এক ঘরে দুই বোনের বসবাস। বড় বোন ঝুমা আক্তার (৩৩) শারীরিক প্রতিবন্ধী। ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত তিনি। গত চার মাস ধরে তার পায়ে গুরুতর ক্ষত, ধরেছে পচন। এক মাস ধরে চোখেও দেখতে পাচ্ছেন না। অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করাও কঠিন। আর ছোট বোন খোশনাহার (২৯) স্বামীকে হারিয়ে বড় বোনের সেবাকেই জীবনের একমাত্র দায়িত্ব হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু অভাবের সংসারে এখন দুবেলা খাবার জোগাড় করাই কঠিন, সেখানে চিকিৎসার ব্যয় বহন করা যেন অসম্ভব।
যে ঘরে একসময় দুই বোনের রান্না হতো, সেখানে এখন নিয়মিত চুলা জ্বলে না। কখনো প্রতিবেশীদের বাড়ি থেকে খাবার আসে, কখনো অনিশ্চয়তায় কাটে পুরো দিন। অথচ অসুস্থ ঝুমার ইনসুলিনসহ বিভিন্ন ওষুধ কিনতে প্রতিদিন প্রয়োজন অন্তত ১ হাজার ২০০ টাকা। নিয়মিত আয়ের কোনো উৎস না থাকায় সেই অর্থ জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে খোশনাহারকে।
একদিকে অসুস্থ বোনের সেবা, অন্যদিকে খাবার ও ওষুধের চিন্তা—দুইয়ের টানাপোড়েনে দিশেহারা খোশনাহার। বোনকে একা রেখে কাজে যেতে পারেন না, আবার কাজে না গেলে খাবার ও ওষুধ কেনার টাকাও জোটে না। এমন পরিস্থিতিতে বোনের চিকিৎসা, নিজেদের খাবার ও বেঁচে থাকার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে সহায়তা চেয়েছেন তিনি।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার জাফরাবাদ ইউনিয়নের বাদে শ্রীরামপুর গ্রামের বাসিন্দা এই দুই বোন। তারা মৃত শমসের আলী ও শহর বানু দম্পতির সন্তান। মা-বাবাকে হারানোর পর থেকেই নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তাঁদের জীবন কাটছে। সাত বোন ও এক ভাইয়ের পরিবার হলেও বর্তমানে ভাই-বোনদের কেউই তাদের খোঁজখবর নেন না। ফলে প্রতিবেশীদের সামান্য সহযোগিতায় কোনো রকমে দিন পার করছেন তারা।
বোনের সেবায় উৎসর্গ জীবন
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মা-বাবা বেঁচে থাকতেই স্বামীকে হারান খোশনাহার। এরপর বাবার বাড়িতে ফিরে শারীরিক প্রতিবন্ধী বড় বোনের পাশে দাঁড়ান তিনি। নতুন করে সংসার গড়ার কথা না ভেবে বোনের দেখাশোনাকেই জীবনের দায়িত্ব হিসেবে বেছে নেন। মানুষের বাসায় কাজ করে যা আয় করতেন, তা দিয়েই চলত দুই বোনের খাবার ও চিকিৎসার খরচ।
কিন্তু গত চার মাস ধরে ঝুমার পায়ে গুরুতর ক্ষত দেখা দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে ক্ষত বাড়তে থাকে, কমে যায় চলাফেরার সক্ষমতা। একপর্যায়ে ক্ষতস্থানে পচন ধরে। এর মধ্যে গত এক মাস ধরে চোখে দেখতে না পাওয়ায় তার নির্ভরশীলতা আরও বেড়েছে। ফলে বোনকে একা রেখে বাইরে কাজ করতে যাওয়ার সুযোগও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে খোশনাহারের।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একটি হুইলচেয়ারে বসে আছেন ঝুমা আক্তার। পাশে বসে ছোট বোন খোশনাহার তার চুল আঁচড়ে দিচ্ছেন। গোসল করানো থেকে শুরু করে খাওয়ানো—সবই করছেন নিজ হাতে। বোনের দেখাশোনার ফাঁকে খাবার ও চিকিৎসার খরচ জোগাড়ের চিন্তায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন তিনি। সংসারে নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা নেই, নেই চিকিৎসার ব্যয় বহনের সামর্থ্য। প্রতিবেশীদের সহযোগিতাই এখন তাঁদের একমাত্র ভরসা।
চার মাস ধরে পায়ে ক্ষত, এক মাস ধরে চোখে দেখেন না
কান্নাজড়িত কণ্ঠে খোশনাহার বলেন, “আমার বোনের যখন ১২ বছর বয়স, তখন থেকেই সে শারীরিক প্রতিবন্ধী। আমাদের মা-বাবা ১২ বছর আগে মারা গেছেন। আমরা সাত বোন ও এক ভাই। কিন্তু এখন ভাই-বোনদের কেউই আমাদের খোঁজখবর রাখেন না। এত দিন মানুষের বাসায় কাজ করে বোনের চিকিৎসা চালিয়ে গেছি।”
তিনি বলেন, “একদিন কাজ থেকে এসে দেখি, আমার বোনের পায়ে কী যেন ঢুকেছে। এরপর প্রায় চার মাস ধরে পায়ে ইনফেকশন হয়েছে। এখন পায়ের অবস্থা খুব খারাপ, পচন ধরেছে। মানুষের কাছে হাত পেতে যা পাই, তা দিয়েই চিকিৎসা চালানোর চেষ্টা করছি। এর মধ্যে গত এক মাস ধরে বোন চোখেও দেখতে পাচ্ছে না।”
খোশনাহার আরও বলেন, “আগে মানুষের বাসায় কাজ করে যা আয় করতাম, তা দিয়ে বোনের চিকিৎসা ও সংসার চালানোর চেষ্টা করেছি। এখন আর কাজেও যেতে পারি না। বোনকে একা রেখে কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের ঘরে চুলা জ্বলে না। মানুষের বাড়ি থেকে যেভাবে খাবার জোগাড় করতে পারি, তা দিয়েই দিন কাটে। খাবার পেলে খাই, না পেলে না খেয়েই থাকতে হয়।”
