বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতি বর্তমানে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন, প্রলম্বিত রোহিঙ্গা সংকট এবং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক মেরুকরণের এই জটিল সময়ে দেশের পররাষ্ট্রনীতি এক গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
সম্প্রতি রাজধানীতে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত সংলাপে কূটনীতিক, রাজনীতিক ও বিশ্লেষকরা যে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন, তা কেবল প্রাসঙ্গিকই নয়, বরং রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের জন্য একটি অপরিহার্য দিকনির্দেশনা।
একটি শক্তিশালী ও কার্যকর পররাষ্ট্রনীতির প্রধান ভিত্তি হলো সরকারের শক্তিশালী জনভিত্তি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐকমত্য। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারগুলোতে যে অস্থিরতা দেখা যায়, তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমাদের কূটনৈতিক দরকষাকষির সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়।
একটি রাষ্ট্র তখনই বৈশ্বিক শক্তিগুলোর চাপের মুখে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে, যখন তার পেছনে জনগণের ম্যান্ডেট ও জাতীয় সংহতি থাকে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের দেশে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে কোনো স্বাধীন কমিশন বা দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় রূপরেখা আজও গড়ে ওঠেনি। বর্তমান মাল্টি-পোলার বা বহুমুখী বিশ্বে টিকে থাকতে হলে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এ নীতির আধুনিক ও কৌশলগত প্রয়োগ জরুরি। ভারতের সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও পানি বণ্টন, চীনের সঙ্গে অবকাঠামোগত অংশীদারত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা এই তিনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখনকার প্রধান কূটনীতি।
সংলাপে উঠে এসেছে যে, পাকিস্তান যদি চীন থেকে অস্ত্র কিনেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে পারে, তবে তা তাদের কূটনৈতিক দক্ষতারই প্রমাণ। আমাদেরও তেমনি দক্ষ নেগোসিয়েটর বা দরকষাকষিকারী দল গড়ে তুলতে হবে, যারা আবেগ বা রাজনৈতিক আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে। রোহিঙ্গা সংকটের মতো মানবিক ও কৌশলগত ইস্যুতে আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা কেন আন্তর্জাতিক মহলে জোরালোভাবে প্রভাব ফেলতে পারছে না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একইভাবে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে রাজনীতিকীকরণ থেকে মুক্ত রাখা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। মনে রাখতে হবে, পররাষ্ট্রনীতি কোনো নির্দিষ্ট দলের সম্পদ নয়; এটি রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিচয় বিনির্মাণ করে।
বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতায় রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখতে কূটনীতির গুরুত্ব বেড়েছে এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিন দিক থেকে ভারতের সীমান্তঘেরা অবস্থান, অভিন্ন নদী ও পরিবেশগত নির্ভরতা এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টতা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে, ফলে বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে হলে প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই জনগণের মধ্যে দৃঢ় জনভিত্তি তৈরি করা প্রয়োজন। যে দেশের জনগণ বা জনভিত্তি দুর্বল, সেই দেশের ওপর অন্য রাষ্ট্র সহজেই নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে।
একটি জনমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি পররাষ্ট্রনীতি নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংকীর্ণ বিভেদ ভুলে জাতীয় স্বার্থে এক টেবিলে বসতে হবে। একটি জাতীয় ‘পররাষ্ট্রনীতি দলিল’ প্রণয়ন করা যেতে পারে, যা সরকার পরিবর্তনের পরও অপরিবর্তিত থাকবে। কেবল শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং জনগণের সক্রিয় সমর্থনই পারে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে একটি আত্মমর্যাদাশীল ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে।
মনে রাখা জরুরি বাংলাদেশকে টিকে থাকতে হলে সব প্রধান শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হবে। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য উপযুক্ত ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যা একই সঙ্গে দেশের সামরিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে শক্তিশালী করতেও সহায়ক হবে।
কেকে/এলএ