বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬,
২০ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● গার্মেন্টস শ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণ হবে ডিসেম্বরের মধ্যে      ● শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে ৪ ঘণ্টা এগিয়ে শুরু মজুরি বোর্ডের সভা      ● গাজীপুরে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, বাসন থানার সামনে সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ      ● মিরপুরের বেড়িবাঁধ এলাকায় বাস-লেগুনার মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ৪      ● বড়দিন উদযাপনে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী      ● দ্বিতীয় পদ্মা ও যমুনা সেতু নির্মাণে গতি আনার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর      ● হাম উপসর্গে আরও ৬ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৮২      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
নদী দখল ও দূষণ
নদী বাঁচলে বাঁচবে দেশ
মিনহাজ উদ্দীন আত্তার
প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ২:২৭ পিএম আপডেট: ০৪.১১.২০২৬ ২:২৯ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকালে মনে হয়, সবুজের বুক চিরে নীল রঙের অসংখ্য শিরা-উপশিরা ছড়িয়ে আছে। এই নদীগুলোই আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস, সভ্যতা, কৃষি, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির নীরব সাক্ষী। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, কর্ণফুলী কিংবা তিস্তা—প্রতিটি নদী কেবল জলধারা নয়; এটি একটি জনপদের জীবন, একটি অঞ্চলের অর্থনীতি এবং একটি জাতির অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ বলা কেবল একটি ভৌগোলিক পরিচয় নয়; এটি আমাদের জাতীয় পরিচয়েরও অন্যতম মূল ভিত্তি।

কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, যেসব নদী একসময় এই ভূখণ্ডে সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল, আজ সেগুলোর বহু নদীই মানুষের লোভ, অবহেলা ও চরম দায়িত্বহীনতার শিকার। কোথাও শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বিষাক্ত বর্জ্যে নদীর পানি কুচকুচে কালো হয়ে যাচ্ছে, কোথাও অবৈধ দখলের গ্রাসে নদীর বুক সংকুচিত হচ্ছে, আবার কোথাও অনিয়ন্ত্রিত বালু ভরাট করে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ চিরতরে থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নদীর ওপর এই নীরব আগ্রাসন কেবল একটি প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি নয়; এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেওয়ার শামিল।

পরিবেশবিদরা দীর্ঘদিন ধরে বলছেন, নদীকে বাঁচানো মানে কেবল পানি সংরক্ষণ নয়; বরং জীববৈচিত্র্য, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, জনস্বাস্থ্য এবং জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষা করা। আধুনিক পরিবেশ আইনে নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ বা ‘আইনি ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার চর্চা শুরু হয়েছে।

তবে ইসলাম চৌদ্দশ বছর আগেই মানুষকে শিখিয়েছে যে, প্রকৃতি মানুষের একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়; এটি মহান আল্লাহর অর্পিত এক পবিত্র ‘আমানত’। মানুষ প্রাকৃতিক সম্পদের মালিক নয়, বরং এর দায়িত্বশীল রক্ষণাবেক্ষণকারী।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহতাআলা পানির মৌলিক গুরুত্ব তুলে ধরে ইরশাদ করেছেন, ‘আর আমরা পানি থেকেই সব জীবন্ত বস্তুর সৃষ্টি করেছি।’ (সূরা আল-আম্বিয়া : ৩০)। এই একটি বাক্যই প্রকৃতির আধার হিসেবে পানির মর্যাদা নির্ধারণ করে দেয়। পানি ছাড়া যেমন জীবনের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না, তেমনি প্রবহমান নদী ছাড়া বাংলাদেশের জীবনপ্রবাহও অসম্পূর্ণ। তাই নদীকে দূষিত করা মানে কেবল একটি জলধারাকে নষ্ট করা নয়; বরং জনজীবনের মূল ভিত্তিকে ধ্বংস করা।

