গাছ আছে প্রায় সাড়ে আট লাখ, কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশের। বাকি ৭৫ শতাংশ গাছই অনুৎপাদনশীল। অথচ এসব গাছের রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা এবং বোনাস বাবদ নিয়মিত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। ফলে বছরের পর বছর লোকসানের বোঝা বাড়ছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএফআইডিসি) রাবার বিভাগ সিলেট জোনের। চারটি রাবার বাগান মিলিয়ে বছরে গড়ে প্রায় ১০ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
বিএফআইডিসি রাবার বিভাগ সিলেট জোনের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশনের অধীনে সারাদেশে মোট তিনটি জোন রয়েছে। এ তিনটি জোনে রয়েছে ১৮টি সরকারি মালিকানাধীন রাবার বাগান। এর মধ্যে সিলেট জোনের অধীনে রয়েছে চারটি বাগান। সিলেট জোনের চারটি সরকারি রাবার বাগানের সর্বমোট আয়তন হলো ৮ হাজার ৯৪০ একর। এরমধ্যে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা রাবার বাগানের আয়তন ২ হাজার ৮৯৯ একর, একই জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাতগাঁও রাবার বাগানের আয়তন ১ হাজার ৯৭৪ একর, হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার শাহজীবাজার রাবার বাগানের আয়তন ২ হাজার ১০৪ একর এবং একই জেলার বাহুবল উপজেলার রূপাইছড়া রাবার বাগানের আয়তন ১ হাজার ৯৬৩ একর। এ চারটি বাগানে রয়েছে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ রাবার গাছ। সাধারণত রাবার গাছ রোপণের ৭ বছর পর থেকে গাছগুলো কষ (ল্যাটেক্স) দেওয়া শুরু করে এবং ৩২ বছর পর্যন্ত উৎপাদন সক্ষমতা অনেকটা ভালো থাকে। তারপর ধীরে ধীরে উৎপাদন সক্ষমতা হারিয়ে অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়ে গাছগুলো।
বশিউক সিলেট জোনের চারটি বাগানের প্রায় সাড়ে ৮ লাখ রাবার গাছের মধ্যে অর্ধশতাব্দি বা ৫০ বছর পেরিয়েছে অন্যূন ৬০ শতাংশ গাছ। বশিউক সিলেট জোনের চারটি রাবার বাগানে বর্তমানে ৬০০ স্থায়ী ও ১৫০ জন অস্থায়ী টেপার (শ্রমিক) পদে কর্মরত রয়েছেন। বাগানগুলোর অধিকাংশ গাছ অনুৎপাদনশীল হলেও ওই ৭৫০ জন টেপারের বেতন-ভাতা-বোনাস প্রদানে প্রতি বছর সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ক্রমাগত লোকসানে থাকা এ বাগানগুলোর লোকসানের পরিমাণ বছরে গড়ে প্রায় ১০ কোটি টাকার মতো।
জানা গেছে- লোকসানের এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পুরোনো গাছ অপসারণ করে নতুন করে বাগান সৃজনের উদ্যোগ নিয়েছে বিএফআইডিসি। এরই মধ্যে মালয়েশিয়ান ও শ্রীলঙ্কান উচ্চফলনশীল ক্লোন জাতের রাবার চারা রোপণ করা হচ্ছে। ২০২০ সালে ৬০০ একর জমিতে পুরোনো গাছ কেটে নতুন বাগান করা হয়। এসব গাছের বয়স এখন ছয় বছর। আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে প্রায় দেড় লাখ গাছ উৎপাদনে আসতে পারে। এ ছাড়া নতুন করে আরও ৯০০ একর জমিতে বাগান সৃজনের কাজ চলছে।
সাতগাঁও রাবার বাগানের শ্রমিক আঙ্গুর হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি রাবার গাছ থেকে কষ সংগ্রহের কাজ করছেন। একসময় বাগানে প্রচুর কষ পাওয়া যেত। এখন অনেক গাছের উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়ায় আগের মতো কষ পাওয়া যায় না। একটি গাছ মৌসুমে ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম এবং মৌসুমের বাইরে ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম পর্যন্ত কষ দেয়।
বিএফআইডিসি রাবার বিভাগ সিলেট জোনের মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) শোভন কান্তি সাহা বলেন, ‘জীবনচক্র হারানো গাছ এবং স্থায়ী শ্রমিকের আধিক্যের কারণে বর্তমানে লোকসানে থাকতে হচ্ছে। ২০২০ সালে ৬০০ একর জমিতে নতুন বাগান করা হয়েছে। এসব গাছের বয়স এখন ছয় বছর। সাধারণত সাত বছর বয়স থেকে রাবার গাছে কষ সংগ্রহ শুরু হয়। নতুন করে আরও ৯০০ একর জমিতে বাগান সৃজন করা হচ্ছে। দ্রুত আরও নতুন বাগান গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে লোকসান অনেকটা কমে আসবে বলে আশা করছি।’
প্রসঙ্গত, ১৯৬৫ সালে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল ও ভাটেরা এলাকায় ভাটেরা রাবার বাগান সৃজনের মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলে রাবার চাষের কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ১৯৭১ সালে সাতগাঁও, ১৯৭৭ সালে রূপাইছড়া এবং ১৯৮০ সালে শাহজীবাজার রাবার বাগান প্রতিষ্ঠা করা হয়।
কেকে/ এমএস