মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
র‌্যাবের ওপর হামলা আইনশৃঙ্খলার বিপর্যয়
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৪:২২ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

১৯ জানুয়ারি ২০২৬, সোমবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে র‌্যাব কর্মকর্তাদের ওপর বর্বরোচিত হামলা হয়েছে। এ ঘটনায় র‌্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত ও কয়েকজন আহত হয়েছেন। এটি কেবল একটি অপরাধমূলক ঘটনা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং জননিরাপত্তার ওপর এক চরম চপেটাঘাত। কারণ, এই হামলা এমন এক সময়ে সংঘটিত হয়েছে যখন দেশ একটি স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যাচ্ছে।

সীতাকুণ্ডের মতো ভৌগোলিক বৈচিত্র্যময় এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর এই সশস্ত্র আক্রমণ প্রমাণ করে যে, অপরাধী চক্রগুলো এখন কেবল আত্মরক্ষায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার মতো দুঃসাহস অর্জন করেছে। র‌্যাবের ওপর যে বর্বরোচিত হামলা হয়েছে, তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও মনস্তাত্ত্বিক স্থিতিশীলতার ওপর একটি গভীর আঘাত। এই ঘটনায় একজন কর্মকর্তা নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার বিষয়টি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন।

সীতাকুণ্ডের দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এবং সেখানকার জটিল জনতাত্ত্বিক কাঠামোকে কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা যে দুঃসাহস দেখিয়েছে, তা রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলার প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। সীতাকুণ্ডের পাহাড় ও উপকূলীয় এলাকা দীর্ঘকাল ধরে অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নজরদারির অভাবে এটি একটি ‘সেফ জোন’ বা অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ধর্মীয় বা রাজনৈতিক আদর্শের ভুল ব্যাখ্যা এবং উগ্রবাদী চিন্তাধারার প্রসারের ফলে সন্ত্রাসীরা এখন জীবন দিতে বা নিতে দ্বিধা করছে না। বিগত বিভিন্ন অভিযানে নিজেদের সদস্যদের হারানো বা গ্রেপ্তারের ক্ষোভ থেকে তারা র‌্যাবকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। আকস্মিক অভিযানের মুখে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং এলাকা থেকে নিরাপদে সরে যেতে তারা এই আত্মঘাতী হামলা করতে পারে।

মনস্তাত্ত্বিকভাবে, যখন কোনো অপরাধী নিশ্চিত হয় যে সে ধরা পড়বে, তখন তার মধ্যে ‘মরিয়া’ ভাব তৈরি হয়, যা তাকে সহিংস করে তুলতে পারে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনার অংশ তুলতে পারে, যাতে বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেওয়া যায়। স্থানীয় বিচারব্যবস্থা বা প্রভাব বজায় রাখতে সন্ত্রাসীরা সমান্তরাল প্রশাসন চালানোর চেষ্টা করে, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা তাদের প্রধান বাধা। হামলার সময় ও প্রকৃতি নির্দেশ করে যে, মাঠপর্যায়ে গোয়েন্দা তথ্যের অভাব বা সমন্বয়হীনতা ছিল, যার সুযোগ সন্ত্রাসীরা নিয়েছে। সাধারণ মানুষের মনে এই বার্তা দেওয়া যে, ‘আমরা যদি র‌্যাবকে মারতে পারি, তবে সাধারণ মানুষ আমাদের কাছে কিছুই নয়।’ সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ও ঝোপঝাড় গেরিলা আক্রমণের জন্য অত্যন্ত অনুকূল, যা সন্ত্রাসীরা সফলভাবে ব্যবহার করেছে। স্থানীয় অপরাধী চক্রের সঙ্গে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের একটি অংশের অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়া এই অঞ্চলের অপরাধের মাত্রাকে আন্তর্জাতিক রূপ দিচ্ছে। বাইরের হস্তক্ষেপ বন্ধ করে নিজেদের অপরাধী সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ন রাখা। সময় বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ এখন সন্ত্রাসীদের হাতে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

২০২৬ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশকে অস্থিতিশীল করার এটি একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। সাধারণ মানুষ যাতে ভোটকেন্দ্রে যেতে ভয় পায় এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, সেই লক্ষ্য কাজ করছে। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা অপরাধীদের সশস্ত্র বিদ্রোহের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সীতাকুণ্ডে ঘটনাটি বিশ্লেষণ করে জননিরাপত্তার ওপর বড় হুমকি দেখতে পাই।

