মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
নির্বাচনি আচরণবিধি ও ইসির দায়
রেজাউল করিম খোকন
প্রকাশ: বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ৬:৪৫ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

এবার প্রথমবারের মতো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নির্বাচনি আচরণ বিধিমালা মেনে চলার অঙ্গীকারনামা দিয়েছিলেন। তবে অনেকেই সে অঙ্গীকার রক্ষা করছেন না। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) প্রায় সব দলের প্রার্থীরাই আচরণ বিধিমালা ভাঙছেন। 

ভোট মানে কেবল জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়; এটি জনগণের আস্থার প্রশ্ন, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন। প্রচারের প্রথম দিককার অভিজ্ঞতা বলছে এ নির্বাচন সহজ হবে না। নির্বাচনি প্রচারণাকে ঘিরে বিএনপি, জামায়েতে ইসলামী ও এনসিপি জোটের পাল্টাপাল্টি কথার লড়াই তীব্র হচ্ছে। এ কথার লড়াই কথাতে সীমাবদ্ধ থাকলেই উত্তম। তবে এ লড়াই নির্বাচন মাঠকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে। সেদিক থেকে নির্বাচন কমিশনের কঠোরতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। এসব কিছুর সমন্বয়ই নির্ধারণ করবে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সত্যিই একটি গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হতে পারবে কি না। 

সম্প্রতি মনোনয়নপত্র বাছাই ও  বৈধকরণ প্রক্রিয়ার সময় নির্বাচন কমিশনের একজন সদস্য এক প্রার্থীর বিষয়ে বলেছেন, মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম, ব্যাংকের টাকাটা দিয়ে দিয়েন। এটা কী ধরনের কথা! তার মানে, এটা স্পষ্ট ওই ব্যক্তি ঋণখেলাপি ছিলেন। তার প্রতি অনুকম্পা করে নির্বাচন কমিশন মনোনয়নপত্র বৈধ করে দিল। এরপরে তারা প্রার্থীকে অসিয়ত করলেন, তারা যেন  খেলাপি হয়ে থাকা ঋণের টাকাটা দিয়ে দেন। নির্বাচন কমিশন একটা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাদের কাছে এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আমাদের  নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্ন করা দরকার, এ ধরনের আচরণ তারা ভবিষ্যতে করবে কি না? এ ধরনের আচরণ যদি তারা ভবিষ্যতে করে, তাহলে ভবিষ্যতে কিন্তু আমাদের কপালে অনেক দুঃখ আছে। নির্বাচন কমিশন যদি এখনই আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ না করে এবং অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে না আনে, তাহলে এবারের নির্বাচনও বিতর্কিত হতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, নির্বাচন কমিশন ও সরকারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। 

গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা না হলে জনগণের প্রত্যাশিত সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে অপপ্রচারের ঝুঁকি রয়েছে । নির্বাচনের দিন কোনো প্রার্থী মারা গেছেন বা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন-এআই ব্যবহার করে এমন অপতথ্য ছড়িয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হতে পারে। এতে নির্বাচন প্রভাবিত হতে পারে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক থাকতে হবে। এ ছাড়া পোস্টাল ব্যালট নিয়েও বিতর্কের সুযোগ আছে, যা পুরো নির্বাচনি ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। নির্বাচন পরিচালনার মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ না থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। 

ইতোমধ্যে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত অভিযোগে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ছাড় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রার্থীদের বার্ষিক আয় ও সম্পদের তথ্য দেখে ‘অনেক প্রার্থী তথ্য গোপন করেছেন’ জনমনে এমন ধারণা জোরালো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, নির্বাচন কমিশন কি বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নিয়ে হলফনামার তথ্য যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করেছে? প্রভাবশালী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে কমিশন কি নমনীয় ছিল? এই ধারণাগুলোর মধ্যে সামান্যতম সত্যতা থাকলেও তা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।  ভোটারদের গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক দায়িত্ব মনে করে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে হবে। অর্থ বা অন্য কিছুর বিনিময়ে অথবা অন্ধ আবেগের বশবর্তী হয়ে ভোট দেওয়া যাবে না। 

সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে-শুনে-বুঝে সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত দল ও প্রার্থীকে ভোট দিতে হবে। দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মানবতাবিরোধী, নারীবিদ্বেষী ও নির্যাতনকারী, মাদক ব্যবসায়ী, চোরাকারবারি, ঋণখেলাপি, বিলখেলাপি, সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি, ভূমিদস্যু, পরিবেশ ধ্বংসকারী, কালোটাকার মালিক অর্থাৎ কোনো অসৎ, অযোগ্য ও গণবিরোধী ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া থাকে বিরত থাকতে হবে। এবারের নির্বাচনে যে কোনোভাবে জয়লাভের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের বাধ্যবাধকতার কারণে এক দল ছেড়ে অন্য দলে যোগ দিয়ে মনোনয়ন নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এতে দলের ত্যাগী ও দীর্ঘদিনের নেতারা বঞ্চিত হয়েছেন। দলের প্রার্থী মনোনয়নে তৃণমূলের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে। 

