যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহতের ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ আখ্যা দিয়ে মৃত্যুপণ প্রতিঘাতের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ওই হামলায় আরও নিহত হয়েছেন দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদ ও গোয়েন্দা পুলিশের সংস্থা ফারাজার প্রধান গোলামরেজা রেজাইয়ানসহ প্রায় তিন শতাধিক সামরিক ও বেসামরিক মানুষ। এ ঘটনায় সাত দিনের সরকারি ছুটি ও ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে সরকার।
একইসঙ্গে দেশটির শাসনব্যবস্থায় স্থবিরতা কাটাতে অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। এ পরিষদে রয়েছেন শীর্ষ শিয়া আলেম আলিরেজা আরাফি, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেইন মোহসেনি ইজেই।
গতকাল রোববার (১ মার্চ) দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বিবৃতিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বৈধ অধিকার ও দায়িত্ব। সব শক্তি প্রয়োগ করে এর প্রতিশোধ নেওয়া হবে।
মাসুদ পেজেশকিয়ান আরও বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এই অপরাধের পরিকল্পনাকারী ও দোষীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়াকে বৈধ দায়িত্ব ও অধিকার মনে করে। আমরা এই দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের জন্য সব শক্তি উৎসর্গ করব।’
এ সময় তিনি তার বক্তব্যে শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেন।
ইরানের এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিলের মুখপাত্র মহসেন দেহনাভি এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস (বিশেষজ্ঞ পরিষদ) ‘যত দ্রুত সম্ভব’ একজন স্থায়ী নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া চলাকালে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পরিষদ আরাফিকে তাদের ধর্মীয় প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন করেছে।
এদিকে ইরানে হামলা ও খামেনি হত্যার পরপরই পাল্টা আঘাত শুরু করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানায়— এটি তাদের ‘ট্রু প্রমিস ৪’ অভিযানের ষষ্ঠ ধাপ। নতুন এ প্রতিশোধমূলক হামলায় ইসরায়েলের দখল করা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের সামরিক স্থাপনা এবং অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ভূপাতিত করা হয়েছে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি মার্কিন এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন।
আইআরজিসির জনসংযোগ বিভাগ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে— তাদের অ্যারোস্পেস ফোর্স ইউনিট দেশটির সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণে থাকা আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে মার্কিন ‘সন্ত্রাসী বাহিনীর’ উন্নত এমকিউ-৯ ড্রোনটিকে লক্ষ্যবস্তু করে ধ্বংস করেছে।
এর মধ্যে ইসরায়েলের বেইত শেমেশ শহরে ইরানের মিসাইল হামলায় ৯ ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন।
সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে— ইসরায়েলি জরুরি পরিষেবা সংস্থা মেগান ডেভিড অ্যাডম (এমডিএ) জানিয়েছে, ইরানের মিসাইলের আঘাতে ৯ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি ২০ জন আহত হয়েছেন, যার মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর।
এ ছাড়া ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো মার্কিন সেনার প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক ঘোষণায় জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল এ খবর জানিয়েছে। সাইপ্রাসের দিকেও দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে, যেখানে হাজার হাজার ব্রিটিশ সেনা অবস্থান করছে বলে জানিয়েছেন ব্রিটেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি।
এ ছাড়া ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বহু হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েতে ইরানের সামরিক বাহিনীর হামলায় অন্তত একজন নিহত হয়েছেন। এই হামলায় আহত হয়েছেন আরও ৩২ জন।
রোববার কুয়েতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে ইরানি হামলায় হতাহতের ওই তথ্য জানানো হয়েছে।
এর মধ্যেই সংযুক্ত আরব আমিরাতেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি নাগরিক। বাকি দুজনের একজন নেপালি এবং অন্যজন পাকিস্তানি নাগরিক বলে আমিরাতের ইংরেজি দৈনিক গালফ নিউজ জানিয়েছে।
আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত আমিরাতে ১৬৫টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ৫৪১টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে ইরান। আর যুদ্ধ শুরুর দ্বিতীয় দিনে সকাল পর্যন্ত অন্তত ২০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। এর মধ্যে আটটি ক্ষেপণাস্ত্র সমুদ্রে পড়েছে এবং বাকিগুলো ভূপাতিত করার দাবি জানিয়েছে আমিরাত।
অন্যদিকে পাকিস্তানে ইরানের সমর্থনে আয়োজিত বিক্ষোভে মার্কিন কনস্যুলেটের কাছে সংঘর্ষে অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন। রোববার করাচি শহরে মার্কিন কনস্যুলেটের সামনে বিক্ষোভের সময় এ ঘটনা ঘটে। তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর করাচিতে বিক্ষোভ শুরু হয় বলে জানিয়েছে ডন।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের ৪৭ বছরের ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। খামেনির ৩৬ বছরের শাসনের আকস্মিক অবসান বড় ধাক্কা হলেও তেহরান সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত ছিল না। সম্ভাব্য লক্ষ্যভিত্তিক হামলার আশঙ্কায় বিকল্প নেতৃত্বের তালিকা আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল এবং বিশেষজ্ঞ পরিষদকে সব পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছিল।
তবে একাধিক শীর্ষ কমান্ডার নিহত হওয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যে কিছুটা ধাক্কা লেগেছে।
প্রসঙ্গত, আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রপন্থি পাহলভি রাজবংশের পতন ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান’। সেই থেকে দীর্ঘ যুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চাপ মোকাবিলা করেই রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকিয়ে রেখেছে তেহরান।
কেকে/এলএ