সব শঙ্কা কাটিয়ে আগামীকাল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট। সে হিসেবে আর মাত্র ২৪ ঘণ্টা বাকি। দীর্ঘ ১৭ বছর পর অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আকাক্সক্ষা নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাবেন মানুষ। নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নির্বাচিত করবেন নতুন সরকার। সেইসঙ্গে গণভোটে নিজেদের মতামত প্রয়োগ করবেন। তবে এ নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনেরই নয়, এ নির্বাচন নতুন বাংলাদেশ গড়ার শুরু।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। ওইদিনই দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এর মধ্যদিয়ে অবসান ঘটে ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনের। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার আকাক্সক্ষায় গণঅভ্যুত্থানে লাল লাল মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। শহীদ হয়েছেন অন্তত ২ হাজার মানুষ। এই বিপুল আত্মত্যাগ ব্যর্থ না হওয়ার নির্বাচন এবার। রাষ্ট্রের সংস্কার ও সত্যিকার গণতান্ত্রিক দেশ প্রতিষ্ঠার সন্ধিক্ষণে আজ দেশ।
বিগত ফ্যাসিস্ট সময়ে মানুষের সব অধিকার হরণ করা হয়েছিল। এই ১৭ বছরে তিন তিনটি তামাশার নির্বাচন দেখেছে জাতি। সব গণতান্ত্রিক দলকে নির্বাচনের বাইরে রেখে একতরফা নির্বাচন, ভোটারবিহীন নির্বাচন, রাতের ভোট মিলিয়ে জাতির সঙ্গে প্রহসনের আয়োজন করেছিল হাসিনা সরকার। এর ফল ভোটাধিকারবঞ্চিত ছিল মানুষ। এ ছাড়া হরণ করা হয়েছিল সব অধিকার। রাষ্ট্রের সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। লুটপাট ও পাচারের মাধ্যে ধ্বংস করা হয়েছে অর্থনীতি।
আমি ও ডামির নির্বাচন : আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে শেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি, যা ছিল তাদের আগের দুটি নির্বাচনের চেয়েও অভিনব। সেটি ‘আমি’ ও ‘ডামি’ নির্বাচন নামে পরিচিত লাভ করেছে। অর্থাৎ মূল প্রার্থী আওয়ামী লীগের, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরাও একই দলের পার্থক্য শুধু স্বতন্ত্র পরিচয়। এর বাইরে ছোট ছোট কিছু দলের প্রার্থীও ভোটে ছিলেন। তবে তারাও আওয়ামী লীগেরই মিত্র। কেউ কেউ আবার নৌকা প্রতীকে ভোট করেছিলেন। সাজানো এ নির্বাচনের ফলাফলও আগে থেকে জানা ছিল, ভোট ছিল অনেকটা আনুষ্ঠানিকতা। দেশের ইতিহাসে এ নির্বাচন একটি নেতিবাচক নজির হয়ে থাকবে। এ নির্বাচন ঘিরে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা, কৌশল ও পরিণতি হয়েছিল, তা শুধু একটি ভোটের দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ছিল টানা এক দশকের নির্বাচনি ব্যবস্থা ধ্বংসের চূড়ান্ত প্রকাশ। এর আগে ২০১৮ সালের ভোট পরিচিত রাতের ভোট নামে। অন্যদিতে ২০১৪ সালের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বেশির ভাগ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হয়ে গিয়েছিল। যা পরিচিতি পায় বিনা ভোটের নির্বাচন নামে।
এসব শঙ্কা ও ভয় পেরিয়ে এবারে নির্বাচন ঘিরে মানুষ আশায় বুক বাঁধছে। তাদের প্রত্যাশা এবার অন্তত জনরায় প্রতিফলিত হবে।
শহীদ হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকের শিক্ষার্থী। এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন তিনি। তার প্রত্যাশা, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের।
তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে যদি তারা একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে পারে।’
রামপুরা এলাকার মুদি ব্যবসায়ী আহসান উল্লাহ। দীর্ঘ ১৭ বছর ভোট দিতে না পারার দুঃখ তার। এবারও যেন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়, সেই আশাই করছেন তিনি। এ ব্যবসায়ী বললেন, ‘আমার ভোটটা যাবে আমি দিতে পারি। কেউ যেন এনে না বলে আপনার ভোট হয়ে গেছে।’
রোকসানা আকতার কাজ করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। নতুন সরকারের কাছে রয়েছে তার নানা প্রত্যাশা। তবে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে কিছুটা সংশয় নিয়ে বললেন, ‘সাধারণ মানুষের রায় যেন সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়।’
ভোট দিতে ঘরমুখো মানুষের উপচেপড়া ভিড় : জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ বড় শহরগুলো ছাড়তে শুরু করেছে সাধারণ মানুষ। ভোট দেওয়ার তাগিদে মানুষের এ বাড়ি ফেরার দৃশ্য চোখে পড়ার মতো। বাসস্ট্যান্ডে দূরপাল্লার বাস ধরতে ঘরমুখো ভোটারদের ব্যতিব্যস্ত। কারও হাতে ব্যাগ, কারোবা মাথায় বস্তা। অনেকেই পরিবার নিয়ে অপেক্ষা করছেন বাসের জন্য। আবার দলবেঁধে পিকআপে, ট্রাকে বাড়ির পথে চলেছে মানুষ। গত মঙ্গলবার সকাল থেকেই গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী বাস টার্মিনাল ও কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে দেখা গেছে ঘরমুখো মানুষের উপচেপড়া ভিড়।
রাজধানীর কমলাপুর স্টেশনেও ট্রেনের টিকিটের জন্য দীর্ঘ সারি লক্ষ করা গেছে। কয়েক বছর পর একটি উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে সবাই এভাবে নিজ এলাকায় ছুটছেন বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা।
চাকরি ও কর্মসূত্রে ঢাকা ও গাজীপুরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের লাখ লাখ মানুষ বসবাস করেন। কর্মজীবী এ বিপুলসংখ্যক মানুষের স্থায়ী ঠিকানা গ্রামে, মফস্বল শহরে। তারা নিজ নিজ এলাকার ভোটার। গত ১৭ বছর ধরে ভোট দিতে না পারা বহু মানুষ এবার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চান, যা নির্বাচনি প্রচারের সময় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ ঘিরে তিন দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলেও পোশাক শ্রমিকরা পেয়েছেন চার দিনের ছুটি। এ সুযোগে ঢাকা ও গাজীপুরের অস্থায়ী ঠিকানার ভোটাররা তাদের স্থায়ী ঠিকানার পথে ছুটেছেন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে।
কেকে/এলএ