বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের আলোচনায় আমরা সাধারণত কৃষি, পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয় ও প্রচলিত শিল্পায়নকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি; অথচ আমাদের সামনে রয়েছে এমন এক বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, যার পূর্ণ ব্যবহার এখনো শুরুই হয়নি, আর সেটি হলো সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি।
বাংলাদেশের বিস্তৃত সমুদ্রসীমা, উপকূলীয় অঞ্চল, নদী মোহনা, সামুদ্রিক সম্পদ, বন্দর, জাহাজ চলাচল এবং জোয়ার-ভাটার শক্তি আমাদের অর্থনীতির জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। এ সম্পদগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে একটি সমন্বিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে। আমার বিশেষ আগ্রহের একটি ক্ষেত্র হলো স্যান্ডউইপ চ্যানেলের জোয়ার-ভাটার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জোয়ার-ভাটার পরিবর্তন অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ; বিশেষ করে স্যান্ডউইপ চ্যানেল ও আশপাশের অঞ্চলে জোয়ার-ভাটার উচ্চতার পার্থক্য এবং পানির প্রবাহ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে গবেষণার সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণা ও উপকূলীয় তথ্য-উপাত্তে স্যান্ডউইপ চ্যানেলে উল্লেখযোগ্য tidal range এবং শক্তিশালী পানিপ্রবাহের কথা উঠে এসেছে, তবে জোয়ার-ভাটার উচ্চতার পার্থক্য থাকলেই সেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না; এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিমাপ, সমুদ্রতল জরিপ, পানির গতিবেগ, পলি প্রবাহ, পরিবেশগত প্রভাব এবং কৌশলগত বিশ্লেষণ।
প্রাথমিকভাবে ১,০০০ মেগাওয়াট বা ১ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাকে একটি অনুসন্ধানযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, যা এখনো প্রমাণিত উৎপাদনক্ষমতা নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ফলাফলই নির্ধারণ করবে প্রকৃত উৎপাদনক্ষমতা, প্রযুক্তি ব্যয় এবং প্রকল্পের অর্থনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো প্রকল্প যদি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ capacity factor অর্জন করতে পারে, তাহলে ১,০০০ মেগাওয়াট স্থাপিত ক্ষমতা থেকে বছরে আনুমানিক ২.৬৩ থেকে ৩.৫০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের গাণিতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়, যা একটি পরিস্থিতিভিত্তিক হিসাব, কোনো নিশ্চিত উৎপাদন পূর্বাভাস নয়।
এ প্রকল্পের গুরুত্ব শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পর্যাপ্ত, নির্ভরযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের বিদ্যুৎ পাওয়া গেলে স্যান্ডউইপ ও আশপাশের উপকূলীয় অঞ্চলে ইস্পাত ও ধাতু শিল্প, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত, সার ও রাসায়নিক শিল্প, বিদ্যুৎনির্ভর উৎপাদনশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কোল্ড চেইন এবং বন্দর, গুদাম ও সামুদ্রিক লজিস্টিকসের মতো ভারী ও রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে, তবে এসব শিল্প স্থাপনের আগে জমি, নৌ-চলাচল, বন্দর সুবিধা, পানি, পরিবেশ, জনবসতি, দুর্যোগ ঝুঁকি এবং জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযোগের বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।
শুরুতেই শুধু বৈদেশিক অর্থায়ন খোঁজার চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করা; তাই বাংলাদেশ সরকার একটি স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক মানের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার উদ্যোগ নিতে পারে, যেখানে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও সামুদ্রিক প্রকৌশলীদের আমন্ত্রণ জানানো হবে এবং জরিপ ও সমীক্ষার কাজ হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য।
সরকার চাইলে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই জাতীয় tidal energy assessment programme শুরু করতে পারে, যার আওতায় স্যান্ডউইপ চ্যানেল ও আশপাশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাথমিক hydrographic ও bathymetric survey শুরু করা, জোয়ার-ভাটার উচ্চতা, পানির গতিবেগ, মৌসুমি পরিবর্তন, পলি প্রবাহ ও সমুদ্রতলের তথ্য সংগ্রহ করা,tidal barrage, tidal lagoon এবং tidal-stream turbine প্রযুক্তির উপযোগিতা তুলনামূলকভাবে যাচাই করা, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে একটি স্বাধীনtechnical advisory group গঠন করা এবং পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, নৌ-চলাচল, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও দুর্যোগ ঝুঁকি নিয়ে প্রাথমিক মূল্যায়ন সম্পন্ন করা যেতে পারে।
স্যান্ডউইপ চ্যানেলের জোয়ার-ভাটার শক্তি সেই সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যা সঠিক গবেষণা, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, স্বচ্ছ বিনিয়োগ কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও উপকূলীয় শিল্পায়নের নতুন অধ্যায় শুরু করতে পারে; তাই ব্লু ইকোনমি বাংলাদেশের জন্য কোনো দূরবর্তী স্বপ্ন নয়—প্রয়োজন সঠিক তথ্য, সঠিক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সময়োপযোগী জাতীয় সিদ্ধান্ত।
লেখক : মেরিন ইঞ্জিনিয়ার
কেকে/সাশ