শারদীয় দুর্গোৎসবের আমেজে মুখরিত ফরিদপুর জেলা। এ বছর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৭৮১টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মহাষ্টমী উপলক্ষে দেবীর চরণে ১০৮টি পদ্মফুল নিবেদন, পুষ্পাঞ্জলি ও বিশেষ পূজার মধ্য দিয়ে ভক্তরা প্রার্থনা করছেন শান্তি, সমৃদ্ধি ও বিশ্বমানবতার কল্যাণের জন্য। একই সঙ্গে উৎসব নির্বিঘ্ন রাখতে পূজামণ্ডপগুলোতে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা।
বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা, মধুখালী, নগরকান্দা, সদরপুর ও চরভদ্রাসনসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে দেবী দুর্গার আরাধনা। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি ও মন্ত্রোচ্চারণে মুখর হয়ে উঠেছে পূজামণ্ডপগুলো।
মহাষ্টমীর সকালে বিভিন্ন মণ্ডপে ভক্তদের সমাগম বাড়তে থাকে। স্নান সেরে শুচিবস্ত্রে অনেকে ফুল ও বেলপাতা নিয়ে দেবীর চরণে অঞ্জলি দিতে আসেন। পূজার আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও দেশবাসীর সুখ-শান্তি কামনা করেন তারা।
মহাষ্টমীর অন্যতম আকর্ষণ ১০৮টি পদ্মফুল দিয়ে দেবীর আরাধনা। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসে পদ্ম পবিত্রতা ও শুভতার প্রতীক। পদ্ম নিবেদন ও পুষ্পাঞ্জলির মধ্য দিয়ে ভক্তরা দেবী দুর্গার কাছে সুস্বাস্থ্য, সমৃদ্ধি ও সবার মঙ্গল কামনা করেন।
দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপন নিশ্চিত করতে জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা দেখা গেছে। দর্শনার্থীদের নিরাপদ চলাচল এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
পাশাপাশি পূজা উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে নিরাপত্তামূলক উদ্যোগ। মন্দির ও পূজামণ্ডপের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। প্রশাসন ও আয়োজকদের সমন্বিত উদ্যোগে উৎসবের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখার প্রত্যাশা করছেন ভক্তরা।
মহাষ্টমীতে অঞ্জলি দিতে আসা কাকলী রানী বলেন, “মহাষ্টমী আমাদের কাছে ভক্তি, বিশ্বাস ও আত্মশুদ্ধির বিশেষ দিন। দেবীর চরণে অঞ্জলি দিয়ে পরিবারের সুখ-শান্তি, সবার সুস্বাস্থ্য এবং পৃথিবীর মঙ্গল কামনা করি। মা দুর্গা যেন সব অশুভ শক্তি দূর করে মানুষের জীবনে শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করেন—এটাই আমার প্রার্থনা।”
বোয়ালমারীর শ্রীশ্রী রক্ষা চণ্ডী মন্দিরে অঞ্জলি দিতে আসা সৌমেন সেন বলেন, “দেবী দুর্গা শক্তি, সাহস ও ন্যায়ের প্রতীক। দেবীর বিজয় আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেয়। অঞ্জলির মাধ্যমে নিজেদের পাশাপাশি সমাজের সব মানুষের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করি।”
মন্দিরের পুরোহিত সাধন চক্রবর্তী বলেন, “সনাতন ধর্মে মহাষ্টমী অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১০৮টি পদ্মফুল নিবেদন ও পুষ্পাঞ্জলির মাধ্যমে ভক্তরা দেবীর প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রকাশ করেন। পূজার মূল শিক্ষা হলো অশুভের ওপর শুভের জয়, অন্যায়ের ওপর ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং মানবিকতার চর্চা।”
তিনি আরও বলেন, “দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নয়, মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করারও উপলক্ষ।”
ফরিদপুর সদরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় মহাষ্টমী উপলক্ষে অষ্টমী বিহিত পূজা, পুষ্পাঞ্জলি, ভোগ নিবেদন, আরতি ও প্রসাদ বিতরণের আয়োজন করা হয়েছে। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ও প্রবীণদের অংশগ্রহণে পূজামণ্ডপগুলোতে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ।
জেলার ৭৮১টি মণ্ডপ ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
মহাষ্টমীর প্রার্থনায় ভক্তরা দেবী দুর্গার কাছে হিংসা, বিদ্বেষ ও অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সত্য, ন্যায়, শান্তি ও মানবতার প্রতিষ্ঠা কামনা করছেন।
কেকে/সাশ