মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে সুখবর      এবার পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
শীতেও গুরুত্ব পাক জনস্বাস্থ্য
ওসমান গনি
প্রকাশ: বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:৪৭ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

জনস্বাস্থ্যের ওপর শীতের নেতিবাচক প্রভাব প্রতি বছরই আমাদের ভাবিয়ে তোলে। গত কয়েক দিনের শীতে সারা দেশের বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের জনজীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। তীব্র শৈত্যপ্রবাহের ফলে সৃষ্ট রোগব্যাধি কেবল ব্যক্তি নয় বরং এটি আমাদের জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। এ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, শীতকালীন অসুস্থতা মোকাবিলায় ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম’, এ সনাতন প্রবাদটি বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক।

শীতকাল মানেই কেবল হিমেল পরশ নয়, বরং এটি বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার এক কঠিন পরীক্ষা। তাপমাত্রার পারদ যত নিচে নামতে শুরু করে, বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণও তত কমতে থাকে। শুষ্ক বাতাস আমাদের ত্বক, নাসারন্ধ্র এবং শ্বাসনালিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে শীতের শুরুতেই ঘরে ঘরে সর্দি, কাশি, জ্বর এবং শ্বাসকষ্টের প্রকোপ বেড়ে যায়। বিশেষ করে ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং নিউমোনিয়ার মতো রোগগুলো মহামারি আকার ধারণ করার উপক্রম হয়। 

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শীতের এ কয়েক মাসে দেশের হাসপাতালগুলোতে আউটডোর এবং ইনডোর রোগীর সংখ্যা অন্য সময়ের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এর বড় একটি অংশই থাকে শিশু এবং বয়োজ্যেষ্ঠরা, যাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা দুর্বল থাকে।

তীব্র শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে শীতকালীন শ্বাসতন্ত্রের রোগ বা রেসপিরেটরি ইনফেকশন। অ্যাজমা বা হাঁপানির রোগীদের জন্য এ সময়টা চরম দুঃসহ হয়ে ওঠে। শুষ্ক বাতাসে ধূলিকণার আধিক্য এবং ভাইরাসের সক্রিয়তা বেড়ে যাওয়ায় ফুসফুস দ্রুত আক্রান্ত হয়। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, সাধারণ সর্দি-কাশিকে আমরা খুব একটা গুরুত্ব দিতে চাই না। কিন্তু এ সামান্য অবহেলাই অনেক সময় জটিল ব্রঙ্কাইটিস বা প্রাণঘাতী নিউমোনিয়ায় রূপ নিতে পারে। তাই যখনই শীতের দাপট বাড়ে, তখনই সচেতনতার দেয়াল গড়ে তোলা জরুরি। নিয়মিত মাস্ক ব্যবহার করা, ধুলোবালি এড়িয়ে চলা এবং কুসুম গরম পানি পানের মতো ক্ষুদ্র অভ্যাসগুলো বড় ধরনের বিপদ থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে।

শীতকালে কেবল শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাই নয়, বরং হৃদরোগের ঝুঁকিও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, অতিরিক্ত ঠান্ডায় শরীরের রক্তনালিগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ে, যার ফলে রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং হৃদপিণ্ডের ওপর বাড়তি চাপের সৃষ্টি হয়। এ কারণেই শীতকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে যারা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, তাদের জন্য এ সময়টা খুবই সংবেদনশীল। পর্যাপ্ত গরম কাপড় পরিধান না করা বা হঠাৎ তীব্র ঠান্ডার সংস্পর্শে আসা এই ঝুঁকিকে আরও ত্বরান্বিত করে। সচেতনতা ও জীবনযাত্রার সামান্য পরিবর্তন এখানে জীবনদায়ী ভূমিকা পালন করতে পারে।

আমাদের জনস্বাস্থ্যের আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো শিশু ও বৃদ্ধদের সুরক্ষা। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি বিকশিত না হওয়ায় তারা খুব সহজেই ঠান্ডাজনিত ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়। অন্যদিকে, বয়োজ্যেষ্ঠদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী রোগগুলো শীতের প্রকোপে আরও জটিল হয়ে ওঠে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবারের মূল চালিকাশক্তিরা নিজেদের কাজে ব্যস্ত থাকায় প্রান্তিক পর্যায়ে শিশু ও বৃদ্ধরা সঠিক যত্নের অভাববোধ করে। 

