দেশে তিন মৌসুমেই- আমন, বোরো ও আউশের বাম্পার ফলন হয়েছে। সরকারি গুদামে রয়েছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ের খাদ্যশস্যের মজুত। বাজারে নতুন আমন চালের সরবরাহও ভালো। তবুও সরকার বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি কতটা যুক্তিযুক্ত?
সরকারের মূল লক্ষ্য সরু চালের অস্বাভাবিক দাম নিয়ন্ত্রণ এবং রমজান সামনে রেখে বাজার স্থিতিশীল রাখা। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে চাল আমদানির এই অজুহাত জনবান্ধব তো নয়ই বরং এটি দেশের প্রান্তিক কৃষকদের ওপর বিবেচনাহীন রাষ্ট্রীয় জুলুম। তবে প্রশ্ন জাগে চাল আমদানিতে কারা লাভবান হবে? এতে ব্যবসায়ীরাই কিছুটা লাভবান হলেও প্রান্তিক কৃষক তো বটেই অন্যান্য শ্রেণিপেশার মানুষের জন্যও এর বিরূপ প্রভাব পরবে। আমনের দামের উপর তো এর প্রভাব পরবেই। একই সঙ্গে বোরো মৌসুমের আবাদেও নেতিবাচক প্রভাব পরবে বলে আশঙ্কা কৃষিবিদদের।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে গত ১৮ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে ২৩২টি প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারিভাবে দুই লাখ টন সিদ্ধ চাল ভারত থেকে আমদানির অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমদানিকারকদের আগামী ১০ মার্চের মধ্যে চাল এনে বাজারে ছাড়তে হবে। শর্ত অনুযায়ী, আমদানিকৃত চালে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ ভাঙা দানা থাকতে পারবে এবং অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কারও নামে এই চাল ফের প্যাকেটজাত করা যাবে না। ভরা আমন মৌসুমে যখন দেশের প্রায় সব বড় মোকাম ও মিল এলাকায় নতুন চাল নামছে, তখন এ ধরনের সিদ্ধান্ত খাদ্যনীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট চাল উৎপাদন হয়েছে চার কোটি ১৯ লাখ টন, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। অপরদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে ৫৯ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। এর মধ্যে কাটা শেষ হয়েছে ৫৩ লাখ ৭১ হাজার হেক্টর জমির ধান। গড়ে প্রতি হেক্টরে ৩ দশমিক ১১ টন হিসাবে এখন পর্যন্ত প্রায় এক কোটি ৯৭ লাখ টন ধান উৎপাদন হয়েছে। অবশিষ্ট জমিতে একই হারে ফলন হলে আমনের মোট উৎপাদন দুই কোটি টনের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
এর বাইরে খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারি গুদামে প্রায় ২১ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে। চলতি অর্থবছরের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও খাদ্য বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনার পরও এই মজুতের বড় অংশ অব্যহৃত থেকে যাবে। ফলে এই আমদানির কি তাৎপর্য থাকতে পারে? নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের সন্ধিক্ষণে একটি স্বার্থান্বেষী মহল কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে। দাম বৃদ্ধির অজুহাতে আমদানির সুযোগ সৃষ্টি করে বাড়তি মুনাফা নিশ্চিত করা। সরু চালের সীমিত সরবরাহকে বড় করে দেখিয়ে একটি মহল আমদানির পক্ষে জোরালো তৎপরতা চালাচ্ছে। খাদ্য অধিদপ্তরের ভেতরের একটি অংশও এই উদ্যোগে নীরব সমর্থন দিচ্ছে।
এর আগেও বেসরকারিভাবে আমদানিকৃত চালের একটি অংশ সরকারকে বিক্রি করে মিলাররা প্রতি কেজিতে পাঁচ থেকে ছয় টাকা পর্যন্ত মুনাফা করেছেন। এবারও একই পথ অনুসরণ করা হচ্ছে। যা কৃষকবান্ধব তো নয়ই এবং জনবান্ধবও নয়। ধানের সরবরাহ এবং মজুত ভালো থাকার পরও যদি আমদানি করার সিদ্ধান্ত গণবিরোধী। একেতো সার ওষুধের দাম বছর বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে কৃষক ধান চাষ করে লাভবান তো হচ্ছেই না এবং ক্ষেত্রবিশেষ কৃষকের উৎপাদন খরচ ওঠানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
যেখানে-সেখানে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত এদেশের কৃষক ও কৃষির বিরুদ্ধে যাওয়া হয়। মাত্র দুটি সরু জাতের চালের দাম বাড়ার কারণে পুরো বাজারের জন্য আমদানির দরজা খুলে দেওয়া যৌক্তিক নয়। বরং বাজার মনিটরিং জোরদার করে মজুতদারি ও কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই বেশি কার্যকর হতো। ফলে গত ২ দিনে ১৪৪৭ টন ভারতীয় চাল দেশে ঢুকলেও চাল আমদানির লাগাম টানা দরকার। এ মুহূর্তে জরুরি হলো দেশের কৃষি ও কৃষককে বাঁচাতে চাল আমদানির লাগাম টানা এবং দেশীয় কৃষকদের ধান চাষে উৎসাহিত করতে সার ওষুধের দাম কমানোসহ নানারকম প্রণোদনা দেওয়া।
কেকে/এমএ