রাজধানীসহ সারা দেশের আবাসিক এলাকাগুলোতে গ্যাস লিকেজ ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণ এখন এক মূর্তমান আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। ঘরবাড়ির বদ্ধ পরিবেশে জমে থাকা গ্যাস সামান্য আগুনের সংস্পর্শে আসতেই রূপ নিচ্ছে ভয়াবহ বিস্ফোরণে। এতে মৃত্যু ও দগ্ধের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। গত দুই মাসে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিয়েছেন দুই হাজার ৭০০ রোগী, যাদের বড় অংশই দগ্ধ হয়েছেন রান্নাঘর থেকে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণে শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ায় অর্ধেকের বেশি রোগীকে বাঁচানো যায় না। তাই এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান বলছে, কেবল ২০২৫ সালেই গ্যাস লাইন ও সিলিন্ডারজনিত অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ৮৫ জন এবং দগ্ধ হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন আরও ২৬৭ জন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রাহকের অসচেতনতা এবং মানহীন সিলিন্ডারের অবৈধ মজুত এই বিপদকে আরও উসকে দিচ্ছে।
চট্টগ্রামের হালিশহরে ২৩ ফেব্রুয়ারি ভোরে গ্যাস বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়েছেন একই পরিবারের নয় সদস্য। একই দিন ভোর রাতে ঢাকার রায়ের বাজারে গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে চারজন, পরের দিন কুমিল্লার দাউদকান্দিতে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আরও চারজন দগ্ধ হয়েছেন। সম্প্রতি বিস্ফোরণে মৃত্যুর যেসব ঘটনা:
কক্সবাজারে গ্যাস স্টেশনে বিস্ফোরণ
কক্সবাজারের কলাতলীতে গ্যাস পাম্প বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ আবু তাহের চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। গতকাল রোববার বেলা ২টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে, জানিয়েছেন বড় ছেলে মো. সোহেল। গত বুধবার রাত ১০টার দিকে কলাতলীতে এন আলমের মালিকানাধীন এলপিজি স্টেশনে লিকেজ হওয়া গ্যাসে আগুন ধরে আবু তাহেরসহ অন্তত দশ জন দগ্ধ হন। আবু তাহেরসহ ছয়জনকে পাঠানো হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এরপর অবস্থার অবনতি হলে শুক্রবার তাকে ঢাকায় জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের রেজিস্ট্রার ডা. আশফাকুল আসিফ জানান, আবু তাহেরের শ্বাসনালীসহ শরীরের প্রায় ৯০ শতাংশ পুড়ে গেছে। গুরুতর অবস্থায় তাকে আইসিইউতে ভর্তি রাখা হয়েছিল। ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা, গ্যাস ‘লোড-আনলোড’ প্রক্রিয়ায় ত্রুটির কারণে লিকেজ তৈরি হয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। নিহত আবু তাহের পেশায় একজন সিএনজি চালক।
চট্টগ্রামে গ্যাস বিস্ফোরণ-নিহত বেড়ে ৬
চট্টগ্রামের হালিশহরে গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে ঘরে জমে থাকা গ্যাসের বিস্ফোরণে দগ্ধ মো. শিপন হোসেন (৩১) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। এ নিয়ে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয়জনে। গত শনিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে তার মৃত্যু হয়। এর আগে একই ঘটনায় শিপনের ভাবি নুরজাহান আক্তার, ভাতিজা শাওন, ভাই সামির হোসেন, আরেক ভাবি পাখি আক্তার এবং বড় ভাই সাখাওয়াত হোসেন মারা যান। বর্তমানে আরও তিনজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
দাউদকান্দিতে গ্যাস বিস্ফোরণ
কুমিল্লার দাউদকান্দিতে অবৈধ গ্যাস লাইন লিকেজ হয়ে বিস্ফোরণে একই পরিবারের নারী শিশুসহ দগ্ধ চারজনের মধ্যে একজন মারা গেছেন। গত শনিবার ভোররাতে ঢাকায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। দগ্ধ বাকি তিনজনের মধ্যে জিয়াউল হকের ৫৬ শতাংশ পুড়ে যাওয়ায় তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক। এর আগে ২৪ ফেব্রুয়ারি সকালে দাউদকান্দি পশ্চিম মাইজপাড়া এলাকায় ভবনের নিচতলায় গ্যাসলাইন বিস্ফোরণের দুর্ঘটনা ঘটে। এতে একই পরিবারের মনোয়ারা (৬০), জিয়াউল হক (৩৭), উম্মে হুমায়রা (৩০) ও হুররাম (২) দগ্ধ হন। পরে তাদের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ দগ্ধ উম্মে হুমায়রা (৩০) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার ভোরে মারা যান।