চিকিৎসার ব্যয় সম্পর্কে তিনি বলেন, “ইনসুলিনসহ বিভিন্ন ওষুধ কিনতে প্রতিদিন কমপক্ষে ১ হাজার ২০০ টাকা লাগে। এর বাইরে খাবার ও অন্যান্য খরচ রয়েছে। এত টাকা আমি কোথায় পাব? বোনকে নিয়ে খুব কষ্টে আছি। আমাদের চিকিৎসা, খাবার ও বেঁচে থাকার জন্য যদি কোনো স্থায়ী সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে একটু স্বস্তিতে জীবন কাটাতে পারব।”
প্রতিবেশীদেরও সীমিত সামর্থ্য
প্রতিবেশী মোহাম্মদ জালাল মিয়া বলেন, “আমার জন্মের পর থেকেই আমাদের প্রতিবেশী শারীরিক প্রতিবন্ধী ঝুমা আক্তারকে দেখে আসছি। তাঁর মা-বাবা কেউই বেঁচে নেই। ঝুমার ছোট বোন খোশনাহারের স্বামী মা-বাবা বেঁচে থাকতেই মারা যান। এরপর বোনের অসহায় অবস্থার কথা চিন্তা করে তিনি আর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। সেই থেকে বোনকে নিয়েই তাঁর জীবন কাটছে। বর্তমানে তাঁরা অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা গ্রামবাসী ও প্রতিবেশীরা চাই, এই পরিবারটি যেন একটু ভালোভাবে বাঁচার সুযোগ পায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমাদের আকুল আবেদন, তিনি যেন এই অসহায় পরিবারের প্রতি সুদৃষ্টি দেন এবং তাঁদের সার্বিক সহযোগিতার ব্যবস্থা করেন। পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদেরও তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানাচ্ছি।”
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহীন বলেন, ঝুমার পায়ে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। নিয়মিত ড্রেসিং ও হাসপাতালে নেওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না। ডায়াবেটিসের পাশাপাশি চোখে দেখতে না পাওয়ায় তাঁর দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। ছোট বোন খোশনাহারই তার দেখাশোনা করেন। কিন্তু তাকে একা রেখে বাইরে যাওয়া কিংবা সঙ্গে নিয়ে চিকিৎসার জন্য ছোটাছুটি করা—কোনোটিই সহজ নয়।
শাহীন বলেন, “বর্তমানে প্রতিবেশীদের সামান্য সাহায্য-সহযোগিতায় কোনো রকমে তাদের দিন চলছে। কিন্তু এই সহায়তা তাদের প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। আমরা চাই, এই অসহায় দুই বোনের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের চিকিৎসা ও জীবনযাপনের জন্য সরকারি সহায়তার পাশাপাশি স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা করা হোক। তারা যেন মানুষের সাময়িক অনুদানের ওপর নির্ভর না করে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ পান।”
স্থানীয় বাসিন্দা দ্বীন ইসলামও দুই বোনের দুরবস্থার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “এই পরিবারটি অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। প্রতিবন্ধী মেয়েটির পায়ে গুরুতর ঘা হয়েছে। তিনি শারীরিকভাবেও অক্ষম এবং নানা জটিলতায় ভুগছেন। তাঁর ছোট বোনও অসহায় অবস্থায় রয়েছেন। এলাকার প্রতিবেশীরা যখন যেভাবে পারেন, খাবার দিয়ে সহযোগিতা করেন। কখনো কখনো খাবারের অভাবেও তাঁদের দিন কাটে।”
দ্বীন ইসলাম বলেন, “আমরা নিজেরাও দিন আনি, দিন খাই। আমাদের সামর্থ্যও সীমিত। তারপরও তাদের খোঁজখবর রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু এভাবে আর কত দিন চলবে? তাদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হলে হয়তো এই চরম দুর্ভোগ থেকে কিছুটা মুক্তি পাবেন।”
সহযোগিতার আশ্বাস জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের
এ বিষয়ে করিমগঞ্জ উপজেলার জাফরাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাদাৎ মো. সায়েম বলেন, “আপনার মাধ্যমেই প্রথম বিষয়টি জানতে পেরেছি। ঝুমা আক্তারের জন্য সরকারি খাদ্যসহায়তা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও অনুদানের ব্যবস্থা করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও তাদের পাশে দাঁড়াব। বিষয়টি যেহেতু জেনেছি, তাই নিজেই উদ্যোগ নিয়ে পরিবারটির খোঁজখবর নেব এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ব্যবস্থা করব।”
এ বিষয়ে করিমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে মুসলিমার সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, “বিষয়গুলো শুনে আমার খুব কষ্ট লাগছে। অসহায় মানুষের জন্য সরকারিভাবে যে বরাদ্দ আসে, তা যেন প্রকৃত উপকারভোগীরা পান, সে বিষয়ে আমি সবসময় চেষ্টা করি। এই দুই বোনের বিষয়টি আগে জানতাম না, আপনার মাধ্যমেই অবগত হয়েছি। তাদের জন্য যতটুকু সম্ভব, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।”
কেকে/সাশ