ঘনিয়ে আসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও প্রতীক বরাদ্দ শেষে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হতে যাচ্ছে। এমন একটি সংবেদনশীল সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠাটা ভয়াবহ উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই প্রশ্নকে আরও তীব্র করেছে।
প্রধান উপদেষ্টা এক অনুষ্ঠানে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক দল গঠনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, তিনি নিশ্চিত—তাদের কেউ কেউ আসন্ন নির্বাচনে জয়ী হবেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি ব্যক্তিগত মতামত বা আশাবাদী মন্তব্য বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তিনি এখন আর কেবল একজন নাগরিক বা শিক্ষাবিদ নন; তিনি রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের প্রধান। ফলে তার প্রতিটি বক্তব্যের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তাৎপর্য রয়েছে।
নির্বাচনের ঠিক আগে সরকারপ্রধানের মুখ থেকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির সম্ভাব্য বিজয় সম্পর্কে এমন প্রত্যয় ব্যক্ত করা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এতে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সন্দেহ ও অনাস্থা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। নির্বাচন যতটা বাস্তবে নিরপেক্ষ হওয়া জরুরি, ততটাই জরুরি সেই নিরপেক্ষতার দৃশ্যমানতা বজায় রাখা। প্রধান উপদেষ্টা শুরু থেকেই বলে আসছেন, শিক্ষার্থীরাই তার নিয়োগকর্তা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাস্তবতা বদলেছে। সেই শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এখন সংগঠিত রাজনৈতিক দলে রূপ নিয়েছে এবং সরাসরি নির্বাচনি প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাহী প্রধান হিসেবে তাদের প্রতি কোনো ধরনের বিশেষ অনুরাগ বা ইতিবাচক পূর্বাভাস দেওয়া সাংবিধানিক শিষ্টাচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ সরকার কার্যত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো ভূমিকা পালন করছে। সেই অবস্থানে থেকে কোনো বয়স বা পরিচয়ের মানুষের পক্ষেই এমন মন্তব্য শোভন নয়। বরং এটি সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন ও সন্দেহের জন্ম দেয়। এ উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পোস্টাল ব্যালট নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক। বিদেশ থেকে পাঠানো পোস্টাল ব্যালট একটি বাসায় গণনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়া, ব্যালটে কিছু দলের নাম ও প্রতীক অগ্রাধিকারভিত্তিতে থাকা এসব অভিযোগ নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করছে। বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের আপত্তি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। নির্বাচন কমিশনের উচিত এসব অভিযোগ দ্রুত, দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে তদন্ত করা।
এ ছাড়াও বিএনপির অভিযোগ ব্যালট পেপারে তাদের প্রতীক কে ইচ্ছাকৃতভাবে একটা কোনো রাখা হয়েছে। যাতে ভোটারদের চোখে এটি সহজে না পড়ে। বিএনপির মতো বৃহৎ রাজনৈতিক দল যদি ইসির ওপর আস্থা হারায় সেটি ভালো কোনো লক্ষণ নয়। এই নির্বাচন কেবল একটি সরকার গঠনের প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথরেখা নির্ধারণের একটি মাইলফলক হতে যাচ্ছে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা একবার নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন। তাই সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট সবপক্ষের দায়িত্ব আরও বেশি সতর্ক ও সংযত থাকা। অনুরাগ-বিরাগের ঊর্ধ্বে উঠে, বক্তব্য ও আচরণে কঠোর নিরপেক্ষতা বজায় রাখাই অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। তা না হলে প্রশ্ন উঠবে শুধু একটি বক্তব্য নিয়ে নয়, পুরো নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই। ফলে জুলাইয়ে আকাক্সক্ষাকে সমুন্নত রাখতে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে প্রকৃত অর্থেই জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত করতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন নিশ্চিত করতে হবে।
কেকে/এজে