আমার দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনার ফলে বাংলাদেশের জননিরাপত্তা ব্যবস্থার যে ক্ষতি হতে পারে তা নিম্নরূপ: করতে পারে হতে পারে তুলতে পারে পড়তে পারে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি এবং রাজপথে অস্থিরতা বৃদ্ধি করতে পারে। পার্বত্য ও উপকূলীয় এলাকায় পর্যটন ও সাধারণ জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়তে পারে। বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক ভীতি তৈরি হলে তারা অভিযানে সাহসী ভূমিকা রাখতে দ্বিধাগ্রস্ত হতে পারে। সন্ত্রাসীদের আধিপত্য থাকলে ভীতিমুক্ত পরিবেশে নির্বাচন আয়োজন অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো রাজনৈতিক ঢাল ব্যবহার করে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে পারে। সাধারণ মানুষের জীবন ও মালের নিরাপত্তা চরমভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। অবৈধ অস্ত্রের জোরে নির্বাচনের দিন বুথ দখল ও কেন্দ্র দখলের সংস্কৃতি ফিরে আসার সম্ভাবনা হতে পারে। বাংলাদেশ একটি ‘অস্থিতিশীল রাষ্ট্র’ হিসেবে বিশ্ব দরবারে পরিচিত হতে পারে, যা বৈদেশিক বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারে।

র‌্যাব একটি বিশেষায়িত বাহিনী, এই বাহিনীতে সেনাবাহিনী, বিজিবি, নৌবাহিনী, বিমান ও পুলিশ বাহিনীর চৌকস সদস্য রয়েছে। এই বাহিনীর রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ। এ অবস্থায় প্রশ্ন জাগে যে, এমন একটি এলিট ফোর্সের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীদের এ ধরনের ডেম কেয়ার ভাব পরিলক্ষিত হলে, আনসার বা পুলিশের অবস্থান কোন পর্যায়ে রয়েছে। সাইবার ও প্রোপাগান্ডা যুদ্ধ- সন্ত্রাসীরা হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বাহিনীর মনোবল ভাঙার চেষ্টা করছে। অর্থনৈতিক মদতদাতা- এই সন্ত্রাসীদের পেছনে কারা অর্থ ও অস্ত্রের জোগান দিচ্ছে, সেই ‘গডফাদার’দের চিহ্নিত করা জরুরি। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা-বেকারত্ব এবং হতাশাগ্রস্ত যুবসমাজকে অপরাধী চক্রগুলো সহজেই রিক্রুট করছে।

বাংলাদেশের গভীর সংকট নিরসনকল্পে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলের নিম্নলিখিত সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে পারে বলে মনে করি, এই জাতীয় সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারকে একটি সমন্বিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। অবিলম্বে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে দেশব্যাপী চিরুনি অভিযান চালিয়ে লুণ্ঠিত ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুলিশের ই-সেবা ও হেল্পলাইন ব্যবহার করা যেতে পারে। হিউম্যান ইন্টেলিজেন্সের পাশাপাশি ড্রোন প্রযুক্তি ও জিও-ট্যাগিং ব্যবহার করে দুর্গম এলাকায় অপরাধীদের অবস্থান শনাক্ত করতে হবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর অভ্যন্তরে ও চারপাশে নজরদারি বাড়াতে হবে যাতে তারা স্থানীয় অপরাধীদের সঙ্গে মিশে যেতে না পারে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যাতে কোনো অপরাধীকে আশ্রয় না দেয়, তা নিশ্চিত করতে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। এই হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। যারা বিপথে গেছে তাদের ফিরিয়ে আনতে এবং সাধারণ মানুষের ভয় দূর করতে সামাজিক প্রচারভিযান চালাতে হবে। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের পিছু হটার কোনো সুযোগ নেই। অপরাধীদের এই দুঃসাহসকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে না পারলে জননিরাপত্তা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি নিরাপদ ও সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আজকের অঙ্গীকার।

১৯ জানুয়ারির এই শোকাবহ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে যে, আইনের শাসনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। সরকার, নিরাপত্তা বাহিনী এবং সচেতন নাগরিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে বাংলাদেশকে সন্ত্রাসমুক্ত ও নিরাপদ রাষ্ট্রে পরিণত করতে। ২০২৬ সালের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে হলে আজকের এই নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলোকে সমূলে বিনাশ করা অপরিহার্য।

লেখক : প্রাবন্ধিক

কেকে/ আরআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  র‌্যাব   হামলা   আইনশৃঙ্খলা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close