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের আরেকটি সুপারিশ ছিল, দলের সাধারণ সদস্যদের গোপন ভোটে প্রতিটি নির্বাচনি এলাকা থেকে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য তিনজনের একটি প্যানেল তৈরি করা, যা থেকে দলের কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ড দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেবে। কিন্তু আরপিওতে এ বিষয়ে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। তবে বিদ্যমান আরপিওতে প্যানেল বিবেচনায় নিয়ে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া বিধান আছে। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলই এ ধরনের কোনো তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে এ ধরনের প্যানেল তৈরি করেনি এবং কোনো দলই প্যানেল থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি, যা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। 

নির্বাচনি ব্যয় মনিটরিং কমিটি গঠনের সুপারিশ আমলে নেওয়া হয়নি। নির্বাচনি ব্যয় মনিটরিং কমিটি গঠনের সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায়টাও উদ্বেগজনক। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ‘অভ্যাসগত ঋণখেলাপি ও বিল খেলাপিদের প্রার্থী হওয়া থেকে বিরতঅভ্যাসগত ঋণখেলাপি ও বিল খেলাপিদের প্রার্থী হওয়া থেকে বিরত রাখার সুপারিশ করেছিল। বিশেষত, ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে তাদের তামাদি ঋণ মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ছয় মাস আগে পরিপূর্ণভাবে শোধ করার বিধান করার সুপারিশ করেছিল। 

ঋণখেলাপিদের সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে কঠোরতা প্রদর্শনের লক্ষ্যে প্রস্তাবটি আরপিওতে অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক ছিল। এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন পাননি। জুলাই সনদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ স্বাক্ষরের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে প্রতিটি রাজনৈতিক দল বিদ্যমান ৩০০ সংসদীয় আসনের জন্য প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দেবে, তবে এটি সংবিধানে উল্লেখ করা হবে না। কিন্তু রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন পাওয়া নারীর সংখ্যা মাত্র ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এর মাধ্যমে স্পষ্ট যে, দলগুলো জুলাই জাতীয় সনদে যে অঙ্গীকার করেছে, তা রক্ষা করেনি, বরং মনোনয়নের ক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অন্যান্য বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে, যা হতাশাব্যঞ্জক। 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ করা হবে ১২ ফেব্রুয়ারি। প্রচার শুরু হওয়ার কথা ২২ জানুয়ারি হলেও এর আগেই বিধি ভঙ্গ করে সারা দেশে ভোটের প্রচারে নেমে পড়েছিলেন অনেক প্রার্থী। নির্বাচনি এলাকার পাশাপাশি প্রচার চালানো হচ্ছে অনলাইন মাধ্যমেও। তবে এখন পর্যন্ত বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আচরণবিধি ভঙ্গের দায়ে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিস দেওয়া ও সতর্ক করার মধ্যেই সীমিত। দু-একটি ক্ষেত্রে আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে জরিমানা করা হয়েছে। বিপরীতে কোথাও কোথাও দল ও প্রার্থীর পক্ষ থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তার শোকজ দেওয়ার এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়, গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো জনগণের বিশ্বাস ও ভোটাধিকার। সেই ভোট যদি ভয়, সন্দেহ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বন্দি হয়ে পড়ে, তবে নির্বাচন অর্থহীন হয়ে যায়। যদিও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার দলের নেতা কর্মীদের নিয়ন্ত্রেণে রশি টেনে ধরতে বারবার সতর্ক করছেন। সম্প্রতি চট্টগ্রাম শহরে আয়োজিত এক নির্বাচনি সমাবেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পরস্পরের প্রতি দোষারোপ, হিংসা বিদ্বেষপ্রসূত মন্তব্য না করে বক্তব্য প্রদান করতে। তিনি প্রশ্ন করেছেন, এভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো যদি পরস্পরের প্রতি আক্রমণাত্মক বিদ্বেষ প্রকাশ করে বক্তব্য দেন তাতে সাধারণ মানুষের কী লাভ হয়? 

