নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ভুয়া দলিল তৈরি, কাল্পনিক ওয়ারিশ দেখিয়ে জমির নামজারি এবং পৈতৃক সম্পত্তি দখলের অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পের সঙ্গে জমি কেনাবেচার সূত্রে এই জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। এসব অনিয়মের প্রতিবাদে মানববন্ধন, সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন জমির মালিকেরা।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) ‘কায়েতপাড়ার পৈতৃক ভিটা-মাটি সংরক্ষণ পরিষদ’-এর উদ্যোগে কায়েতপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ ও ভূমি অফিসের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। পরে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় ভূমি মালিকদের পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং উপজেলা প্রকৌশলী বরাবর প্রতিবাদলিপি দেওয়া হয়।
ভুয়া দলিল ও নামজারির অভিযোগ
প্রতিবাদলিপি ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন মৌজায় ভুয়া দলিল ও জাল ওয়ারিশ সনদ ব্যবহার করে জমির নামজারি (মিউটেশন) সম্পন্ন এবং জমি দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, এসব ঘটনার কারণে প্রকৃত জমির মালিকেরা আর্থিক ক্ষতি, হয়রানি ও নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জাল দলিলের মাধ্যমে নামজারি সম্পন্ন করে কিছু জমি জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্প ও বসুন্ধরা গ্রুপের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কয়েকটি জমি নিয়ে নির্দিষ্ট অভিযোগ
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ভুক্তভোগীরা কয়েকটি জমির খতিয়ান ও দাগ নম্বর উল্লেখ করে জালিয়াতির অভিযোগ তুলে ধরেন।
তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, নাওড়া এলাকার প্রবীর সরকার-সংশ্লিষ্ট জমির আরএস খতিয়ান ও দাগ নম্বর ৬২ (৬৬), ৬১ (৬) এবং ২৪ (৭৮) নিয়ে অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। এসব জমি জালিয়াতির মাধ্যমে জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের কাছে বিক্রি করা হয়েছে বলে দাবি তাঁদের।
এ ছাড়া মাঝিনা মৌজায় নছর উদ্দিনের ছেলে আয়নাল হকের জমির আরএস খতিয়ান/দাগ নম্বর ৯৫৮ এবং চান মিয়ার ছেলে হাজী সিরাজ ব্যাপারীর জমির আরএস খতিয়ান/দাগ নম্বর ২২ (৪১) ও ১০ নিয়ে অভিযোগ তোলা হয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, এসব জমি বসুন্ধরা প্রকল্পের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।
একইভাবে কেউঢালা এলাকার হাবিবুর রহমানের মেয়ে হাসনা বেগমের ৪ দশমিক ৫০ শতক জমি, যার আরএস খতিয়ান/দাগ নম্বর ২১৩, জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট দলিল ও ভূমি রেকর্ড পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
প্রশাসনের কাছে একাধিক দাবি
‘পৈতৃক ভিটা-মাটি সংরক্ষণ পরিষদ’-এর নেতারা অভিযোগ করেন, জমির নামজারি ও জমাভাগের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই না হওয়ায় জালিয়াতির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তাঁরা প্রতিটি আবেদন কঠোরভাবে যাচাই, প্রকৃত মালিক ও বৈধ ওয়ারিশদের পরিচয় নিশ্চিত এবং মাঠপর্যায়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নামজারি সম্পন্ন করার দাবি জানান।
তাদের অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে—
সন্দেহজনক দলিল ও ওয়ারিশসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে অবৈধ নামজারি বাতিল করা, জাল দলিল তৈরি ও ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা, প্রকৃত জমির মালিকদের জমি অবৈধভাবে দখল ও বিক্রি বন্ধ করা, নামজারি ও জমাভাগের আবেদনে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নোটিশ দিয়ে বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ নিশ্চিত করা, আবাসন প্রকল্পের সীমানা নির্ধারণে স্থানীয় বসতবাড়ি, গ্রাম ও সরকারি রাস্তার বিষয় বিবেচনায় নেওয়া, জমি অধিগ্রহণ বা ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রকৃত মালিকদের ন্যায্য মূল্য ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা।
ভুক্তভোগীদের দাবি, অনুমোদিত আবাসন প্রকল্পের সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে ঘনবসতিপূর্ণ গ্রাম, বসতবাড়ি ও সরকারি রাস্তা থেকে অন্তত ৩০০ মিটার দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে।
ভূমি অফিসে দালালচক্রের অভিযোগ
রূপগঞ্জ উপজেলা ভূমি অফিসে ‘ওমেদার’ পরিচয়ে শতাধিক দালাল সক্রিয় থাকার অভিযোগও করেছেন স্থানীয় সূত্রগুলো। তাঁদের দাবি, এসব ব্যক্তির কেউ কেউ সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নথিতে অনিয়ম, তথ্য পরিবর্তন এবং অর্থের বিনিময়ে নামজারি করিয়ে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত। কিছু ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের জন্য সাংবাদিকদের ব্যবহার করার অভিযোগও উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক রূপগঞ্জ উপজেলা ভূমি অফিস পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, কোনো ভূমি অফিসেই ‘ওমেদার’ নামে দালাল থাকতে পারবেন না। জালিয়াতি ও দুর্নীতি প্রতিরোধে এ ধরনের মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা বন্ধ করা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পৈতৃক সম্পত্তি রক্ষায় আন্দোলন
‘আমাদের মাটি, আমাদের অধিকার—ভিটা-মাটি রক্ষায় গড়ব প্রতিরোধ’ স্লোগানে কায়েতপাড়া ইউনিয়নের ভুক্তভোগী জমির মালিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। এর আগে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ, ১৪ গ্রামের বাসিন্দাদের নিয়ে বৈঠক এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে স্মারকলিপি দেওয়ার মতো কর্মসূচি পালন করেছেন তারা।
আন্দোলনকারীদের দাবি, পৈতৃক সম্পত্তি রক্ষায় প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, ভূমি রেকর্ড যাচাই এবং প্রকৃত মালিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
ভুক্তভোগীরা আশা করছেন, প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপে জমি জালিয়াতি ও অবৈধ দখলের অভিযোগগুলোর সুরাহা হবে এবং স্থানীয় ভূমি মালিকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটবে।
কেকে/সাশ