মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
ভয়ের রাজনীতি ও পতিত শক্তির প্রত্যাবর্তন
শিতাংশু ভৌমিক অংকুর
প্রকাশ: বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬, ৫:৩৭ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিষয় বারবার লক্ষ্য করা যায় গণঅভ্যুত্থানে পতিত স্বৈরাচার শক্তিগুলো কখনোই নিজেদের শক্তিতে ফিরে আসে না। তারা ফিরে আসে প্রতিপক্ষের ভয়কে পুঁজি করে। এই ফিরে আসা কোনো হঠাৎ ঘটনা নয়; এটি একটি সুপরিচিত ও সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। গণআন্দোলনের মাধ্যমে পরাজিত যে কোনো ক্ষমতা আসলে পরাজিত হয় নৈতিকভাবে। কিন্তু সেই নৈতিক পরাজয় টিকে থাকে তখনই, যখন রাজনীতির প্রধান বিভাজনটিও নৈতিক থাকে। বিভাজনের রেখা সরে গেলে অপরাধও ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যায়।

গণঅভ্যুত্থান মূলত  পতিত শাসকের নৈতিক বৈধতাকে বাতিল করে দেয়। এটি রাষ্ট্রকে নয়, ক্ষমতার অপব্যবহারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। নৈতিক পরাজয় মানে শুধু ক্ষমতা হারানো নয় এর অর্থ হলো সংঘটিত অপরাধের দায় স্বীকারের বাধ্যবাধকতা, ভুক্তভোগীদের স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যতে সেই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর অঙ্গীকার। এই নৈতিক কাঠামো অক্ষত থাকলেই গণঅভ্যুত্থানের অর্জন টেকে। কিন্তু রাজনীতি যখন এই কাঠামো ছেড়ে ভয় ও প্রতিহিংসায় রুপ নেয়, তখন পতিত শক্তির জন্য পুনরুদ্ধারের পথ খুলে যায়।

এই কৌশল বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন নয়। মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুড নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর সামরিক জান্তা নিজেদের অতীতের দমন-পীড়নকে স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্র রক্ষার নামে বৈধতা দিতে পেরেছে। তুরস্কে ইসলামপন্থি রাজনৈতিক উত্থানকে ভয় দেখিয়ে বারবার সামরিক হস্তক্ষেপকে প্রয়োজনীয় বলে উপস্থাপন করা হয়েছে। সর্বত্র একই সূত্র কাজ করেছে। ভয়ের রাজনীতি পুরোনো অপরাধকে নতুন ভাষা দেয় এবং নৈতিক বিচারের জায়গা দখল করে নেয়।

বাংলাদেশেও এই সূত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতন ছিল স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণের একটি স্পষ্ট নৈতিক রায়। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেই স্বৈরশাসনের সহযোগীরা আবার রাজনীতির মূলধারায় ফিরে আসে। কারণ রাজনীতির প্রধান দ্বন্দ্ব আর স্বৈরতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র থাকেনি তা সরে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপির দ্বন্দ্বে। এই বিভাজনের ভেতরেই এরশাদ নিজেকে তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর শক্তি হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ পায়। গণঅভ্যুত্থানের নৈতিক স্মৃতি ধীরে ধীরে মুছে যায়, কিন্তু ক্ষমতার পুরোনো সমীকরণ অক্ষত থাকে।

এই বাস্তবতার সঙ্গে ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিজ্ঞতার সম্পর্ক সরাসরি। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে জরুরি অবস্থা জারি করে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছিল। তারা নিজেদের অস্বাভাবিক অবস্থান বৈধ করতে রাজনীতির ব্যর্থতা ও পুরোনো শক্তি ফিরে এলে দেশ অচল হয়ে যাবে এই ভয়কে প্রধান যুক্তি বানিয়েছিল। গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটের ঘাটতি তখন ভয় দিয়েই পূরণ করা হয়েছিল। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ও সংস্কারের ভাষা যতটা জোরালো ছিল, নৈতিক বিচারের কাঠামো ততটাই অসম্পূর্ণ ছিল। ফলে সেই সময়ও পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলো সম্পূর্ণভাবে নৈতিক পরাজয়ের মুখোমুখি হয়নি। বরং তারা অপেক্ষার সুযোগ পেয়েছে।

এই অভিজ্ঞতা সামনে রেখে বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতির দিকে তাকালে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা স্পষ্ট হয়। আওয়ামী লীগকে যত বেশি রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছেÑউঠতে-বসতে শুধু তাদের গালি দেওয়াই যত বেশি রাজনীতির প্রধান ভাষা হয়ে উঠছে-ততবারই বাস্তবে আওয়ামী লীগের অপরাধ জনমানসে ক্ষয় হতে শুরু করছে। 

এখানে আওয়ামী লীগের অপরাধ বলতে দলীয় নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন, হত্যা, গুম, খুন, দমন-পীড়ন ও জবাবদিহিহীন শাসনের কথাই বোঝানো হচ্ছে। এসব অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে যখন অপরাধে জড়ায়নি এমন কর্মী সমর্থকদেরও যুক্ত করা হয় এবং ব্যক্তি শত্রুতার জের ধরে কিংবা রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য নামে বেনামে মিথ্যা মামলা দেওয়া। তখন ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হয় আর এই সুযোগে প্রকৃত অপরাধীরাও পার পেয়ে যায়। 

