মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
ফ্যামিলিয়া থেকে ফ্যামিলি কার্ড, লক্ষ্য দরিদ্রতা নিরসন
আরিফুল ইসলাম রাজিন
প্রকাশ: বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ৬:২০ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। দেশ গঠনে রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতি দিলেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) দেওয়া ফ্যামিলি কার্ডের পরিকল্পনা ইতোমধ্যে রাজনীতিবিদদের ও জনগণের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। 

দেশের অসহায় দরিদ্র পরিবারগুলোকে স্বাবলম্বী করতে বিএনপি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে ফ্যামিলি কার্ডের। দলটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে দেশের ৪ কোটি ১০ লাখ পরিবারের মধ্যে প্রথম ধাপে ৫০ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনবে। ফ্যামিলি কার্ড প্রতিটি পরিবারের প্রাপ্ত বয়স্ক একজন নারীর নামে রেজিস্ট্রেশন করা হবে। এ কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে ২০০০ বা ২৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের খাদ্য সহায়তা প্রদান করবে দলটি। 

বিএনপির এ পরিকল্পনাকে তাদের সমর্থকরা মাস্টার প্ল্যান হিসেবে অবহিত করলেও বিরোধীরা এ পরিকল্পনাকে ভোট পাওয়ার হাতিয়ার প্রতারণামূলক প্রচারণা এবং নানাভাবে সমালোচনা করে যাচ্ছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এমন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে এবং দরিদ্রতা নিরসনে সফল হয়েছে। তন্মধ্যে ব্রাজিলের ‘বোলসা ফ্যামিলিয়া’ প্রকল্প অন্যতম। 

বোলসা ফ্যামিলিয়া হচ্ছে ব্রাজিল সরকারের একটি সামাজিক কল্যাণ প্রকল্প, যা দরিদ্র ও অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারগুলোকে সরাসরি নগদ অর্থ প্রদান করে থাকে। এটি দরিদ্রতা নিরসন, শিশুদের শিক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা প্রদানে বিশ্বের অন্যতম সফল প্রকল্প। ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে ব্রাজিলে ক্ষুধা ও দরিদ্রতা বৃদ্ধি পেতে থাকলে, ২০০৩ সালে ব্রাজিলের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন। 

বোলসা ফ্যামিলিয়া প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি পরিবারের প্রধান নারী সদস্যের নামে বোলসা ফ্যামিলিয়া কার্ড রেজিস্ট্রেশন করা হয়। এ কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের আয় ও পরিবারের সদস্য সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। প্রায় প্রতিটি পরিবারকে প্রতি মাসে সর্বনিম্ন ৬০০ ব্রাজিলিয়ান রিয়েল (১৪ হাজার টাকা) এবং গড়ে প্রতিটি পরিবারকে ৬৮০ ব্রাজিলিয়ান রিয়াল (১৬ হাজার টাকা) সশর্ত প্রদান করা হয়।

শিশুদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানো, সময়মত টিকাদান, গর্ভবতী মায়েদের নিয়মিত চেকআপ করানো, শিশুদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পরিবারের সব সদস্যের পুষ্টি নিশ্চিত করার শর্তে অর্থ প্রদান করে থাকে দেশটি। নগদ অর্থ প্রদানের মাধ্যমে সরকার দেশটির জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে সক্ষম হচ্ছে, যার ফলে দেশটির দরিদ্রতা ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। শিশুদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানোর শর্ত থাকায় শিশুদের শিক্ষা অব্যাহত থাকে। শিশুদের টিকা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের ফলে শিশুদের মেধা বিকশিত হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে শীর্ষ ও মায়ের স্বাস্থ্য উন্নত হচ্ছে। এর ফলে দেশে গড়ে উঠছে একটি সুস্থ, সবল ও বিকশিত জাতি।

বাংলাদেশের প্রতিবছর বাড়ছে দারিদ্র্যের সূচক। মূল্যস্ফীতির কষাঘাতে আরও নাজুক অবস্থা হয়ে পড়েছে নিম্নয়ের মানুষগুলোর। বিবিএস-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশের প্রায় ৭৮ থেকে ৮০ লাখ পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। এবং প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ লাখ পরিবার চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করছে। এ পরিবারগুলো নিজেদের মৌলিক চাহিদা গুলো পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। পরিবারগুলোর গর্ভবতী নারী ও শিশুদের পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করা তো দূরের কথা ঠিকমতো দুবেলা আহার জোটে না। পুষ্টকর খাবারের অভাবে মায়ের গর্ভে ভ্রমণের সঠিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। 

