সম্প্রতি, বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে একটি নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারির শুরুতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা একটি সরকার পতনের সমান। এই ঘটনা কেবল লাতিন আমেরিকার ভূ-রাজনীতিকে প্রভাবিত করেনি, বরং বিশ্বব্যাপী একটি নতুন ‘রেজিম চেঞ্জ’ নীতির ইঙ্গিত দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এই অভিযানকে ‘সফল’ বলে দাবি করা হলেও, এর ফলে উদ্ভূত প্রশ্ন হলো—পরবর্তী লক্ষ্য কোন দেশ? ইরান, যা মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু, নাকি কলম্বিয়া, যা লাতিন আমেরিকার নারকোটিক্স এবং অভিবাসন সমস্যার সঙ্গে জড়িত?
ভেনেজুয়েলার পতনের পটভূমি বোঝা দরকার। মাদুরো সরকার দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক সংকট, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ড্রাগ ট্রাফিকিংয়ের অভিযোগে অভিযুক্ত। ২০২৪ সালের নির্বাচন বিতর্কিত হয়ে ওঠে, এবং ২০২৫-এ ট্রাম্পের প্রশাসন ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ নীতি থেকে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে চলে যায়। মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন যে এটি ‘ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন’ নয়, বরং একটি ‘ট্রানজেকশন’—যেখানে তেল সম্পদ এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ প্রধান লক্ষ্য। এই ঘটনা কিউবা, নিকারাগুয়া এবং মেক্সিকোর মতো দেশগুলোকে সতর্ক করেছে, কিন্তু বিশেষ করে ইরান এবং কলম্বিয়া আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। ইরান বর্তমানে এক অভূতপূর্ব অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও গভীর সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত।
২০২৫ সালের শেষভাগ থেকে নারী অধিকার রক্ষা, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক মন্দা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির বিরুদ্ধে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে তা এক গণবিস্ফোরণে রূপ নিয়েছে। ইরানের প্রধান শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়া এই আন্দোলন দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া সহিংসতা ও দমন-পীড়নে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজারের ও বেশি প্রাণ হারিয়েছেন, আর গ্রেপ্তার ও আহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে হাজার হাজার। ইরানের এই উত্তাল পরিস্থিতি এখন আর কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
এই সংকটকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের প্রতি সরাসরি সমর্থন ব্যক্ত করে জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এই সংকটকালীন মুহূর্তে ‘আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত’। তবে তার বক্তব্যে ‘লেথাল ফোর্স’ বা প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের প্রচ্ছন্ন হুমকি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থানের বিপরীতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি কিছুটা কৌশলী কিন্তু দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। তিনি একদিকে যেমন সম্ভাব্য যে কোনো সংঘাতের বিরুদ্ধে সামরিক প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করেছেন, তেমনি সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে আলোচনার পথও খোলা রেখেছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ এই অস্থিতিশীলতা এবং দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। একদিকে ইরানের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, আর অন্যদিকে বিশ্বশক্তির ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থÑসব মিলিয়ে ইরান এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যে, তেহরান কি দমনের পথেই হাঁটবে, নাকি আলোচনার মাধ্যমে এই মহা-সংকট উত্তরণের পথ খুঁজবে। কেন ইরান পরবর্তী টার্গেট হতে পারে? ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ইরান মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার চাবিকাঠি। তার নিউক্লিয়ার প্রোগ্রাম, ইসরায়েলের সঙ্গে শত্রুতা এবং হুথি, হিজবুল্লাহের মতো প্রক্সি গ্রুপগুলোর সমর্থন মার্কিন নীতির জন্য চ্যালেঞ্জ। ভেনেজুয়েলার পর, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে চীন এবং রাশিয়ার সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইবে, যেমন ভেনেজুয়েলায় চীনা তেল রপ্তানি বন্ধ করা হয়েছে। তবে, ইরানের সামরিক শক্তি এবং সম্ভাব্য যুদ্ধের খরচ (যেমন তেলের দাম বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা) এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, যদি প্রতিবাদ আন্দোলন আরও তীব্র হয়, তাহলে মার্কিন হস্তক্ষেপ ‘হেল্প প্রোটেস্টার্স’ নামে আসতে পারে, যা একটি রেজিম চেঞ্জের দিকে নিয়ে যাবে। কিন্তু এটি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ ডাকবে, যেমন ভেনেজুয়েলায় ঘটেছে।
এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে কলম্বিয়া। লাতিন আমেরিকার ভূ-রাজনীতিতে কলম্বিয়া দীর্ঘদিন ধরেই একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র এবং ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বিবেচিত। তবে ২০২২ সালে প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রোর ক্ষমতা গ্রহণের পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে দৃশ্যমান টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট পেট্রোর বামপন্থি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি—বিশেষ করে প্রচলিত ‘ড্রাগ যুদ্ধ’-এর পরিবর্তে ‘টোটাল পিস’ নীতির প্রতি অগ্রাধিকার এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন এজেন্ডা—ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে। এই মতপার্থক্য ভেনেজুয়েলা ইস্যুর পর আরও প্রকট আকার ধারণ করে। ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট পেট্রো প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন যে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের একটি ‘বাস্তব হুমকি’ বিদ্যমান। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কলম্বিয়ার নেতৃত্বকে সমালোচনার আওতায় এনে পেট্রোকে একটি ‘অপ্রচলিত’ প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং মাদক পাচার দমনে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে কলম্বিয়াকে ভবিষ্যৎ চাপের সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে, কলম্বিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কেবল দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনার বিষয় নয়; বরং এটি লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কৌশল, নিরাপত্তা নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব পুনর্গঠনের বৃহত্তর ধারার প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
কলম্বিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির। ২০২৬ সালের মার্চে লেজিসলেটিভ এবং মে মাসে প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচন আসছে, যা ভেনেজুয়েলার প্রভাবে প্রভাবিত হবে। ডানপন্থি বিরোধীরা (যেমন আলভারো উরিবের পুত্র) মার্কিন হস্তক্ষেপের পক্ষে কথা বলছেন, যা দেশকে বিভক্ত করেছে। ভূ-রাজনৈতিকভাবে, কলম্বিয়া মার্কিন অভিবাসন এবং নারকোটিক্স নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কোকেইন উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ভেনেজুয়েলান মাইগ্রান্টদের প্রভাবে ট্রাম্প প্রশাসন কলম্বিয়াকে ‘নেক্সট টার্গেট’ হিসেবে দেখতে পারে। তবে, কলম্বিয়ার প্রতিষ্ঠানসমূহ (যেমন ডিইএ এবং ন্যাশনাল পুলিশ) মার্কিন সঙ্গে সহযোগিতা করে চলেছে, যা সরাসরি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা কমায়।
তুলনামূলক বিশ্লেষণে ইরান ও কলম্বিয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। ইরানের ক্ষেত্রে মার্কিন নীতির মূল লক্ষ্য হলো দেশটির আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করা এবং সম্ভাব্য পারমাণবিক হুমকি নিরসন করাÑযা সরাসরি ইসরায়েল ও সৌদি আরবের নিরাপত্তা স্বার্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই প্রেক্ষাপটে ইরান ইস্যুটি কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অংশ, যেখানে চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অপরদিকে, কলম্বিয়া ইস্যুটি মূলত লাতিন আমেরিকা-কেন্দ্রিক। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের প্রধান ক্ষেত্র হলো মাদক পাচার, অবৈধ অভিবাসন এবং জ্বালানি নিরাপত্তা, বিশেষত তেলখাত। ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাব্য সাফল্য কলম্বিয়াকে তুলনামূলকভাবে একটি সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে, বিশেষ করে যদি নির্বাচনের মাধ্যমে ডানপন্থি শক্তির উত্থান ঘটে।
যুদ্ধের ঝুঁকির দিক থেকে ইরানের পরিস্থিতি অধিকতর সংবেদনশীল ও জটিল, যা বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। বিশ্লেষকদের মতে, কলম্বিয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি সম্ভাব্য ‘সফট টার্গেট’, যেখানে সামরিক হস্তক্ষেপের পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আনা সম্ভব। বিপরীতে, ইরানের ক্ষেত্রে সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা মূলত অভ্যন্তরীণ প্রতিবাদ, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
পরিশেষে, ভেনেজুয়েলার পতন বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে, যেখানে ‘রেজিম চেঞ্জ’ আবার ফ্যাশনেবল হয়ে উঠেছে। ইরান বা কলম্বিয়াÑ কোনটি পরবর্তী হবে তা নির্ভর করবে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর। কিন্তু এই খেলায় বিজয়ী কে? বিশ্বের স্থিতিশীলতা বিপন্ন, এবং ভারত, চীনের মতো দেশগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে। শেষ পর্যন্ত, ভূ-রাজনীতি কোনো খেলা নয়—এটি মানুষের জীবন এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।
লেখক : কলামিস্ট ও শিক্ষক
কেকে/এজে