শীতের সকালে শিশুদের খালি পায়ে হাঁটা কিংবা পর্যাপ্ত গরম কাপড় ছাড়াই বাইরে বের হওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে। রাতে শোবার সময় এবং সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর যখন তাপমাত্রার আকস্মিক পরিবর্তন ঘটে, তখন বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।

শীতের প্রভাব কেবল শারীরিক অসুস্থতায় সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি খাদ্যাভ্যাস এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপরেও প্রভাব ফেলে। শীতকালে পানির তৃষ্ণা কম পাওয়ার কারণে অনেকেই পর্যাপ্ত পানি পান করেন না, যা পানিশূন্যতা ও কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা তৈরি করে। আবার ঠান্ডার ভয়ে অনেকে নিয়মিত গোসল বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা থেকে দূরে থাকেন, যা চর্মরোগের বিস্তার ঘটায়। শুষ্ক ত্বকের যত্ন না নিলে চুলকানি বা একজিমার মতো সমস্যাগুলো প্রকট হয়ে ওঠে। তাই খাদ্যতালিকায় প্রচুর পরিমাণে শীতকালীন শাকসবজি ও ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফল রাখা যেমন জরুরি, তেমনি ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের দেশে শীতের সঙ্গে দারিদ্র্যের এক করুণ সম্পর্ক রয়েছে। বিত্তবানরা যেখানে আধুনিক সরঞ্জামে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পারেন, সেখানে ছিন্নমূল ও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে শীত এক মরণফাঁদ। প্রতি বছর খবরের কাগজে আমরা দেখি শীতজনিত রোগে কত মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। এ মৃত্যু কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি আমাদের সামগ্রিক জনসচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাবকে ফুটিয়ে তোলে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি যদি পাড়ায় পাড়ায় সামাজিক সংগঠনগুলো সক্রিয় হয় এবং শীতবস্ত্র বিতরণের পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক প্রচারণা চালায়, তবে অনেক অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু এড়ানো সম্ভব।

শীতকালীন স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো পারিবারিক সচেতনতা। ঘরের জানালাগুলো এমনভাবে বন্ধ রাখা যাতে ঠান্ডা বাতাস সরাসরি ঢুকতে না পারে, আবার পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থাও থাকা চাই। কুসুম গরম পানিতে গোসল করা এবং হাত-পা ধোয়ার অভ্যাসটি শীতকালে বাধ্যতামূলক করা উচিত। পাশাপাশি, ঘরোয়া প্রতিকার যেমন আদা-চা, মধু বা তুলসী পাতার রস হালকা সর্দি-কাশিতে চমৎকার কাজ করে। তবে কোনো সমস্যা জটিল আকার ধারণ করলে হাতুড়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন না হয়ে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়া প্রয়োজন। অনেক সময় দেরিতে হাসপাতালে যাওয়ার কারণে সাধারণ ঠান্ডা-জ্বরও রোগীর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, শীতকালীন রোগ মোকাবিলায় প্রচার-প্রচারণার কোনো বিকল্প নেই। গণমাধ্যমগুলোতে নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিন প্রচার করা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অনেকেরই ধারণা আছে যে, ঠান্ডা লাগলে কেবল ওষুধ খেলেই হবে। কিন্তু তারা এটা বুঝতে চান না যে, সঠিক সময়ে গরম কাপড় পরা বা ধুলোবালি থেকে দূরে থাকাই হলো আসল ওষুধ। প্রতিকারের পেছনে টাকা ব্যয় করার চেয়ে প্রতিরোধের ছোট ছোট পদক্ষেপগুলো অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও নিরাপদ।

বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সুরক্ষায় আমাদের সম্মিলিত সামাজিক দায়বদ্ধতা এখন সময়ের দাবি। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং পর্যাপ্ত গরম কাপড়ের ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলেই শীতজনিত রোগব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। পাশাপাশি বায়ুদূষণ ও ধুলোবালি থেকে বাঁচতে মাস্ক ব্যবহারের অভ্যাসটি এ সময় অপরিহার্য। মনে রাখতে হবে, সচেতনতা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সুস্থ থাকার প্রধান হাতিয়ার। আমাদের পরিমিত জীবনবোধ, সময়োপযোগী সতর্কতা এবং প্রান্তিক মানুষের প্রতি সহমর্মিতাই পারে এই তীব্র শীতের প্রকোপ থেকে জনস্বাস্থ্যকে পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখতে। একটি রোগমুক্ত সমাজ গঠনে প্রতিরোধের এ সংস্কৃতি প্রতিটি ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ুক, এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট 

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  শীত   গুরুত্ব   জনস্বাস্থ্য   ওসমান গনি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close