তিনি বলেছেন, দেশের নিরেপক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তার দল সব ধরনের সহযোগিতা করবে। তবে দেশে এখনো নির্বাচন বানচাল করতে একটি পক্ষ নানাবিধ কাজ করছে। নির্বাচনি অঙ্গন পরিচ্ছন্ন করতে হবে, টাকার খেলা ও ভোট কেনাবেচা বন্ধ করতে হবে, এবং নির্বাচনকে কারসাজিমুক্ত ও স্বচ্ছ করতে হবে। এই দাবি কোনো বিলাসিতা নয়, এটি গণতন্ত্রের ন্যূনতম শর্ত। এই দেশের মানুষ ইতিহাসজুড়ে বারবার গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছে- ১৯৭০’-এর নির্বাচন, ১৯৯০-এর গণআন্দোলন কিংবা ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন তার উদাহরণ। কিন্তু প্রতিবারই তারা পেয়েছে গুম, খুন, দুর্নীতি ও জবরদখলের মতো তিক্ত অভিজ্ঞতা। বর্তমান সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আমাদের বিনীত কিন্তু দৃঢ় আহ্বান-এই মানুষগুলোকে আর প্রতারণার চক্রে ফেলবেন না। মানুষ যদি এবারও আশাহত হয়, তবে তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকবে না-এটি রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে আমাদের শাসনব্যবস্থাকে হতে হবে টেকসই, দায়িত্বশীল ও বিশ্বাসযোগ্য। এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষকে বারবার বিপ্লবে নামতে না হয়, রক্ত দিতে না হয়। রাষ্ট্র সবার অধিকার সংরক্ষণে সর্বাত্মক নিশ্চয়তা বিধান করবে, এটা আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে শান্তিপূর্ণ ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ প্রচার লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সেটি গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক বলেই আমরা মনে করি। প্রথম কয়েক দিনের প্রচারে বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযোগ ছাড়া বড় কোনো সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা ও অনিয়মের ঘটনা দেখা যায়নি।

রাজনৈতিক দলগুলো ও প্রার্থীরা মিছিল, সমাবেশ, দুয়ারে দুয়ারে প্রচার এবং ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে প্রচারে অংশ নিচ্ছেন। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে উত্তাপ ছড়ালেও বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, নির্বাচনি প্রচারে এমন বাগযুদ্ধ স্বাভাবিক। তবে রাজনৈতিক বাগযুদ্ধ যাতে কোনোভাবেই সীমা অতিক্রম না করে কিংবা সহিংসতায় রূপ না নিতে পারে, সেদিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি), অন্তর্বর্তী সরকার, রাজনৈতিক দল-সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। ভোটারদের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ এবং তাদের অনুদান, উপহার দেওয়ার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের প্রতি আচরণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। 

তবে প্রচার শুরুর প্রথম দিন থেকেই কিছু ক্ষেত্রে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা দেখা গেছে। এবার প্রচারে পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হলেও অনেক প্রার্থীই সেটা মানছেন না। কিছু জায়গায় পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর অপচনশীল দ্রব্য, যেমন- র‌্যাক্সিন, পলিথিন, প্লাস্টিক ব্যবহার করে ব্যানার, ফেস্টুন টানাতে দেখা গেছে। এ ছাড়া মাইকে প্রচারের সময় নির্ধারিত সময়সীমা ও সহনীয় শব্দের মাত্রা প্রার্থীরা মানছেন কি না, এ নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যায়। দু-একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা ও প্রচারে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। প্রার্থীরা যাতে নির্বাচনি আচরণবিধি মেনে চলতে বাধ্য হন, সে জন্য শুরু থেকেই নির্বাচন কমিশনের কঠোর হওয়া প্রয়োজন। 

দুঃখজনক হলেও সত্য, নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত নিজেদের কঠোরতা দেখাতে পারেনি। ইসিকে মনে রাখা প্রয়োজন যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই রাজনৈতিক দলগুলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে এসেছে। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান সাফল্য দেখা যায়নি। 

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে নির্বাচনের পরিবেশ কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না করতে পারে, সেদিকে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে। সংবাদমাধ্যমের ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ডিপফেক ভিডিও বানিয়ে অপতথ্য ও গুজব ছড়ানো হলেও, এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসির উদ্যোগ এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। আমাদের নির্বাচনি ব্যবস্থায় অর্থ, ক্ষমতা ও পেশিশক্তি যে কতটা নির্ণায়কের ভূমিকায় চলে এসেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। 

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ১ হাজার ৯৮১ প্রার্থীর মধ্যে কোটিপতি প্রার্থী ৮৯১ জন, শতকোটিপতি ২৭ জন। প্রতি চারজনের মধ্যে একজন প্রার্থীর ঋণ বা দায় রয়েছে। রাজনীতিকে এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বের করে আনতে হলে সুষ্ঠু ও কার্যকর গণতান্ত্রিক চর্চা জরুরি। আগামী নির্বাচন দেশকে একতরফা ও কারসাজির নির্বাচন থেকে বের করে আনার বড় একটা সুযোগ। রাজনৈতিক দলগুলো এবং প্রার্থীরা নির্বাচনি আচরণবিধি মেনে কতটা শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর প্রচারের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারছেন, তার ওপর ভোটার উপস্থিতি ও নির্বাচনি ফলাফল নির্ভর করবে। 

আমরা আশা করি, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন, আচরণবিধি ও আইন মেনে চলবেন। নির্বাচনি প্রচারের যে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর সূচনা হয়েছে, সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  নির্বাচনি আচরণবিধি   ইসির দায়   রেজাউল করিম খোকন  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close