রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে দীর্ঘদিনের চড়া দামের অস্বস্তি। বাজারে ভরপুর আমদানির সুবাদে শীতের টাটকা সবজির সরবরাহ বাড়ায় স্বস্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে ক্রেতার থলেতে। দীর্ঘ সময় ধরে চড়া থাকা সবজির দাম এখন অনেকটাই নাগালের মধ্যে চলে আসায় স্বস্তি ফিরেছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের রান্নাঘরে।
অন্যদিকে সবজির দামে কিছুটা স্বস্তি মিললেও মাছ ও মাংসের লাগামছাড়া দামে ম্লান হয়ে গেছে সাধারণ ক্রেতার হাসি। রুই-কাতলা থেকে শুরু করে ব্রয়লার ও গরুর মাংসের চড়া মূল্য সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে, ফলে কাঁচাবাজারে গিয়েও স্বস্তির বদলে স্বস্তি-অস্বস্তির মিশ্র অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, মুলা, টমেটো ও বরবটির মতো শীতকালীন সবজির পর্যাপ্ত উপস্থিতিতে বাজারগুলো সরগরম, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক খুচরা মূল্যে।
বিক্রেতারা বলছেন, মৌসুমের শুরুর তুলনায় সরবরাহ আরও বাড়লে সবজির দাম আরও কিছুটা কমতে পারে, যা সাধারণ মানুষের বড় ধরনের স্বস্তি এনে দেবে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মৌসুমের শুরুতে শীতের সবজির সরবরাহ কিছুটা কম থাকলেও এখন তা পুরোদমে বাজারে আসতে শুরু করেছে। এর ফলে অন্যান্য সবজির তুলনায় তুলনামূলক কম দামে ক্রেতারা এসব সবজি কিনতে পারছেন। বাজারে আসা নতুন আলুর দামও ধীরে ধীরে সহনশীল পর্যায়ে নামতে শুরু করেছে।
সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, গত কয়েক মাস ধরে শাক-সবজিসহ প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের চড়া দামে তাদের পকেট প্রায় খালি হয়ে যাচ্ছিল। তবে শীতের এই আগাম সবজি বাজারে আসায় কিছুটা হলেও রক্ষা হয়েছে। যদি সরবরাহ এই ধারা বজায় থাকে এবং বাজার মনিটরিং কঠোর করা হয়, তবে শীতের পুরো মৌসুমে নিত্যপণ্যের বাজার আরও বেশি স্বস্তিদায়ক হবে বলে আশা করছেন তারা।
অন্যদিকে বাজারে এক পণ্যের দাম কমছে, আবার আরেক পণ্যের বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, সবজির দামে স্বস্তি ফিরলেও অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়েছে। ডিম ও আলুর দাম বেড়েছে। সবজির মধ্যে পেঁয়াজ ও কাঁচা মরিচের দাম বাড়তি। নিত্যপণ্যের বাজারে এমন বিপরীতমুখী প্রবণতার মধ্যে কমেছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির ধরন: জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের গড় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ১৩ শতাংশে নেমেছে। আগের প্রান্তিকে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ। সবজির দাম কমার পাশাপাশি চাল ও গমের দাম কমে যাওয়ায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেছে। তবে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও ডালের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের মূল্য বাড়তির দিকে আছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের অবদান ৫১ শতাংশের বেশি।
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে হয়েছে গড়ে ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। আগের প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) এই হার ছিল ৯ দশমিক ২১ শতাংশ।
বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “গত কয়েক মাস ধরে বাজারের যে অবস্থা ছিল, তাতে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। কাঁচাবাজারের ব্যাগের দিকে তাকালেই দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হতো। আজ (গতকাল) বাজারে এসে কিছুটা ভালো লাগল। শীতের কপি ও শিমসহ কিছু সবজির দাম বেশ কমেছে। আল্লাহ দিলে এই ধারাটা যেন পুরো শীতকাল বজায় থাকে।”
