কেউ জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে? মন খারাপ কেন?’ উত্তর দিলেন, ‘জানি না!’ সত্যিই কি জানেন না? নাকি মনের ভেতরে জমে থাকা অনুভূতিগুলোকে চেনার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না? কখনো একা থাকতে ইচ্ছা করে, কখনো সবকিছু অসহ্য লাগে। আবার কখনো কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই মনটা ভার হয়ে থাকে। মনে হয়, কিছু একটা ঠিক নেই—কিন্তু কী ঠিক নেই, তার উত্তর নিজের কাছেও নেই।
নিজের আবেগ বুঝতে ও প্রকাশ করতে না পারার এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত মনোবিজ্ঞানের একটি ধারণা হলো অ্যালেক্সিথাইমিয়া (Alexithymia)। এটি কোনো স্বতন্ত্র মানসিক রোগ নয়; বরং আবেগ শনাক্ত করা, ব্যাখ্যা করা ও প্রকাশের ক্ষেত্রে অসুবিধার একটি বৈশিষ্ট্য।
অনুভূতি আছে, কিন্তু নাম জানা নেই
অ্যালেক্সিথাইমিয়ার বৈশিষ্ট্য যাদের মধ্যে রয়েছে, তারা অনেক সময় বুঝতে পারেন না—তারা দুঃখিত, রাগান্বিত, উদ্বিগ্ন নাকি হতাশ। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে না পারায় কাছের মানুষের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হতে পারে। অন্যরা তাঁদের নির্লিপ্ত ভাবলেও বাস্তবে তাঁরা নিজের আবেগ বুঝতেই হিমশিম খেতে পারেন।
যেভাবে সামনে আসে অ্যালেক্সিথাইমিয়া
অ্যালেক্সিথাইমিয়া নিয়ে মনোবৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ শুরু হয় ১৯৪০-এর দশকের শেষ দিকে। তখন চিকিৎসকেরা লক্ষ করেন, মানসিক আঘাতের অভিজ্ঞতা থাকা কিছু মানুষ নিজেদের আবেগ ভাষায় প্রকাশ করতে পারছেন না। তাদের কল্পনাশক্তির প্রকাশও সীমিত ছিল। একই ধরনের বৈশিষ্ট্য কিছু মনোদৈহিক সমস্যায় ভোগা ব্যক্তির মধ্যেও দেখা যায়।
১৯৫০-এর দশকে মনোচিকিৎসা নিয়ে গবেষণার সময় দেখা যায়, আবেগ সম্পর্কে সচেতনতার অভাব কিছু রোগীর চিকিৎসায় অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পরবর্তী সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য গবেষণায় আবেগ শনাক্ত করার অসুবিধার সঙ্গে বিভিন্ন মানসিক সমস্যার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা বাড়ে।
‘অ্যালেক্সিথাইমিয়া’ শব্দটি পরিচিতি পায় ১৯৭০-এর দশকে। ১৯৭৬ সালে মার্কিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জন কেইস নেমিয়াহ এ বৈশিষ্ট্যের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করেন। এর ফলে অ্যালেক্সিথাইমিয়া নিয়ে পরবর্তী গবেষণার ভিত্তি আরও সুসংহত হয়।
কেন এমন হয়?
শৈশবের অভিজ্ঞতা, আবেগ প্রকাশের সুযোগের অভাব কিংবা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ আবেগ বোঝার দক্ষতাকে প্রভাবিত করতে পারে। বিষণ্নতা, অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার ও পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের সঙ্গেও অ্যালেক্সিথাইমিয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এসব সমস্যার সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেই যে সবার মধ্যে অ্যালেক্সিথাইমিয়া থাকবে, এমন নয়।
গবেষণায় জনসংখ্যার আনুমানিক ১০ শতাংশের মধ্যে এ বৈশিষ্ট্য থাকার কথা বলা হয়েছে।
নিজেকে বুঝবেন কীভাবে?
মন খারাপ হলে নিজেকে প্রশ্ন করুন—কোনো ঘটনায় কি কষ্ট পেয়েছি? কোনো বিষয় নিয়ে কি উদ্বেগ কাজ করছে? নাকি আমি শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত? নিজের অনুভূতি লিখে রাখা এবং বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে কথা বলা আবেগ শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে।
সমস্যাটি দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং দৈনন্দিন জীবন বা সম্পর্কে প্রভাব ফেললে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া ভালো।
নিজের অনুভূতির নাম খুঁজে না পাওয়া মানেই আপনি অনুভূতিহীন নন। কখনো কখনো নিজেকে বোঝার প্রথম পদক্ষেপ হলো নিজের কাছে স্বীকার করা—‘আমি ভালো নেই, কিন্তু কেন ভালো নেই, তা এখনো বুঝতে পারছি না।’
সূত্র: ইবিএসসিও
কেকে/সাশ