ইসরায়েল সামরিক বাহিনী, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন সংকটের মুখে পড়েছে, যা থেকে উত্তরণ কঠিন হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ইতজাক ব্রিক। তার মতে, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও মিত্র হারিয়ে ইসরায়েল ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিন এভাবে টিকে থাকা দেশটির পক্ষে কঠিন হবে।
রোববার (১ নভেম্বর) ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম মারিভে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে এসব কথা বলেন সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে নিছক রাজনৈতিক সংকট নয়, বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক অবক্ষয় হিসেবে বর্ণনা করেন।
গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনের ফলাফলকে ‘আমরা যে ইসরায়েলকে চিনতাম, তার আনুষ্ঠানিক মৃত্যুসনদ’ বলে উল্লেখ করেন ব্রিক। তার অভিযোগ, দেশটির টেলিভিশন বিশ্লেষকেরা আসনসংখ্যা ও সরকার গঠনের সমীকরণ নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও রাষ্ট্রের গভীর সংকটগুলো উপেক্ষা করছেন। তাঁদের এই পরিস্থিতিকে তিনি ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে টাইটানিক জাহাজে অর্কেস্ট্রা বাজানোর সঙ্গে তুলনা করেন।
ব্রিক ইসরায়েলের সামরিক কলেজগুলোর সাবেক কমান্ডার ছিলেন। এ ছাড়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে সেনাসদস্যদের অভিযোগবিষয়ক ন্যায়পাল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
নিজের নিবন্ধে তিনি বলেন, ইসরায়েল আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়েছে। দেশটি আন্তর্জাতিক বৈধতা ও মিত্র হারিয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, দীর্ঘস্থায়ী বিচ্ছিন্নতা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা ইসরায়েলের নেই।
সামরিক পরিস্থিতি তুলে ধরে ব্রিক বলেন, ইসরায়েলের স্থলবাহিনী কাঠামোগত দুর্বলতা ও মনোবল সংকটে ভুগছে। দেশের অভ্যন্তরীণ ও সীমান্তের বাইরের একাধিক হুমকি একসঙ্গে মোকাবিলার সক্ষমতাও বাহিনীটির কমে গেছে। ক্লান্ত ও দুর্বল সেনাবাহিনীর পক্ষে বড় ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকানো কিংবা আঞ্চলিক যুদ্ধের সময় বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া কঠিন হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
অর্থনৈতিক সংকটের প্রসঙ্গে ব্রিক জানান, দীর্ঘদিনের যুদ্ধের কারণে ইসরায়েলের জাতীয় ঋণ বেড়ে ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন শেকেলে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ৪৪৫ বিলিয়ন ডলারের সমান। তার দাবি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, অস্ত্র সরবরাহে বিধিনিষেধ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বিচ্ছিন্নতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ইউরোপের সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রস্তাবকেও সমালোচনা করেন তিনি। ব্রিকের ভাষায়, এ ধরনের চিন্তা সরল ও অযৌক্তিক। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে ইসরায়েলিদের সঞ্চিত অর্থও ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন সাবেক এই জেনারেল। তাঁর মতে, ইসরায়েলি সমাজে রাজনৈতিক মেরুকরণের চেয়েও গভীর এক নীরব গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও দক্ষ পেশাজীবীদের দেশত্যাগের কারণে কয়েক দশকে গড়ে ওঠা দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা হারাচ্ছে ইসরায়েল।
এ ছাড়া রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আইনের শাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত্তি দুর্বল করার অভিযোগ তোলেন ব্রিক। তাঁর দাবি, যোগ্যতা ও সততার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্য এবং পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়াকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে ১২০ আসনের ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে নেতানিয়াহুর জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন ইয়াশার পার্টির বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। আরব দলগুলো পেয়েছে ১৯টি আসন।
সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন কোনো প্রধান জোটই নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে নির্বাচনের পরও দেশটিতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
সূত্র: আনাদোলু
কেকে/সাশ