কুরআনে মানবসৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয় সম্পর্কে সতর্ক করে আরও বলা হয়েছে, ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণেই স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে।’ (সূরা আর-রূম : ৪১)। আজকের নদী দখল, রাসায়নিক বর্জ্য ফেলা, প্লাস্টিক দূষণ এবং নদী ভরাট—এসবই মানুষের হাতের সেই ‘ফাসাদ’ বা অন্যায়ের ফসল। নদীর মৃত্যু মানে হাজারো জলজ প্রাণীর মৃত্যু, কৃষির অপূরণীয় ক্ষতি, সুপেয় পানির তীব্র সংকট, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং অকাল বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি।

বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিলেন। তিনি এমন সব আচরণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন, যা পরিবেশ দূষিত করে বা মানুষের কষ্ট বাড়ায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা অভিশাপ কুড়ানোর দুটি কাজ থেকে বেঁচে থাকো—মানুষের চলাচলের পথে এবং তাদের ছায়াদার স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করা।’ (সহিহ মুসলিম : ২৬৯)। ইসলামি আইনজ্ঞ ও ফকিহগণ এই হাদিস থেকে সর্বজনীন নীতি গ্রহণ করেছেন যে, মানুষের ব্যবহৃত নদী, খাল কিংবা যে কোনো জলাশয় ইচ্ছাকৃতভাবে বিষাক্ত বা দূষিত করা শরিয়তের দৃষ্টিতে চরম অন্যায় এবং লানত পাওয়ার যোগ্য অপরাধ।

ইসলামের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দর্শনে ‘হিমা’ (সংরক্ষিত এলাকা) এবং ‘হারীম’ (নদীর সুরক্ষিত সীমানা) ধারণা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো প্রাকৃতিক সম্পদকে ব্যক্তিগত স্বার্থের বাইরে রেখে সার্বজনীন কল্যাণে টিকিয়ে রাখা। মহানবী (সা.) স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, ‘মানুষ তিনটি বিষয়ে সমান অংশীদার—পানি, চারণভূমি এবং শক্তি।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৪৭২)। এই নির্দেশ প্রমাণ করে, নদী কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একচ্ছত্র ভোগের বস্তু হতে পারে না। এটি রাষ্ট্রীয় ও জনস্বার্থের সম্পত্তি। ফলে নদী দখল কিংবা এর নাব্যতা নষ্ট করা সরাসরি আমানতের খিয়ানত।

খুলাফায়ে রাশেদিনের যুগে নদী ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করাকে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব মনে করা হতো। বিশেষ করে দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) কৃষি ও বাণিজ্যের প্রসারে সেচব্যবস্থা সুগম করা ও নতুন খাল খননের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। তার শাসন দর্শনে নদী কেবল প্রাকৃতিক বিষয় ছিল না, ছিল নাগরিকের জীবন ও অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।

আজ বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং পানির সংকট প্রকট হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে নদী রক্ষার বিষয়টি কেবল পরিবেশ আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; এটি এখন খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য প্রশ্ন।

নদীকে বাঁচাতে হলে কেবল সরকারি তদারকি ও আইনি প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সর্বস্তরের মানুষের নৈতিক জাগরণ। জুমার খুতবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাঠ্যপুস্তক, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে এই সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হবে যে, নদী দূষিত করা কেবল আইনগত অপরাধ নয়; এটি সৃষ্টিকর্তার নিয়ামতের প্রতি চরম অকৃতজ্ঞতা।

আমরা যদি সত্যিই একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, তবে নদীকে জাতীয় অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে। নদীর প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া মানে আমাদের নিজেদের ভবিষ্যতের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া। কারণ নদী শুকিয়ে গেলে শুধু পানি হারায় না, হারিয়ে যায় গোটা জনপদের প্রাণস্পন্দন। তাই আজ সময়ের সবচেয়ে জরুরি আহ্বান—নদী বাঁচলে বাঁচবে দেশ, নদী বাঁচলে বাঁচবে আমাদের ভবিষ্যৎ।

লেখক : কৃষি উদ্যোক্তা


কেকে/সাশ 



মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close