ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকার বিরুদ্ধে নিকাব পরিহিত এক ছাত্রীকে হেনস্তার অভিযোগের ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইসলামোফোবিয়াবিরোধী নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের ১৫৮ জন শিক্ষক।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) ‘মূল্যবোধ আন্দোলন’-এর মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মাদ সাদাতের পাঠানো এক বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়।
বিবৃতিতে শিক্ষকরা বলেন, “আমরা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের শিক্ষকবৃন্দ সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিকাব পরিহিত এক নারী শিক্ষার্থীকে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষিকা কর্তৃক প্রকাশ্যে অপমান ও বডি শেমিংয়ের মাধ্যমে হেনস্তা করার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।”
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “অডিও রেকর্ডে একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত পোশাক, ধর্মীয় রীতিনীতি এবং শারীরিক গঠন নিয়ে আপত্তিকর ও অবমাননাকর মন্তব্য পরিলক্ষিত হয়েছে। একজন শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষাঙ্গনে এ ধরনের অসংবেদনশীল ও বৈষম্যমূলক আচরণ কখনোই প্রত্যাশিত হতে পারে না। এটি স্পষ্টতই উগ্র ইসলামোফোবিয়ার নগ্ন প্রকাশ, যা একজন শিক্ষকের নৈতিক দায়িত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
“তবে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দৃশ্যমানভাবে ধর্মপালনকারী দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, সদ্য স্নাতক ও তরুণ পেশাজীবীদের ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশ সরাসরি শিক্ষাগত বা পেশাগত পরিসরে বৈষম্য ও হেনস্তার মুখোমুখি হয়েছেন। ৬৩ দশমিক ৪ শতাংশ ক্ষেত্রে ইসলামোফোবিয়ার ঘটনার জন্য দায়ী হচ্ছেন শিক্ষকরা। পুরুষদের তুলনায় হিজাব-নিকাব বা ধর্মীয় পোশাক পরিহিত নারীরাই ইসলামোফোবিয়ার প্রধান শিকার হচ্ছেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।”
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এমন পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পাশে না দাঁড়িয়ে নৈতিকতাবিবর্জিত কিছু শিক্ষক ও তাঁদের সংগঠন একাডেমিক স্বাধীনতা ও শিক্ষকের অধিকারের দোহাই দিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের সাফাই গাইছেন। শ্রেণিকক্ষে প্রকাশ্য হেনস্তাকে একাডেমিক আলোচনার অজুহাতে আড়াল করা কিংবা সহকর্মীকে সুরক্ষা দেওয়ার এই মানসিকতা অত্যন্ত নিন্দনীয়। একাডেমিক স্বাধীনতার নামে কারও ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণ বা কাউকে প্রকাশ্যে অপমান করা বৈধ হয়ে যায় না।”
বিবৃতিতে শিক্ষকরা দাবি জানান, “এই ঘটনায় জড়িত অভিযুক্ত শিক্ষিকাকে অনতিবিলম্বে শিক্ষাদান কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইসলামী পরিচয় ও পোশাকের কারণে হেনস্তা বন্ধে ‘ইসলামোফোবিয়াবিরোধী নীতিমালা’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।”
বিবৃতি প্রদানকারী শিক্ষকদের মধ্যে ৩৫ জন অধ্যাপক, ২৭ জন সহযোগী অধ্যাপক, ৪৫ জন সহকারী অধ্যাপক এবং ৫১ জন প্রভাষক রয়েছেন।
বিবৃতি প্রদানকারী শিক্ষকদের পূর্ণাঙ্গ নামের তালিকা ‘মূল্যবোধ ডট কম’ (mullobodh.com) ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
বিবৃতিদাতাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মানজুরুল করিম ও অধ্যাপক ড. জুলফিকার হাসান খান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ মাসুদ করিম, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামীমা তাসনীম ও অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ আবুল হাসনাতসহ রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আতিয়ার রহমান।
এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. আরিফ মোর্শেদ খান, মেডিকেল কলেজ ফর ওমেন অ্যান্ড হসপিটালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মিলিভা মোজাফফর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শাফিউল ইসলাম, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আমিরুল ইসলাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শহীদ মুহাম্মদ রেজওয়ান এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুল লতিফ ও মানারাত আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মীর মনজুর মাহমুদসহ অনেকে বিবৃতি দেন।
কেকে/ এমএস