তখন মানুষের মধ্যে স্বাভাবিক তুলনাবোধ কাজ করে এবং পতিত শক্তিও তখন নিজেদের ভিক্টিম হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ পায়। বিগত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ যে স্বৈরাচারী আচরণ করেছিল, আজ যদি সেই আচরণের পুনরাবৃত্তি অন্যদের হাতেও দেখা যায়, তাহলে দায় আর একচেটিয়া থাকে না। অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের ভয় দেখানো সবচেয়ে কার্যকর হয়ে ওঠে নিজেদের অস্বাভাবিক অবস্থান বৈধ করার জন্য। তারা নির্বাচিত নয়, সরাসরি জনগণের ম্যান্ডেট তাদের নেই। এই ঘাটতি ঢাকতেই বলা হয় আওয়ামী লীগ ফিরে এলে রাষ্ট্র অস্থির হবে, দেশ বিপন্ন হবে।

ভয় এখানে গণতান্ত্রিক ঘাটতির বিকল্প ভাষা হয়ে ওঠে। জামায়াতে ইসলামীর জন্য এই ভয় আরও কৌশলগত। অতীতের ভূমিকা, যুদ্ধাপরাধের স্মৃতি ও আদর্শগত প্রশ্নে তাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এখনো সীমিত। আওয়ামী লীগকে একমাত্র শত্রু হিসেবে হাজির করলে তারা নিজেদের ইতিহাসের দায় এড়িয়ে যেতে পারে এবং নিজেদের নিপীড়িত পক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। এতে রাজনৈতিক পুনর্বাসন সহজ হয়। এনসিপির ভয় দেখানো আবার ভিন্ন জায়গা থেকে আসে। 

নতুন শক্তি হিসেবে সামাজিক ভিত্তি ও সাংগঠনিক বিস্তার দুর্বল হওয়ায় আওয়ামী লীগকে প্রধান প্রতিপক্ষ বানিয়ে তারা দ্রুত দৃশ্যমানতা ও রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করতে চায়। রাষ্ট্রের অস্থিতিশীল অবস্থায় এ ধরনের ভয় জনমনে অনেক সময় বিপরীতভাবে ক্রিয়া করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই তিন পক্ষই জানে আওয়ামী লীগকে সর্বব্যাপী ভয় হিসেবে ধরে রাখলে তাদের পারস্পরিক বিরোধ সামনে আসে না। অর্থনৈতিক ব্যর্থতা, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচার, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখার অস্পষ্টতা- সব প্রশ্ন চাপা পড়ে যায় ‘আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে’ এই একক আতঙ্কের নিচে। ভয় এখানে শাসনের আঠা হয়ে ওঠে।

কিন্তু ইতিহাস বলে, এই কৌশল শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দেয়। আওয়ামী লীগকে যত বেশি সর্বগ্রাসী ভয় হিসেবে তুলে ধরা হবে, তত বেশি তারা তুলনামূলকভাবে ভুক্তভোগী হয়ে উঠবে। নিপীড়ন, রাজনৈতিক বঞ্চনা ও প্রতিহিংসার অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে তাদের অতীতের অপরাধকে জনমানসে হালকা করে দেবে। ঠিক যেমন একসময় এরশাদ ফিরে এসেছিল দুই প্রধান দলের পারস্পরিক ভয়কে পুঁজি করে।

গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনীতির বিভাজন যদি অপরাধ বনাম জবাবদিহি, নিপীড়ন বনাম ন্যায়বিচারের রেখায় না থাকে, তবে যে শক্তিই ক্ষমতায় আসুক, স্বৈরাচারের চরিত্র বদলায়Ñস্বৈরাচার যায় না। আওয়ামী লীগের ভয় দেখানো আসলে তাদের দুর্বল করার চেয়ে তাদের পুনরুদ্ধারের পথই তৈরি করছে। যে নৈতিক সুবিধা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন শক্তিগুলোর হাতে এসেছিল, সেই সুবিধা তারা নিজেরাই নষ্ট করছে প্রতিপক্ষের টুলসটি অতিরিক্ত ব্যবহার করে।

এ সংকট থেকে বের হওয়ার একমাত্র টেকসই পথ হলোÑ রাজনীতির কেন্দ্রকে আবার নৈতিক অক্ষে ফিরিয়ে আনা। রাজনীতির মূল প্রশ্ন হতে হবে যে ক্ষমতায় থাকবে তাকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। পতিত স্বৈরাচারের ভয় দেখিয়ে নিজেদের অপসাশনকে ঢাকা যাবে না। আওয়ামী লীগের আমলে সংঘটিত রাষ্ট্রীয় অপরাধের স্বচ্ছ বিচার যেমন জরুরি, তেমনি বর্তমান ক্ষমতাধরদের ক্ষেত্রেও একই নৈতিক মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে। আজকের দমন-পীড়নকে যদি আগামী দিনের ‘প্রয়োজনীয় কঠোরতা’ বলে বৈধতা দেওয়া হয়, তাহলে গণঅভ্যুত্থানের নৈতিক ভিত্তি সেখানেই ধসে পড়ে।

ভয়ের বদলে ন্যায়বিচারকে রাজনৈতিক ভাষা বানাতে পারলেই পতিত শক্তির পুনরুদ্ধারের পথ বন্ধ করা সম্ভব। অন্যথায় ইতিহাস আবারও নিজেকে পুনরাবৃত্তি করবে স্বৈরাচার যাবে, কিন্তু স্বৈরাচারের কাঠামো থেকে যাবে। রাজনীতি যখন নীতির জায়গা ছেড়ে ভয়কে কেন্দ্র করে চলে, তখন পতিত শক্তি কখনোই পরাজিত থাকে না; তারা শুধু অপেক্ষায় থাকে।

লেখক : সংবাদকর্মী

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  ভয়ের রাজনীতি   পতিত শক্তির প্রত্যাবর্তন   শিতাংশু ভৌমিক অংকুর  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close