সামনে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ছাত্র-জনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফলে এই নির্বাচন আয়োজন করার সুযোগ এসেছে। ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে জনগণ। রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পেয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে নির্যাতিত-নিপীড়িত, নির্বাসিত, মিথ্যা মামলায় জর্জরিত, রাজবন্দী, গুম হওয়া অসংখ্য রাজনীতিবিদ নতুন করে রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছেন। রাজনৈতিক দল, রাজনীতিবিদ এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখার প্রহর গুনছে দেশবাসী।
আগামী নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের নির্বাচন নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ এবং আহত হওয়া দেশপ্রেমিক এবং আপামর জনগণের আশা-আকাক্সক্ষাকে বাস্তবায়ন করার নির্বাচন। এবং আগামীর বাংলাদেশে আবার নতুন কোনো স্বৈরাচার সরকার জন্ম নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে কি না, তা নির্ধারণ করার নির্বাচন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে। আগামী রাষ্ট্রে স্বৈরাচারের জন্মনিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে গঠিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ বাস্তবায়ন লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গণভোট আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত হলেই তবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ বাস্তবায়নে হবে। অন্যথায় স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের রেখে যাওয়া স্বৈরাচারী সংবিধানের অন্ধকারেই দেশের মানুষকে বাস করতে হবে। ভোগ করতে হবে নব্য স্বৈরাচারের জুলম-নির্যাতন। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে মোটা দাগে যেসব বিষয় রাষ্ট্র এবং জনগণের কল্যাণে কাজে আসবে, সেটি হলো’—তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্মকমিশন গঠনে সরকারি দল ও বিরোধী দল একত্রে কাজ করবে। সরকারি দল ইচ্ছেমতো সংবিধান সংশোধন করতে পারবে না। সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান চালু হবে। বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটিসমূহের সভাপতি নির্বাচিত হবেন। যত মেয়াদই হোক, কেউ সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব পর্যায়ক্রমে বাড়বে। ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য পার্লামেন্টে একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। দেশের বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য থাকবে।’ আমাদের ভুলে গেলে চলবে নাÑস্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নিজের খেয়াল-খুশি মতো সংবিধান সংশোধন করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করার মাধ্যমেই সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে বিনা নির্বাচনে, বিনা ভোটে বছরের পর বছর রাষ্ট্রের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিল। স্বৈরাচার জন্ম নেওয়ার পথ বন্ধ করার যে সুযোগ এসেছে, তা কাজে লাগানোর মোক্ষম সময় এসেছে। আমাদেরকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা আবারও নতুন কোনো স্বৈরাচারের জুলুম-নির্যাতন, হামলা-মামলা, গুম-খুন, অন্যায়-অবিচার, অপরাজনীতি, অপশাসন, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, নাগরিক অধিকার হরণ, বাকস্বাধীনতা হরণ সহ্য করব কি-না।
জনগণ দেশ ও রাষ্ট্রের মালিক। দেশকে নতুনভাবে গড়ার যে সুযোগ এসেছে, তা কাজে লাগানোর চাবিকাঠি জনগণের হাতেই। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ভোট প্রদানের মাধ্যমে জনগণকেই সিদ্ধান্ত হবে—আগামী ৫ বছরের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব কার হাতে হস্তান্তর করলে, দেশে সুশাসন, ন্যায়বিচার, নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক সুরক্ষা এবং স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব কায়েম হবে । এবং সিদ্ধান্ত নিতে হবে—নিজ নিজ আসনে কাকে নির্বাচিত করলে জনগণের নিরাপত্তা ও অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। দেশ এখন একটি কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্র পুরোনো এবং নতুন বন্দোবস্তের মাঝ বরাবর দোদুল্যমান। সুতরাং গণভোট এবং সংসদ নির্বাচনে জনগণের অভিপ্রায়-ই হবে জনগণের দাসত্ব কিংবা আজাদীর সনদ।
