ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনে আগ্রাসন চালিয়ে লাখ লাখ মানুষ হত্যা করছে। এই আগ্রাসনের অন্যতম কারণ তেল সম্পদ। আর এই তেল সম্পদ নিয়ন্ত্রণ ও ভোগ করতে যে দেশটি কলকাঠি নাড়ছে তা হলো আমেরিকা। আরব বিশ্বকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্যই, আমেরিকা ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল যুদ্ধ বন্ধ করছে না।
সম্প্রতি জাতিসংঘের কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আঙ্কটাড) এক গবেষণায় দেখা গেছে, গাজার লেভান্ট বেসিনে নতুন করে গ্যাসের মজুতের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেখানে ১২২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়া গেছে। আর উত্তোলনযোগ্য তেলের পরিমাণ ১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ব্যারেল হতে পারে। এর মানে ৫২৪ বিলিয়ন ডলারের এ মজুত অঞ্চলটির বিভিন্ন অংশীদারের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। পশ্চিম তীর ও গাজা নিয়ে ১৯৯৫ সালে ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের মধ্যে দ্বিতীয় অসলো চুক্তি হয়।
চুক্তিটিতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে সমুদ্রে জলসীমায় উপকূল থেকে ২০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত অধিকার দেওয়া আছে। এ চুক্তির আওতায় ফিলিস্তিন ১৯৯৯ সালে গ্যাস অনুসন্ধানে ব্রিটিশ গ্যাস গ্রুপের সঙ্গে ২৫ বছরের চুক্তি করে। ওই বছরই ১৭-২১ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে গাজা মেরিন নামে বিশাল গ্যাস ক্ষেত্রের সন্ধান মেলে। তবে এই গ্যাসের বিক্রি নিয়ে ইসরায়েল সরকার, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও ব্রিটিশ গ্যাস কোম্পানির মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা হলেও অধিকৃত অঞ্চলে যে রাজস্ব বিধান আছে, সে অনুযায়ী কোনো মুনাফা পায় না ফিলিস্তিন।
গাজাকে অবরুদ্ধ করে রাখার পর থেকে এর প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ইসরায়েল। চুক্তিকারী ব্রিটিশ গ্যাসও ফিলিস্তিনকে এড়িয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। ইসরায়েল পশ্চিম তীরের ভেতর মেগেদ তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণও নিয়ে নিয়েছে। ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানের কাছে তেল বিক্রির টাকা দিয়ে ইসরায়েল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র কিনছে এবং পরোক্ষভাবে লাভবান হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বেআইনিভাবে আটক করে ধরে নিয়ে যায় ইউএস প্রশাসন যার ফলে বিশ্বজুড়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রে দেশটির বিশাল তেল সম্পদ। ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেবে এবং মার্কিন কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে দেশটির তেলশিল্পের পুনর্গঠন করবে।
২০২৩ সালের তথ্যমতে, মার্কিন ‘এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ (ঊওঅ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার মাটির নিচে রয়েছে প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল। এটি বিশ্বের মোট মজুতের প্রায় ২০ শতাংশ। ভেনেজুয়েলা বর্তমানে সৌদি আরবকে (২৬৭ বিলিয়ন ব্যারেল) টপকে বিশ্বের ১ নম্বর তেল সমৃদ্ধ দেশ। ভেনেজুয়েলায় রয়েছে ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল অপরদিকে সৌদি আরবে রয়েছে ২৬৭ বিলিয়ন ব্যারেল। এর পরেই রয়েছে ইরান ও ইরাক। ইরানে গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা দেশব্যাপী বিক্ষোভে অন্তত ১২-২০ হাজারের মতো মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে বিক্ষোভকারী, বেসামরিক নাগরিক এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ এ তথ্য জানিয়েছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে। চলমান আন্দোলনকে ‘বিদেশি-প্রণোদিত’ নাশকতা হিসেবে অভিহিত করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের চাপে সরকার পিছু হটবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করতেই আন্দোলনের নামে এই পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। এমনকি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি চিঠিও পাঠিয়েছে ইরান। যেখানে বিক্ষোভকে ‘সহিংস নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড এবং ব্যাপক ভাঙচুর’-এ রূপান্তরিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করা হয়েছে।
২০২৫ সালের ১৩ জুন ভোরে, ইসরায়েলি বিমানবাহিনী ইরানের ওপর হামলা চালায়। একটি বিশাল বিমান হর দিয়ে ইসরায়েল এই হামলা শুরু করে। পারমাণবিক স্থাপনা এবং সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইসরায়েলি বাহিনী এই হামলা চালায়। এই হামলার নামকরণ করা হয় অপারেশন রাইজিং লায়ন নামে। সকাল ৬:৩০ নাগাদ, পাঁচটি আক্রমণ চালানো হয়েছিল। এগুলো ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো এবং ঊর্ধ্বতন সামরিক নেতৃত্বের অবস্থানসহ কয়েক ডজন স্থানকে লক্ষ্য হামলা করা হয়। একই সঙ্গে, মোসাদ ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করার জন্য নাশকতামূলক অভিযান পরিচালনা করেছে বলে জানা গেছে। ইসরায়েলের এই হামলার নেপথ্য শক্তির যোগানদার আমেরিকা।
খোলাখুলি না বললেও এই আক্রমণের কিন্তু আরেকটি বড় উদ্দেশ্য ছিল ইরানে শাসন পরিবর্তন। ইসরায়েল চায় সেখানে এমন এক সরকার আসুক, যা তাদের অন্য মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের মতো হবে (যেমন সৌদি আরব মিশরের মতো)। যারা তেল আবিবের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখতে পারলে খুশি থাকবে।