আরেক গৃহিণী নাসরিন আক্তার বলেন, “সবজির দাম একটু কমায় আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের জন্য খুব উপকার হয়েছে। তবে আলু, পেঁয়াজ আর ডিমের দাম এখনও চড়া। সরকার যদি এই জিনিসগুলোর দিকেও একটু নজর দেয়, তাহলে সাধারণ মানুষ পুরোপুরি স্বস্তি পাবে।”
কারওয়ান বাজারের পাইকারি সবজি বিক্রেতা মো. আল-আমিন বলেন, “এখন পুরোদমে শীতের সবজি বাজারে আসতে শুরু করেছে। উত্তরবঙ্গ ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রচুর সবজি আসছে। সরবরাহ বাড়ার কারণে পাইকারিতেই দাম অনেক কমে গেছে। আমরা কম দামে কিনতে পারছি, তাই কম দামেই বিক্রি করতে পারছি। সামনে শীত বাড়লে দাম আরও কিছুটা কমতে পারে।”
খুচরা বিক্রেতা রহিম মিয়া বলেন, “ক্রেতারা বাজারে এসে স্বস্তি পাচ্ছেন। আগে যেখানে একজন ক্রেতা এক কেজি বা আধ কেজি সবজি কিনতেন, এখন দাম কম থাকায় তারা একটু বেশি করেই সবজি কিনছেন। এতে আমাদের বিক্রিও ভালো হচ্ছে।”
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মৌসুমের শুরুতে শীতের সবজির সরবরাহ কিছুটা কম থাকলেও এখন তা পুরোদমে বাজারে আসায় দাম বেশ নিম্নমুখী। তবে সবজির বাজারে কিছুটা স্বস্তি মিললেও মাছ, মাংস, ডিম ও পেঁয়াজের বাজারে এখনও বাড়তি দামের ঝাঁজ রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, শীতকালীন সবজির এই সরবরাহ আরও বাড়লে এবং বাজার মনিটরিং কঠোর করা হলে সার্বিক নিত্যপণ্যের বাজার সাধারণ মানুষের আরও নাগালে চলে আসবে।
সব ধরনের চালের দাম কিছুটা বেড়েছে
সবজির দাম কমলেও সাধারণ মানুষের প্রধান খাদ্য চালের বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে সরু, মাঝারি ও মোটা—সব ধরনের চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে।
বর্তমানে মানভেদে সরু চাল নাজিরশাইল ও মিনিকেট প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে এসব চালের দাম ছিল ৬৮ থেকে ৮৫ টাকা। মাঝারি মানের পাইজাম, ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ চালের দাম কেজিতে ৩ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ থেকে ৬৫ টাকায়। নিম্ন আয়ের মানুষের বেশি কেনা মোটা চাল চায়না ইরি, গুটি ও স্বর্ণার দামও কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়ে হয়েছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা।
অন্যদিকে, খোলা পোলাও চাল মানভেদে প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্যাকেটজাত চিনিগুঁড়া ও কালিজিরা চালের দাম কেজিপ্রতি ২২০ থেকে ২৩০ টাকা। প্যাকেটজাত চালের দাম বেশি হওয়ায় অনেক ক্রেতা খোলা চাল কিনছেন।
নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে তেল বিক্রি
বোতলজাত সয়াবিন তেল ও চিনির সরবরাহ-সংকট এখনো কাটেনি। তেল কিনতে ক্রেতাদের একাধিক দোকান ঘুরতে হচ্ছে। সরকার গত ২ সেপ্টেম্বর বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করে। বোতলের গায়েও সেই দাম লেখা রয়েছে। তবে খুচরা বাজারে প্রতি লিটার তেল বিক্রি হচ্ছে ২১০ টাকায়। অর্থাৎ নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬ টাকা বেশি।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ও আমদানি ব্যয় বাড়ায় পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো আরও এক দফা দাম বাড়ানোর দাবি করছে। এর মধ্যেই বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। ফলে শীতের সবজির দাম কমায় কিছুটা স্বস্তি মিললেও চাল ও ভোজ্যতেলের বাড়তি দামে নিত্যপণ্যের বাজারে চাপ রয়েই গেছে।
কেকে/সাশ