ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। সামনে রয়েছে মনোনয়ন প্রত্যাহার, প্রতীক বরাদ্দ এবং আনুষ্ঠানিক প্রচারণা। কিন্তু উদ্বেগজনক বিষয় হলো প্রচারণা শুরুর আগেই দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ সামনে আসছে। এটি নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করছে।
বিশেষ করে একের পর এক হত্যাকাণ্ড জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের বহু নেতাকর্মী খুন হয়েছেন। এর মধ্যে দলীয় কোন্দল যেমন আছে, তেমনি প্রতিপক্ষ ও অচেনা আততায়ীর হাতেও নিহত হয়েছেন অনেকে।
সর্বশেষ গত বুধবার রাতে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজার এলাকায় নিহত আজিজুর রহমান মুছাব্বির নামের এক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। এতো গেল হত্যাকাণ্ডের বিষয়। এর বাইরেও কয়েকদিন আগে দেখেছি সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেত্রী রুমিন ফারহানার অভিযোগ করেছেন, তার পথসভার মঞ্চ ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
আসন্ন নির্বচন ঘিরে এ ধরনের কর্মযজ্ঞ নির্বাচনের পরিবেশ এবং ইসির ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। নির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিয়ে তৈরি করে আস্থার সংকট। অতীতে দেশের নির্বাচনকালীন যে চিত্র আমরা দেখেছি তা থেকে অনুমান করা যায়, নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হলে সহিংসতার মাত্রা বাড়ে। এটির সত্যতা আমরা নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পরপরই দেখেছি।
এবারের নির্বাচন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন সহিংসতা দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা সন্তোষজনক নয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক সন্দেহ রয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং জামায়াতে ইসলামী তিনটি দলই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রায় একই ধরনের অভিযোগ তুলেছে।
তাদের বক্তব্য আসন্ন নির্বাচনে ইসির ‘একপাক্ষিক আচরণ’, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অভাব’ এবং ‘পাতানো নির্বাচন’ এর আশঙ্কা স্পষ্ট। যদিও নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদের বক্তব্য ‘যেভাবেই হোক সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে কাজ করছি’ তার এ বক্তব্য নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে যেই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের সেটি হলো আসন্ন নির্বাচন ঘিরে আইন শৃঙ্খলার অবনমন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের দৃশ্যমান সমন্বয় এখন ও চোখে পড়েনি। ফলে দেশজুড়ে আইন শৃঙ্খলার উন্নয়ন ঘটানোই নির্বাচন কমিশনের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ বিশেষ করে দেশজুড়ে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার রোধ ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করতে না পারলে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড আরও বাড়তে পারে। ফলে এ পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
নির্বাচনি সহিংসতার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে, তা যে দল বা প্রার্থীই হোক না কেন। দ্রুত তদন্ত, দৃশ্যমান শাস্তি এবং আইনের প্রয়োগই পারে আস্থা ফেরাতে। তবে দায় শুধু নির্বাচন কমিশনের নয়। রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন জরুরি। সহিংসতা, প্রতিপক্ষকে দমন বা প্রশাসনকে প্রভাবিত করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে না এলে কোনো নির্বাচনই প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক হতে পারে না।
নির্বাচনের মাঠে সহনশীলতা, নিয়ম মানা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার চর্চা প্রতিষ্ঠা করাই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান দায়িত্ব। দেশের বিগত দিনে অনুষ্ঠিত শেষ তিনটি নির্বাচন ছিল ভয়াবহভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী এ নির্বাচন সে সংকট কাটিয়ে ওঠার একটি সুযোগ হতে পারে। কিন্তু সে সুযোগ কাজে লাগাতে হলে নির্বাচন কমিশনকে আরও দৃঢ়, স্বচ্ছ ও সাহসী হতে হবে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা সত্যিই গণতন্ত্র চায়, শুধু ক্ষমতা নয়। তাই সবার সম্মিলিত দায়িত্ব, নির্বাচনি সহিংসতা রুখে দিতে দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ থাকা।
কেকে/ এমএস