গাজায় খাদ্য অবরোধ ইউরোপের কিছু মিত্রদেশকে অস্বস্তিতে ফেলতে শুরু করেছিল। অথচ তারাও গাজা ইস্যুতে ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সহায়তা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র তো সরাসরি ইসরায়েলি বর্ণবাদী রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন ও তার পশ্চিমা মিত্ররা নিজেদের বাণিজ্যের স্বার্থে মধ্য প্রাচ্যে যুদ্ধ হাঙ্গামা সৃষ্টি করছে। মধ্য প্রাচ্যের রয়েছে বেশকিছু মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। এই ঘাঁটিগুলোতে অবস্থান করছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মার্কিন সৈন্য।
বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্ক রাষ্ট্রের একটি স্বায়ত্তশাসিত অংশ। মার্কনি যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক জানিয়েছে যে গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য। তা না হলে ট্রাম্প সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে দ্বীপটি দখল নেওয়ার। কিছু ভূতাত্ত্বিক বিশ্বাস করেন যে গ্রিনল্যান্ডে বিশ্বের বৃহত্তম অবশিষ্ট তেল সম্পদ রয়েছে। ২০০১ সালে, মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ আবিষ্কার করে যে উত্তর-পূর্ব গ্রিনল্যান্ডের (আর্কটিক সার্কেলের উত্তর এবং দক্ষিণে) জলাশয়ে ১১০ বিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত তেল থাকতে পারে। গ্রিনল্যান্ডে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে তেল, বিরল খনিজ পদার্থ এবং ইউরেনিয়াম, যা পারমাণবিক শক্তির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই অফারগুলো দ্বীপের কৌশলগত গুরুত্ব এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এর আকর্ষণকে আরও বাড়িয়ে তোলে। আটলান্টিক মহাসাগর থেকে আর্কটিক মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই দ্বীপে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। রাশিয়ান ও চীনা সামরিক কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণের জন্য এটি অনন্যভাবে অবস্থিত। তাই এই অঞ্চলে মার্কিন নিয়ন্ত্রণের জন্য জরুরি বলে ট্রাম্প প্রশাসন মনে করেন।
ট্রাম্প দ্য আটলান্টিককে দেওয়া তার সাক্ষাৎকারে গ্রিনল্যান্ডকে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেছেন, বলেছেন যে এটি চীনা ও রাশিয়ান জাহাজ দ্বারা ‘বেষ্টিত’, যার ফলে মার্কিন প্রতিরক্ষা বৃদ্ধি প্রয়োজন। গত জানুয়ারিতে এই অঞ্চলের প্রতি তার আকাক্সক্ষা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি আরও জোর দিয়েছিলেন যে এটি ‘অর্থনৈতিক নিরাপত্তার’ জন্য প্রয়োজন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তেল সমৃদ্ধ দেশগুলোতে সরাসরি সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা না করলেও, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। এক্ষেত্রে তারা সামরিক চুক্তি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, বিনিয়োগ এবং ভূ-রাজনৈতিক কৌশল ব্যবহার করে। বিশেষত মধ্যপ্রাচ্য ও ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোতে, যেখানে তাদের নিয়ন্ত্রণ কখনো কখনো প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের রূপ নেয়, যেমন ভেনেজুয়েলায় সম্প্রতি আমেরিকার আক্রমণ।
বিশ্বে যেভাবে আমেরিকা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ করে তা হলো, ১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক চুক্তি করে, যা তাদের পররাষ্ট্র নীতিকে প্রভাবিত করে। ২. ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তাদের তেল রপ্তানি ও অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। ৩. মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন ও প্রতিরক্ষা চুক্তি তাদের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে সাহায্য করে, যা তেলের সরবরাহ ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক। ৪. বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর (যেমন চীন বা রাশিয়া) প্রভাব কমাতে কৌশলগতভাবে তেল সমৃদ্ধ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে।
প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ :
যদিও সরাসরি তেল দখল করার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার বেশি, তবে ইরাক যুদ্ধের মতো ঘটনাগুলোতে তেলের বিষয়টিও একটি কারণ ছিল, যেখানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ছিল সরাসরি। ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালায় আমেরিকা।
কিছু ক্ষেত্রে, মার্কিন নীতি নির্ধারকরা তেল-সমৃদ্ধ দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে নিজেদের অনুকূলে সরকার বসানোর চেষ্টা করেছেন, যা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণেরই একটি রূপ।
প্রকৃতার্থে মুল বিষয়গুলো হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী ও ভোক্তা দেশ হওয়ায়, তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। তারা সরাসরি তেল নিয়ন্ত্রণ না করলেও, তেলের উৎসগুলো নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বলয়ের মধ্যে রাখতে চায়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করে। তাদের একচেটিয়া ইচ্ছায় তেলের বাজার নির্ধারণ করে। আর তেল সম্পদের সমস্ত মুনাফা তারা লুটে নেয়।
কেকে/এমএ