নারিন্দায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণ
পুরান ঢাকার নারিন্দার মৈশুন্ডির একটি বাসায় এসির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর আগুন লেগে দগ্ধ মো. সেলিম ব্যাপারী (৩০) গত শুক্রবার রাতে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে মারা গেছেন। ওই ঘটনায় দগ্ধ তার মা সেলিনা বেগম (৪৫) ও বাবা মুক্তার ব্যাপারী (৫৫) একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকরা বলেছেন, তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক।
পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, মুক্তার ব্যাপারী সপরিবার নারিন্দা কাঁচাবাজারের কাছে দক্ষিণ মৈশুন্ডির একটি বাড়ির তৃতীয় তলায় থাকেন। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ওই বাসায় এসিতে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর তাতে আগুন ধরে যায়।
জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, সারা দেশ থেকে প্রতিদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে ৮০ থেকে ৯০ রোগী। ২৩ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি শুধু গ্যাস দুর্ঘটনায় দগ্ধ হয়েছে ২১ জন।
কী কারণে এমন দুর্ঘটনা ঘটছে তার সঠিক কারণ অজানাই থাকছে। তাই গ্যাসে রান্নার সময় সবাইকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. শাওন বিন রহমান বলেন, ‘রান্নাঘরে চুলা জ্বালানোর ১০ থেকে ১৫ মিনিট আগে যদি জানালা খুলে রাখা যায়, তাহলে গ্যাস যদি রান্নাঘরে থেকেও থাকে তা বের হয়ে যাবে। এছাড়া চুলার যে স্ক্রুগুলো থাকে, প্রতি বছর বা প্রতি ছয় মাসে চেক করা বা পরিবর্তন করা জরুরি।’
দুর্ঘটনার নেপথ্যে অসচেতনতা ও কারিগরি ত্রুটি
বিস্ফোরক পরিদপ্তরের তথ্যমতে, অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে চুলার চাবি বা হোসপাইপের লিকেজ এবং নিম্নমানের রেগুলেটর ব্যবহারের কারণে। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে বাসাবাড়ির জানালা-দরজা অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকায় লিকেজ হওয়া গ্যাস ঘরের ভেতর জমাট বেঁধে থাকে। ভোরে বা রাতে সাহরি তৈরির সময় দিয়াশলাই জ্বালাতেই সেই গ্যাস বোমায় পরিণত হচ্ছে। সম্প্রতি চাঁদপুরের কচুয়া এবং চট্টগ্রামের হালিশহরে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনাগুলো এই লিকেজজনিত বিস্ফোরণেরই চরম উদাহরণ।
মানহীন সিলিন্ডার ও অবৈধ গোডাউনের ঝুঁকি
বিস্ফোরক পরিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা উদ্বেগের সাথে জানিয়েছেন, দেশের বহু আবাসিক এলাকায় হাইড্রোলিক প্রেশার পরীক্ষা ছাড়াই মানহীন সিলিন্ডার অবৈধভাবে গোডাউনে মজুত করা হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর সিলিন্ডার পরীক্ষা করার কথা থাকলেও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তা মানছে না। ফলে বিস্ফোরক এই সিলিন্ডারগুলো একেকটি জীবন্ত বোমার মতো সাধারণ মানুষের ঘরে ঠাঁই করে নিচ্ছে।
উত্তরণের পথ: সমন্বিত তদারকি
ফায়ার সার্ভিসের অপারেশন পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “দুর্ঘটনা রোধে বিস্ফোরক অধিদপ্তর, পুলিশ, সিটি করপোরেশন ও ফায়ার সার্ভিসের সমন্বয়ে যৌথ তদারকি কমিটি গঠন করা জরুরি।” তিনি আরও জানান, গ্রাহকদের নিয়মিত চুলার হোসপাইপ পরীক্ষা করা এবং রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সিলিন্ডার পরিবহনের ক্ষেত্রেও কঠোর নীতিমালা অনুসরণের ওপর জোর দেন তিনি।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন বলেন, ‘বাড়িতে আগুন ধরলে বৈদ্যুতিক যে মেইন সুইচ সেটি সবার প্রথমে বন্ধ করে দিতে হবে। কোনো হেজিটেশন ছাড়া পরিবারের যে কোনো একজনকে এ কাজটি করতে হবে। অগ্নিদগ্ধদের বাঁচানোর ক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে যেন ভেজা কাপড় পরে নেওয়া হয়, আগুন যেন উদ্ধারকারীর গায়ে না লাগে।’
কেকে/এলএ