মায়ের সন্তান প্রসব যদি পূর্ণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরও বিভিন্ন রোগে সহজেই আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের (জিএইচআই) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে ১৩ শতাংশ মানুষ সরাসরি অপুষ্টিতে ভুগছে। যেটা সুস্থ ও বিকশিত জাতি গঠনে প্রধান বাধা। অপুষ্টিতে শিকার হওয়ার কারণে দেশে একটি অসুস্থ জাতি গড়ে উঠছে।

তা ছাড়া এদেশে অসংখ্য পরিবার রয়েছে যারা হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেও স্বাবলম্বী হতে পারছে না। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষগুলো কষ্ট করে কিছু অর্থ সঞ্চয় করে যা দিয়ে গ্রামের নারীরা হাঁস মুরগি গরু ছাগল কিনে এবং লালন পালন করে। তা দিয়েই ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখে খেটে খাওয়া মানুষগুলো। কিন্তু ওর থেকে টানাপড়েনে, দৈনন্দিন প্রয়োজনে, ধারদেনা মেটাতে বা হঠাৎ চিকিৎসার খরচ যোগাতে সহায় সম্বলের একটি মাত্র গরু ছাগল বিক্রি করে দিতে হয়। আবারও যেন সেই শূন্য অবস্থায় ফিরে আসে পরিবারগুলো। এসব পরিবারের আর্থিক মুক্তি ব্যতীত দেশের উন্নতি সম্ভব নয়। শহরের দালান কোঠা আর চাকচিক্যের ভিড়ে চাপা পড়ে থাকে গ্রামীণ জনপদের ও শহরের খেটে খাওয়া মানুষগুলোর দুঃখ কষ্ট।
   
দেশের এ মানুষগুলোর ভাগ্য বদলে বোলসা ফ্যামিলিয়া প্রকল্পের মতোই ভূমিকা রাখতে পারে ফ্যামিলি কার্ড। দেশের অবহেলিত নিষ্পেষিত পরিবারগুলোকে সমাবলম্বী করতে আর্থিক সহায়তার বিকল্প নেই। বিএনপির ফ্যামিলি কার্ডের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আর্থিক মুক্তি, সামাজিক মর্যাদা এবং শিশুদের মেধা মননকে বিকশিত করতে সাহায্য করবে।  

ব্রাজিলের বোলসা ফ্যামিলিয়া প্রকল্প সশর্ত হলেও বিএনপির প্রস্তাবিত ফ্যামিলি কার্ডে পরিকল্পনায় কোন শর্তের উল্লেখ নেই। অর্থাৎ কার্ডধারী নারী তার প্রাপ্ত অর্থ যে কোনো প্রয়োজনে খরচ করতে পারবে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা তাদের কাছে থাকা অর্থ প্রধানত শিশুদের শিক্ষা এবং পুষ্টিকর খাদ্যের জোগানে অধিক ব্যয় করে। নারীরা এ অর্থ পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করে নিজেদের স্বপ্ন পূরণে ভূমিকা রাখতে পারবে। অর্থের টানা পরনে সহায় সম্বল বিক্রি করে নিঃস্ব হতে হবে না। 

তা ছাড়া নারীরা কুটিরশিল্পের মাধ্যমে এবং গবাদিপশু পালনের মাধ্যমে গ্রামে-গঞ্জে ছোট ছোট খামার তৈরি হবে। হাঁস মুরগির ডিম এবং গরুর দুধ একদিকে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করবে অপরদিকে তা বাজারে বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করবে। এভাবে ধীরে ধীরে পরিবারগুলো স্বাবলম্বী হবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে ভূমিকা রাখবে।
   
দেশের সরকার যদি এসব পরিবারকে ধারাবাহিক ভাবে অর্থ সহায়তা প্রদান করতে পারে তবে অনেক পরিবার নিজেদের দুর্দশাপূর্ণ অবস্থার পরিবর্তন করতে সক্ষম হবে। দেশের দরিদ্রতার অভিশাপ ঘুচবে, শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাবে এবং পুষ্টিকর খাবার সরবরাহে একটি সুস্থ ও বিকশিত জাতি গড়ে উঠবে। ফ্যামিলি কার্ডের পরিকল্পনাগত ত্রুটি এবং প্রকল্প কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় যে দলই আসুক তাদের উচিত দেশের দরিদ্রতা বিমোচনে, শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে এবং দেশের জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে ফ্যামিলি কার্ডের বাস্তবায়ন করা।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  ফ্যামিলিয়া   ফ্যামিলি কার্ড   দরিদ্রতা নিরসন   আরিফুল ইসলাম রাজিন  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close