করে দেয়। এরপর থেকে স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম ও পরিবেশ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ও প্রধান শিক্ষককে পুনর্বহালের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছিল বিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
মঙ্গলবার প্রধান শিক্ষক রশিদুল আলম বিদ্যালয়ে পুনরায় যোগ দিতে এলে প্রতিপক্ষ ও বহিরাগতদের সাথে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তা ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে রূপ নেয়। এক পর্যায়ে হামলাকারীরা প্রধান শিক্ষকের ওপর হামলা করে মারপিট করে এবং পড়নের শার্ট ছিড়ে ফেলে। প্রধান শিক্ষককে বাঁচাতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা এগিয়ে এলে তাদের ওপরও হামলা চালায় বহিরাগতরা।
সংবাদ পেয়ে আদিতমারী থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।
সরল খাঁ উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র রুবেল মিয়া বলেন, ‘আমরা ক্লাশ করতে ছিলাম বিদ্যালয়ে। হঠাৎ বহিরাগত কিছু লোক এসে প্রধান শিক্ষক রশিদুল স্যারের ওপর বিনা কারণে হামলা চালায়। হামলায় স্যারসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়।’
‘প্রধান শিক্ষক একজন ভাল শিক্ষক। তিনি বিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকে লেখাপড়ার মান খুবই ভাল হয়েছে। তাছাড়া এখানকার পরিবেশ,খেলা-ধুলাসহ অনেক উন্নয়ন করেছে।’
অভিভাবক সাদিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক রশিদুল আলম নিয়ম তান্ত্রিকভাবে বিদ্যালয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন। কোন ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি করেনি। তার সময়ে সুন্দর ও সুষ্ঠভাবে বিদ্যালয় পরিচালনা করেছেন। আজকের বহিরাগতের হামলায় নিন্দা জানাই।’
অবিলম্বে বিদ্যালয়ের সুন্দর, সুষ্ট পরিবেশ ফিরে আনতে প্রশাসনের দৃষ্টি কামনা করি।
এনএনসিপি নেতা রাসেল বলেন, ‘স্কুল হল সবার সম্পদ। একটি স্কুল আমাদেরকেযত্ন করে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠায়, যাতে আমরা এলাকার একটা সম্পদ হয়ে গড়ে উঠতে পারি। ৫ আগস্টের পর থেকে প্রতিষ্ঠান মোটামুটি ধংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গেছে। এর রক্ষাণাবেক্ষণের দায়িত্ব সবার। যদি বিনা কারণে এই প্রতিষ্ঠানের ধ্বংস হয়, এর ক্ষতি কিন্তু সবার। =এটা দায়িত্ব সমাজের সকল মানুষের।’
‘৫ আগস্টের পর থেকে মব করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে সরাইয়া দেওয়া হয়। সবাই যোগদান করলেও এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান কেন আজ পর্যন্ত যোগদান করতে পারেনি। গত ১৩ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের রায়ে বলেছে, যাদেরকে মব করে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, তাদেরকে আবার নিরিবিচ্ছন্নভাবে কাজ করতে বলা হয়েছে। তাহলে কেন প্রধান শিক্ষককে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। আসলে এখানে একটা ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য কাজ করছে। আমি দেখেছি, প্রধান শিক্ষক গত ২ বছর ধরে ৫ বার বিদ্যালয়ে গমন করলে বার ,বার তাকে মার খেয়ে চলে যেতে হয়। কাজেই আজকে যদি আমরা এই শিক্ষকের মর্যাদা না দেই তাহলে আমরা ধ্বংসের দিকে চলে যাব।’
রশিদুল আলম জানান, বিদ্যালয়ের সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নির্দেশ মোতাবেক নিয়ম বর্হিভুতভাবে স্কুলে গমন করি। হঠাৎ কিছু বহিরাগত এসে আমাকে শার্টের কলার ধরে টেনে বাহিরে নিতে গেলে শিক্ষার্থী বাধা দেয়। একপর্যায়ে আমি পড়ে গেলে তারা আমাকে মারধর করে।
তিনি আরও জানান, আমি একজন বৈধ নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। কেন আমি বিদ্যালয়ে যেতে পারব না। এই বিদ্যালয়ে আমি একজন বৈধ শিক্ষক হিসেবে বারবার গমন করেছি এবং বিভিন্ন সময় হামলা শিকার হয়েছি। এর বিচার কি আমি পাব না। হামলাকারীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হবে।
অবিলম্বে যারা আজকের ঘটনা সৃষ্টি করেছে তাদেরকে প্রশাসনের প্রতি অবিলম্বে শাস্তি কামনা করেন রশিদুল আলম।
আদিতমারী থানার ভাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সজিব সাকিব বলেন, ‘ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিবেশ শান্ত করি। বর্তমানে পরিবেশ শান্ত রয়েছে। এখন পর্যন্ত কোন অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সরল খা উচ্চ বিদ্যালয়ে সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইএনও) গুঞ্জন বিশ্বাস বলেন, ‘বিষয়টি শুনেছি। তবে প্রধান শিক্ষককে বিদ্যালয়ে গমনের কোন অনুমতি দেইনি।’
কেকে/এমএ