আমাদের দেশের জনগণ সাধারণত কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের অন্ধভক্ত হয়ে থাকেন। আবার কোনো দলেরই অন্ধভক্ত নয়, এমন জনগণের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। তবে আমার ধারণা—জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের জনগণ রাজনৈতিক দলগুলোর অন্ধভক্ত হওয়ার কথা নয়। ফলে জোর দিয়ে আর বলার অবকাশ নেই যে, কেবল অন্ধভক্তদের ভোটেই রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতা লাভে সক্ষম হবে। এবারের নির্বাচন সচেতন নাগরিকের নির্বাচন হবে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি হয়েছিল বলেই ২৪-এর ৫ আগস্টে বাংলাদেশ স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছে। স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের ষোলো বছরের জুলুম-নির্যাতন জনগণ এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাওয়ার কথা নয়। তা ছাড়াÑজুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্বৈরাচারের পেটুয়া বাহিনীর বুলেটের শব্দ এখনো কানে বাজে। রাজপথে পড়ে থাকা বুলেটবিদ্ধ নিথর দেহ চোখে ভাসে। গুলির আঘাতে তরতাজা মানুষগুলোর লুটে পড়ার দৃশ্য স্মৃতিতে আঘাত করে। শহীদ আবু সাঈদের ঝাঁজরা বুক জুলাইকে ভুলতে দেয় না। মীর মুগ্ধের ‘পানি লাগবে, পানি?, কারও পানি লাগবে, পানি?’ শুব্দগুলো মগজে ঘুরে বেড়ায়। শহীদ হওয়া বিপ্লবীদের গণকবরের মাটি এখনো মিলিয়ে যায়নি। আহত হওয়া বিপ্লবীদের ক্ষত এখনো শুকায়নি। শহীদ হওয়া সন্তানের খুঁজে গণকবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মায়েদের কান্না স্বৈরাচারী সরকারের বর্বরতাকে ভুলতে দেয় না। এমন রক্তাক্ত জুলাইয়ের দেশে আবার স্বৈরাচার জম্ম নেওয়ার সুযোগ আমরা দিতে পারি না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আশা-আকাক্সক্ষাকে বাস্তবায়ন করাই এখন আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
এই নির্বাচনকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব। এই নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ এবং আহতদের রক্ত এবং আশা-আকাক্সক্ষা মিশে আছে। এদের রক্ত মাড়িয়ে যেনতেন প্রকারের কোনো নির্বাচন জাতি কামনা করে না। আমরা ইতোমধ্যে দেখতে পেলাম—প্রায় ৪৫ জন ঋণখেলাপি এবং কয়েকজন দ্বৈত নাগরিক নাগরিকধারীর মনোনয়ন নির্বাচন কমিশন বৈধ ঘোষণা করেছে। অথচ বিদ্যমান আইনে ঋণখেলাপি এবং দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচন কমিশনার মনের কষ্ট নিয়ে নিয়ে নাকি এদের ছাড় দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন কি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পিতৃ সম্পত্তি, যেমন ইচ্ছা তেমন ব্যবহার করবেন! জাতির সন্ধিক্ষণের মুহূর্তে নির্বাচন কমিশনের এমন অদক্ষতা এবং পক্ষপাতিত্বের আচরণ কাম্য নয়। ভোটের মাঠে গড়ানোর আগেই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বিগত নির্বাচনগুলোর মতো কোনো রকম পাতানো নির্বাচন জাতি সহ্য করবে না। প্রহসনের নির্বাচন জাতি আর দেখতে চায় না। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বিকল্পে প্রহসনের নির্বাচন করার পাঁয়তারা করা হলে জাতীয় গাদ্দারদের বিরুদ্ধে আবার জুলাই-আগস্টের মতো জনগণ রাজপথে নেমে আসবে।
আবারও বলছি—দেশ এবং রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, কোনো সরকার নয়। সরকার দেশ ও জনগণের প্রহরী মাত্র। সরকার জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চলে, খায় এবং পরে। সরকারের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্র পরিচালনা করা এবং জনগণের প্রাপ্য অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অপশাসন, ভিন্ন দল-মতের মানুষের ওপর দমন-পীড়ন, হামলা-মামলা, খুনখারাবি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টাকা পাচার করা সরকারের কাজ নয়। বরং এসব দমন করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভিনদেশের কাছে দেশকে বিক্রি করে দেওয়া সরকারের কাজ নয়। বরং ভিন দেশের আধিপত্য থেকে দেশকে সুরক্ষা রাখাই সরকারের কর্তব্য। সুতরাং দেশ ও মানুষের স্বার্থ রক্ষার জন্য যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারবে, তাদেরকেই আগামী সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদান করা জনগণের নৈতিক দায়িত্ব। অন্যথায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের রূপান্তর সম্ভব হবে না।
লেখক : কলামিস্ট
কেকে/এজে